মিচু মুর্মু থেকে ঠাকুরমনি বাস্কে: অবৈধ ক্রাশারে বলি কবে থামবে?

Recent

বিকাশ মুদি: পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামের বন বাদাড়ে ঘুরে বেড়ালে আপনি অনেক পাথর ভাঙার ক্রাশার দেখতে পাবেন| কিন্তু সেই ক্রাশার গুলোর বেশির ভাগই অবৈধ| সেই ক্রাশার গুলো দিয়ে আদিবাসীদের বন জঙ্গলের পাথর অবৈধ ভাবে বের করে ক্রাশারে যথাযথ সাইজের বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা রোজগার করে উড়ে এসে জুড়ে বসা ব্যবসায়ীদের দল| পুলিশ, প্রশাসন, নেতা সবই ক্রাশারের টাকার লাভের গুড় খায় আর চুপচাপ বসে থাকে| আর সেইসব ক্রাশারে জীবন জীবিকা চালাতে, পেটের অন্ন জুটাতে কাজ করেন সেই মানুষ গুলোর বেশির ভাগই আদিবাসী| এমনকি অন্য রাজ্যে গিয়ে মরলেও এরাজ্যের নেতাদের বুকে ব্যথা হয় কিন্তু এই রাজ্যেরই অবৈধ ক্রাশারে কাজ করার সময় পিষে মরে গেলে কোনো নেতা মন্ত্রীর কিছু যায় আসেনা| আদিবাসীরা মরলে নেতাদের মেকি প্রেম জেগে উঠেনা| অনেক মিডিয়ার কলম থেমে যায়| বুদ্ধিজীবীরা চুপচাপ থাকে| মোমবাতির আলো জ্বালাইনা কেও| এমনকি কেউ মনেও রাখেনা|

এইতো সেদিন, ক্রাশারে কাজ করার সময় দুর্ঘটনার মুখে পড়ে মৃত্যু হল এক মহিলা শ্রমিকের। মৃত শ্রমিকের নাম ঠাকুরমণি বাস্কে। গত রবিবার সন্ধ্যায় ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার শালতোড়া থানার লেদাপলাশ এলাকায়।প্রত্যেকদিনকার মতো শিশুতল এলাকার একটি পাথর ক্রাশারে কাজে এসেছিলেন ঠাকুরমনি। রবিবার দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ মেশিনে পাথরের বোল্ডার ঢালতে গিয়ে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। ক্রাশারের বেল্টে আটকে যায় ঠাকুরমনির পরে থাকা শাড়ি। আর তাতেই ঘটে গেল বিপত্তি। মেশিনের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ঠাকুরমণি| কয়েক সেকেন্ডেই বেল্টে তালগোল পাকিয়ে যায় তাঁর দেহ। ঘটনার অনেক পরে সেই রাতেই ঘটনাস্থল থেকে দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার নামমাত্র ময়না-তদন্তের জন্য দেহ পাঠানো হয় বাঁকুড়ায়। তাঁর বাড়ি শালতোড়া থানারই মুড়লু গ্রামে বলে জানা যায়। হয়তো রাতের বেলা দেহ উদ্ধার করলে কারো বাধার সম্মুখীন হতে হবেনা সেই ভেবে রাতের মধ্যেই দেহ উদ্ধার করে নেই পুলিশ|

ক্রাশারের মালিক তো ধনী মানুষ, বাস করেন অট্টালিকায়| মাসে মাসে টাকা পাঠান থানায়, নেতাদের খরচ যোগান, পার্টিঅফিসের চায়ের খরচও বোধহয় জুগিয়ে থাকেন| ভোটের আগে হাত পাতে অনেকেই| তাই তার মনে হচ্ছিলো সব কিছুই বোধ হয় কেনা যায়| তাই, ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ক্রাশার মালিকের বিরুদ্ধে। মৃতদেহ আটকে পরিবারের সঙ্গে টাকার রফা দফা করার চেষ্টা করে ক্রাশারের মলিক। বিকেল চারটে থেকে রাত সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ক্রাশারের কাছেই পড়ে থাকে ঠাকুরমনির মৃতদেহ। ক্রাশারের মালিক ভেবেছিল টাকা দিয়ে কিনে নেবে আদিবাসীদের মন কিন্তু যারা মেহনতি মানুষ হয় তারা অন্যায়কে প্রশয় দিতে জানেনা সেটা বোধহয় জানা ছিলোনা ক্রাশারের মালিকের| তাই, শেষপর্যন্ত আইনি পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয় ঠাকুরমনির পরিবার। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর মৃতদেহ উদ্ধার করে শালতোড়া থানার পুলিশ।

