শিষ্যের হাতেই আদর্শের মৃত্যু

Recent

সহদেব মাহাত

হেথায় আর্য হেথা অনার্য,
হেথায় দ্রাবিড় চীন,
শক হুন দল,পাঠান মোগল
একদেহে হল নীল।
বহু জাতি ও বহু ভাষা,বহু ধর্মের দেশ এই ভারত।সবার মত ও পথ কে সমান গুরুত্ব দেওয়া ও সম্মান দেওয়া উচিৎ। এই লেখাটা কোন ধর্ম বা সম্প্রদায় কে আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়।একুশশতকে এসে কিছু শিক্ষিত লোক অন্ধ আবেগে বাজার মাত করে তাদের সচেতনতার জন্য লেখা।
আমরা দেখেছি,এই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহন করা কিছু মানুষকে তাদের শিষ্য রা ভগবানের অংশ হিসাবে দেখতে শুরু করেন।এটা কিন্তু অবশ্যই ভাল দিক।তবে তখনেই ভাল যখন তার আদর্শ কে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেস্টা করা হবে।কিন্তু তা হয় না।মিথ্যা আবেগ দিয়ে কুসংস্কারের খিচুড়ি বানিয়ে তাকে হিরো বানানো হয়।প্রত্যেক ব্যক্তি কিছু নতুন ভাবধারার জন্ম দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়।তারপর সেইভাবধারা আড়াল হয়ে ব্যক্তি বন্দনার শুরু হয়।আর তখনেই পিসে মারা হয় তার আদর্শবাদ কে।
হজরত মহম্মদ থেকে শুরু করে যীশুখৃষ্ট,চৈতন্যদেব, সাঁইবাবা,বিবেকানন্দ,রামকৃষ্ণ, সারদা,অনূকুল,বালক ব্রহ্মচারী ইত্যাদি হাজার হাজার ব্যক্তি আছেন যারা অবতার রূপে শিষ্যদের কাছে ঘোষিত।একটা সময় এই পৃথিবীর মাটি জন্ম নিয়ে তাদের চিন্তা ও চেতনাকে সমাজের মানুষের কাছে প্রেরন করেছিল এবং তাঁদের ব্যক্তি আদর্শ ও মত সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।সমাজ গঠনের তাদের আদর্শ আজও সমান কার্যকরী।কিন্তু বর্তমানে সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার কথা একুশ শতকের শিক্ষিতদের ভাবার অবকাশ নাই।এরা আদর্শ প্রচারের পরিবর্তে ব্যক্তি বন্দনায় বেশি বিশ্বাসী। গুরুর গুনগান করলেই নাকি ভবপারে যাওয়া যায়।একটা সাধারন উদাহরনে বিষয়টা পরিষ্কার করছি-ধর্ম সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিবেকানন্দ বলেছিলেন “ধর্ম হল অন্তরের সাধুত্ব গুলির বিকাশ সাধন”। প্রত্যেকটা মানুষের ভাল দিকটাই তার ধর্ম। হিংসা,দ্বেশ,হানাহানি, মারামারি ভুলে সবার জন্য ভালবাসার দূয়ার উন্মোচন করলেই নিজ ধর্মের প্রকাশ ঘটবে।মানুষের ধর্ম মানুষের কাছেই।তিনি ধর্ম করার জন্য কিন্তু দূর্গা- কালী বা রাম পূজন করে বললেন না।” সবার উপর মানুষ সত্য”- এই ভাবধারায় লালিত হয়ে ররীন্দ্রনাথ বললেন-” কোথায় সর্গ কোথায় নরক,কে বলে তাহা বহুদূর/মানুষের মাঝে সর্গ নরক মানুষেই সুরাসুর।”এই সকল সুন্দর বানী বা আদর্শ প্রচার না করে শিষ্যদের কাজ হল-
নিজ নিজ গুরুদেব কে ভগবান মনে করে প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহন।এবলে আমি বড় ও বলে আমি বড়।তাদের নিয়ে নানা কল্পকাহিনি বাজারে প্রচলিত হয়।সেই কাহিনী নিয়ে নিরক্ষর শিষ্য গুলার সাথে সাথে দু-পাতাপড়া শিক্ষিত গুলাও তাল মেলায়।কারন,সবার লক্ষ্য আমার গুরুদেবকেই বাজারে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।তার মহানতা মার্কেটে বেশি চলে তার চেস্টা করতে হবে।শেষে অবতারে পরিনত হয়।সাথে সাথে মারা যাই সেই ব্যক্তির সমাজ দর্শন। তার শিষ্য রা উচ্চস্বরে গাইতে ” নিমাই ঠাকুর এসেছিলেন এই ধরাতে/ কলির জীবের তরাইতে।কেউ বা বলে – অনূকুল এসেছিল এই ধরা তে/ কলির জীবের উদ্ধারিতে।কেউ বা- “পরম ঠাকুর দয়াল ঠাকুর রামকৃষ্ণ সারদা।”
চলতে থাকে ব্যক্তি বন্দনা,মৃত্যু হয় আদর্শের।ভাবতে অবাক লাগে যখন কোন শিক্ষিত ব্যক্তি তার সমস্ত কাজে দায়ভার তুলে দেয় তার হৃদয়পালিত গুরুদেবের উপর।সেই ব্যক্তি ভাবতেও পারে না যে, আমিও অবতার,আমিও পৃথিবীতে অবতরন করছি,আমার নিজস্ব একটা রূপ আছে, আদর্শ আছে,একটা দর্শন আছে,আমিও সমাজকে কিছু দিয়ে যেতে পারি।তা না করে গুরুদেবের কাছে নিজস্বতা কে বন্ধক রাখে।
বতর্মানে কোন কোন ধর্ম সম্প্রদায় নিজের গুরুর প্রচারে টাকা দিয়ে ‘ধর্ম প্রচারক’ নিয়োগ করছে।তাদের কাজেই হল অপরের কুৎসা করে নিজের মহানতা প্রকাশ করে।আর এরাই ধর্মীয় উষ্ণনায়ন এর মূল পান্ডা।অাজ অস্ত্র হাতে ধর্ম নাচে,দাঙ্গা -গনহত্যা ধর্ম সংগঠন গুলির কর্মসূচীর অঙ্গ।শিষ্যদের হাতে মুখথুবড়ে পড়েছে আদর্শবাদ।তাই,কাজী নজরুলের সুরে সুর মিলিয়ে বলি-“পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল,মূর্খরা সব শোন/মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন।”

Leave a Reply