কবি ধনঞ্জয় দেবসিংহ এর গুচ্ছ টুসু গীত

Language & Tradition, Literature_of_soil

ধনঞ্জয় দেবসিংহ মেদিনীপুর এর তরুন কবিদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। শালবনী ব্লকের বর্ধিঞ্চু জনপদ মধুপুর এর বাসিন্দা। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী এই ছাত্রটি কবিতার প্রেমে পড়েই একসময় অবহেলা করেছেন উচ্চশিক্ষা। তবু কবির খেদ নেই। বর্তমানে ভারত সরকারের ডাক বিভাগে কর্মরত। অত্যন্ত কমবয়সে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবির ২০৬ টা হাড়’. একে একে প্রকাশিত হয় ‘ধূলোয় পড়ে আছে রক্ত’, ‘পালকের সে’। এতদিন বাংলা সাহিত্য চর্চা করলেও এবার ফিরে এসেছে মাতৃসমা নিজ সংস্কৃতির প্রতি। শুরু করেছেন টুসু গীত, ঝুমুর রচনা। টুসু গীত কবির প্রথম প্রচেষ্টা। বর্তমান সময়ের সমাজ, সংস্কৃতির বহু বিষয় ধরা পড়েছে কবির গুচ্ছ টুসুগীতে।

টুসু গীত -১
**********

আমদের দাবী আদায় কইরব চল
যত কুড়মি সেনা বুকে বাঁধ বল

আগে হামরা এস টি ছিলি, নথিপুঁথি তাই বলে
সেই দাবীতে রইব অবিচল
আমদের দাবী————-

ভাষা আমদের কুড়মালী ভাই,অষ্টম তপসিলে চাই
এই দাবীটাও থাক সচল
আমদের দাবী————–

বেতারে যাক সংস্কৃতি, টুসুগীত আর ঝুমৈর গান
সবাই জানুক আমরা কত তল
আমদের দাবী ——————

টুসু গীত – ২
***********

সময় হলে সবাই বুঝিবেক
তকে বুঝাই বইলতে নাই হবেক

বাপের যে কী মূল্য রে ভাই, মায়েরই বা কী মূল্য
বাপ হলে নিজেই বুঝিবেক
সময় হলে ————

কত ধানে কত হয় চাল, কন ধানের কী নাম
চাষ কইরলে মাঠেই বুঝিবেক
সময় হলে ————

টুসু গীত – ৩
**************

হামদের টুসু দূয়ারে হাসে।
ডুমু পিঠার গন্ধে টুসুর জিভে জল গড়াই আসে।

টুসুরা সোব পুখুর পাড়ে, সকাল সকাল মকর ডুব।
সারা বছর অপেক্ষার অবসান যে হয় শেষে।
হামদের টুসু —————————-

নতুন জামা নতুন জুতা, টুসু নাচে রাস্তাতে।
আনন্দের এই মকর দিনেতে টুসুর চুইল উড়ে যে বাতাসে।
হামদের টুসু———————–

লেখাপড়া করে টুসু, সারা বছর মন দিয়ে।
একদিন শুধু হামদের টুসু বই খাতা ভাল নাই বাসে।
হামদের টুসু———————–

ছট ছট টুসু হামদের, বড় হয় ধীরে ধীরে।
শ্বশুর ঘরকে যাবেক টুসু নতুন বউয়ের বেশে।
হামদের টুসু———————-

মকরদিনে হামদের টুসু, আইনব গো ঘুরাই ফিরাই।
টুসু বীণা টুসুর মা নয়নের জলে ভাসে।
হামদের টুসু ————————-