এ দিকে চোখের সামনে সহকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ক্রাশারের কর্মী সকলে। ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশ। কয়েক মুহূর্তেই ক্রাশারের বেল্টে ঠাকুরমনির দেহটা তালগোল পাকাতে দেখেছে অনেকেই । চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখে অনেকেই ভীত সন্ত্রস্ত। বিকল্প কোনো কাজের আশাও নেই এই রাজ্যে| ঘরও ফাঁকা, খাবার অন্ন নেই, পরিধানের বস্ত্র নেই| দিদি দাদারা রাজনীতিতে ব্যস্ত, টিভি চ্যানেল গুলো পাকিস্তান নিয়ে ব্যস্ত| বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের বিবেক বন্ধক রেখেছে স্বার্থের কাছে|

শুধু কি ক্রাশারে পিষে মরে যাওয়া? অবৈধ ক্রাশার গুলো শ্রমিকদের মৃত্যুর ঠিকানাও বটে|

মিচু মুর্মুকে মনে আছে ? নেই তাইতো ? কেনই বা থাকবে ? দেবু রাউত কেও ভুলে গেছেন ? কি অদ্ভুত তাইনা – এসব নাম কার ? আসুন তাহলে মনে করিয়ে দিই| পাথরখাদানে কাজ করতে গিয়ে ‘সিলিকোসিস’ রোগে আক্রান্ত হয় শ্রমিকরা। ২০১৪ সালে মৃত্যু হয়েছিল অন্তত দুজন শ্রমিকের। তাদের দুজনের নাম ছিল মিচু মুর্মু ও দেবু রাউত| বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লকের তালবাঁধের বাসিন্দা ছিল তারা| রাজ্য সরকার খাদানে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ বলেই এমন ঘটছে, সেসময় বলেছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। রাজ্যের মুখ্যসচিবকে কমিশন নির্দেশ দিয়েছিল, অবিলম্বে অবৈধ খাদান বন্ধ করতে হবে। সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই যে সব বৈধ খাদান চলছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। তাদের পরিবারকে রাজ্য কেন ক্ষতিপূরণ দেবে না, তার কারণ দেখিয়ে ছয় সপ্তাহের মধ্যে কমিশন জবাব দিতে বলেছিল রাজ্যের মুখ্যসচিবকে। শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে কর্মরত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি শমিতকুমার করও শ্রমিক মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের আর্জি জানিয়েছিলেন| তার আগে ১৯৯৬ সালে মেদিনীপুরে সিলিকোসিস-আক্রান্ত ১৭ শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। বীরভূমের ঘটনার পর মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশ সেই রায়কে আরও শক্তিশালী করেছিল বলে অনেকে ভেবেছিলেন।

কিন্তু ওই টুকুই, তারপর ফাইলবন্দী হয়ে নীচে পড়ে যায় মিচু মুর্মুদের কাগজ| এখন সবাই ভুলেও গেছে| খাদানের পাথরগুঁড়ো থেকে ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে সিলিকোসিস রোগ হয় শ্রমিকদের, এই অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। কিন্তু রোগটির বাহ্যিক লক্ষণগুলি অনেকটাই যক্ষ্মার মতো। দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিপূরণের দায় এড়াতে সরকার অনেক সময় যক্ষ্মার চিকিৎসার নিদান দেয় – তার প্রমাণ আছে। দেবু রাউত এবং মিচু মুর্মুর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল।

যতদিন স্থানীয় নেতা মন্ত্রী, ধান্দাবাজ, পুলিশ, প্রশাসন, বিএলআরও আর সংবাদপত্রের গড়াপেটা চলতে থাকবে – অবৈধ ক্রাশারে পিষে পিষে মরতে থাকবে সাধারণ পরিবারের আদিবাসী ভাইবোনেরা| বড় লোকেদের ঢাক তৈরী হতে থাকবে গরীব লোকেদের চামড়ায়| সে পুরুলিয়ার বরাবাজারেই হোক, বান্দোয়ানেই হোক আর বাঁকুড়ায় শালতোড়ায় হোক বা বেলপাহাড়ির কোন প্রত্যন্ত গ্রামেই হোক আদিবাসী মানুষেরা যদি নিজেদের বন, জঙ্গলের অধিকার নিয়ে সোচ্চার না হন তাহলে সমস্যা থাকবেই| ক্রাশারের চোরা কারবারীরা তুলে নিয়ে যাবেই পাথর| সাঁওতালি সংগঠন গুলো শুধু রাজনীতির স্বার্থ আর কুড়মি দের এস.টি হওয়ার দাবির বিরোধিতা করা ছাড়াও এগুলোও দেখুক|

Leave a Reply