তাহার নামটি জঙ্গলমহল – মৃণাল কান্তি মাহাত ‘র কবিতা

Literature_of_soil

 

তাহার নামটি জঙ্গলমহল

মৃণাল কান্তি মাহাত
————————————
পশ্চিমের বাশবনে সূর্য ডুবলে

মহুয়া নামের যে মেয়েটি ঘোমটা টানে তার নাম

জঙ্গল মহল।

 

বেলপাহাড়ীর খাদানে যে ছেলেটির সঙ্গে পাথরের

বন্ধুত্ব, পাথুরে মাটির সঙ্গে সঙ্গমে কোলে তুলে দেয়

মাছিমারা ধান তার নাম জঙ্গলমহল।

লালগড়ের ছোট্রগ্রাম জুড়ে নেমে আসে সিপাই

সৈনিক, বন্দুকের বাঁট উপহার দেয় অন্ধত্ব,

ছিতামনিরা জানতেও পারে না, কেন জন্মদ্বার জুড়ে

পাহারা দেয় বন্দুক? গর্ভের ভেতর একটা ভ্রুণ তখন

অনুভব করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, যুদ্ধের দেশে জন্ম নিতে

ভয় পায় যে শিশু, তার নাম জঙ্গলমহল।

যার মাথা ঝাড়গ্রাম, দুই বাহু মেদনীপুর আর

পুরুলিয়া,হৃদয় টা যার বাঁকুড়ায়।দুই বক্ষ বেলপাহাড়ী

আর বাগমুন্ডি।আদিবাসী গ্রামজুড়ে বিস্তৃত যার

অসংখ্য শিরা উপশিরা, যার প্রেমিক বাঁশি হাতে ঘুরে

বেড়ায় কাড়ার পাল নিয়ে, সন্ধ্যার আসর মাতায়

মাদৈলে, তার নাম জঙ্গলমহল।

যে মহিলা অনাহারে থেকেও ঘন্টার পর ঘন্টা টুসু

গীতে মাতিয়ে রাখে আসর তার নাম জঙ্গলমহল।
যে ছেলেটা সকাল বেলা লাঙ্গল চালায়, দুপুরে স্কুল

বা কলেজ যায়, বিকেলে খেলে ফুটবল, সন্ধ্যায় যার

মাদৈল খেটে খাওয়া গ্রামে,ক্লান্তির দেশে ঘুম পাড়ায়।

তার নামও জঙ্গলমহল।

যে মানুষটা ভাই বোনেদের মানুষ করতে গিয়ে

মাধ্যমিক পাশ দিতে পারল না, এখন কাড়াবাগালি

করে, আড়বাঁশি বাজায়। যার শহরবাসী সফল ভাই

বোনেরা খোঁজ রাখে না পিতৃসম দাদাকে। সেই

ব্যার্থ মানুষটিও জঙ্গল মহল।
পাখি যেখানে ঘুম ভাঙানোর এলার্ম বাজায়। বাহা

সেরেঙ আর ঝুমুর শুনতে যেখানে পাহাড় ডিঙাতেও

রাজী। পরব এনেচ এ যেখানে দুজন অপরিচিত

মানব মানবী র হৃদয় বাঁধা পড়ে যেখানে। ভরপেট

মহুয়া খেয়েও রামের নিখুঁত অভিনয়ে ছো এর আসর

কাঁদাতে পারে যে যুবক। তাও জঙ্গল মহল।

যার একপাশে ছৌ, ঝুমুর সাড়পা, সহরাই,অন্যপাশে

আমলাশোল, অযোধ্যা।

কাঁসাই, কুমারী সুবর্নরেখা যেখানে ঝুমৈরাদের বুকে

তুলে মাতন।
সমাজের কথা ভেবে যে ছেলেটা স্বেচ্ছায় ছেড়েদিতে

পারে প্রেমিকার হাত। স্কুল পালানো যে আদিবাসী

কিশোর পাথর কুঁদে কুঁদে পাহাড়ের উপর লেখে পান্তা

ভাতের অক্ষর।
এদের সবার নাম জঙ্গলমহল। ধর্ষিতা অহল্যাভূমি।

________________________________________________

পোস্টম্যান

পোস্টম্যান ফেরেনি আজ

রাস্তায় দাঁড়িয়ে করম গাছ।

অপেক্ষা চলতে থাকে

 

এই পথেই তো একদিন হেঁটে গেছে বিপ্লব।

বস্তাবন্দী কত স্বপ্ন।লালকালিতে লেখা

মৃত্যুদণ্ড। সাইকেল করে এখনো আসে

বিংশশতক।

 

যারা একদিন ফেরি করেছিল মৃত্যুনাম

তাদের হাতেই আজ গনতন্ত্রের দায়ভার

সুখের ভুঁড়িতে এখনো লেগে আছে

বালিকার সিঁদুর।

 

অপেক্ষা চলতেই থাকে

পোস্টম্যান আজও ফেরেনি।

 

Leave a Reply