টুসু গীত – ৪
**********

কনকইনা জাড় আইল পোষ মাসে
আমদের কাঁথা কম্বল নাই পাশে
কনকইনা জাড়———–

সকাল সন্ধ্যা আগুন জ্বলাই বসি আমরা চাইরপাশে
কনকইনা জাড় ————–

মাঝ রাইতে ছানা কাঁদে কামড়ায় উত্তৈরা বাতাসে
কনকইনা জাড় —————

ধনঞ্জয়ে বাঁধে গান,ভারত বাংলার ফুটপাতে বইসে
কনকইনা জাড় —————–

টুসু গীত – ৫
**********

শালপাতে জৈমেছে কুয়াশা
তরা বুঝলি নাই ভালবাসা

রোদ উঠলে একটু পরে,কুয়াশা যাবেক ধূরে
যতই তরা করনা ভরসা
শালপাতে———

কত পথিক আইল গেল,দু পায়ে ই পথ মাড়াইল
সবার একদিন কাটেইছে নেশা
শালপাতে ———

কবি ধনঞ্জয়ে বলে, শুইনে রাখ গো সকলে
তবু বাড়ে মনের পিপাসা
শালপাতে———-

টুসু গীত – ৬
*********

সাতাইশ তারিক মেদনীপুর চালা
যত কুড়মি ঘরে থাক তালা

ধান ঝাড়া,আলু কুড়া
সেদিন সোব থাক ফেলা
সাতাইশ তারিক——–

আমদের দাবী,ছাড়াই লিব
আর সইব না অবহেলা
সাতাইশ তারিক———

বক্তা আইসছেন, অজিতবাবু
কুড়মি কান্ডারি ভেলা
সাতাইশ তারিক———-

আমদের আছে,সঙস্কৃতি
লয় সেটা হেলাফেলা
সাতাইশ তারিক————

জাগো কুড়মি,বাঁধো জোট
আর বাড়াইও না বেলা
সাতাইশ তারিক————

টুসু গীত – ৭
*********

সাতাইশ তারিক মেদনীপুর চালা
যত কুড়মি ঘরে থাক তালা

ধান ঝাড়া,আলু কুড়া
সেদিন সোব থাক ফেলা
সাতাইশ তারিক——–

আমদের দাবী,ছাড়াই লিব
আর সইব না অবহেলা
সাতাইশ তারিক———

বক্তা আইসছেন, অজিতবাবু
কুড়মি কান্ডারি ভেলা
সাতাইশ তারিক———-

আমদের আছে,সঙস্কৃতি
লয় সেটা হেলাফেলা
সাতাইশ তারিক————

জাগো কুড়মি,বাঁধো জোট
আর বাড়াইও না বেলা
সাতাইশ তারিক————

টুসু গীত -৮
********

তুই যে ধনী ডুমৈর ফুল হলি
শেষে আমকে কি ভুলেই গেলি

কবে গেছিস মামা ঘর,আইজও ফেরার নামটি নাই
মন যে আমার আকুলবিকলি
তুই যে ধনী ———–

সবাই যাছে মেলাতে,সঙ্গে তাদের সঙ্গিনী
তুই সজনি ধূরেই থাকিলি
তুই যে ধনী———–

একলা থাকি পৌষ পরবে,একলা একলা দিন কাটে
তুই যে আমায় পাগল বনালি
তুই যে ধনী————–

টুসু গীত – ৯
*********

নদীর জলে ভাইসছে যে জাতি
তরা কবে বুঝবি সেই ক্ষতি

ময়ূর পালক নেজে গুঁইজে
ভাবছিস যে ময়ূর হলি।
কবে তদের ঘুচবে ভীমরতি
নদীর জলে ———-

লকে তদের ফুল নিয়ে যায়
ভাইঙয়ে দিয়ে ডালপালহা।
বাঁচা তদের নিজের সংস্কৃতি
নদীর জলে ————–

ধনঞ্জয়ে গান বাঁইধে যায়
টুসু ঝুমৈর অহিরা।
চাঁড়েই তদের ফিরুক সুমতি
নদীর জলে —————–

টুসু গীত – ১০
**********

ঘোলা জলে পুখুইর ভরিল
তরা মাছ ধরবি ত জাল ফেল

ডাইড়া পুঁঠি মাছ আছে,মাছ আছে বোয়াল শোল
জালের ভেতর খতম মাছের খেল
ঘোলা জলে ————

মাছের ভেতর তেল আছে,মাছের তেলেই রান্না শেষ
সইরষা খসলা সবেই জইমে গেল
ঘোলা জলে ———–

কবি ধনঞ্জয়ে বলে, মাছ ধর বছরভর
মাছ ধরেই দুনিয়া জাইলা হইল
ঘোলা জলে————

টুসু গীত -১১
*********

তলায় জাকাই রইব না আর ভাই
ই বার জাইগব যে আমরা সবাই

কুড়মালীতে বইলব কথা,ভাগ কইরব মনের ব্যথা
নিজের ভাষায় ডাইকব আমরা মাঈ
তলায় জাকাই———–

টুসু ঝুমৈর গান গাহিব,ছউ নাচে নাচিব
বাঁদনা গীতে আসরটা ভরাই
তলায় জাকাই————-

শুনঅ বলে ধনঞ্জয়ে,বল বাঁধ না দুপায়ে
চল নিজের শিকড়ে ফিরে যাই
তলায় জাকাই —————

টুসু গীত – ১২
**********

সরকার কইরল কুড়মি বোড় গঠন
আমদের সংস্কৃতির হছে যতন

ছৌ শিখছি, অহিরা শিখছি
করম টুসুর পশিক্ষণ
সরকার কইরল——-

আমদের নিজের সঙস্কৃতি,ভুলেই আমরা যাছি ভাই
শুরু হইল ভাতা পচলন
সরকার কইরল ——–

মাদৈল পাছি ধমসা পাছি,পাছি নাচের সরঞ্জাম
ইগলা যে কুড়মিদের রতন
সরকার কইরল———-

ধনঞ্জয়ে বলে তবে, আর লকের নেজ ধইর না
আগাই চল নিজের মতন
সরকার কইরল———–

টুসুগীত – ১৩
**********

বছর শেষের সাধের মকরে
ও তুই গেলি যে বাপের ঘরে

ঘরে ঘরে ডুমুপিঠা, মাংস পিঠাও হবেক গো
কে আমাকে বনায় দিবেক ডুমুপিঠা পুর ভইরে
বছর শেষের ————–

সারা রাইত টুসু জাগান, জাগথি দুজন গান কইরে
মনের আশা মইরে গেল মনের ভিতরে
বছর শেষের ———–

কবি ধনঞ্জয়ে বলে, মায়ের বিটিরা শুন গো
ডুমুপিঠা পাঠাই দিবে হোয়াটস অ্যাপ কইরে
বছর শেষের ————-

টুসু গীত -১৪ (যুব দিবস)
********************

যুব দিবস,যুব দিবস আজ
তরা উঠ, জাগ, কর কাজ

রামকৃষ্ণের শিষ্য তিনি, লন্ডনে মহান হইল
ভারত ধর্মের কইরল প্রচার কাজ
যুব দিবস, যুব দিবস ——–

শিব জ্ঞানে জীব সেবা,নতুন মন্ত্র আনিল
বইল জীবেই ভগবান বিরাজ
যুব দিবস, যুব দিবস——

রামকৃষ্ণ মিশন গইড়ল,গইড়ল রামকৃষ্ণ মঠ
কত যুবক হছে মহারাজ
যুব দিবস, যুব দিবস——

বিপ্লবীরা তার বাণী, হৃদয়ে ধারণ করিল
তাই ত দেশটা স্বাধীন আমদের আজ
যুব দিবস,যুব দিবস——–

তিনি হলেন বিবেকানন্দ, জন্মদিনেই যুব দিন
যুবদের হোক স্নায়ুগিলা বাজ
যুব দিবস,যুব দিবস———

গঠন কইরব চরিত্র সব,এমনই আইজ হোক শপথ
দেশে আইনব নতুন সমাজ
যুব দিবস,যুব দিবস——–

 

Leave a Reply