দুর্ঘটনাগ্রস্ত পুরুলিয়ার ছো নাচের দল: আহত ১৬

Recent

ঋতুজা ঘটক: ঘটনা ১৩ই মে ২০১৯| রাঁচি থেকে একটি ছোট ট্রাক যাচ্ছিলো মুরীর দিকে| মুরী থেকে ২২ কিলোমিটার আগে সীতাডিহের পাশে রাস্তায় বড় বড় গর্ত থাকায় উল্টে যায় ট্রাকটি| ট্রাকের নম্বর JH10AE -3755 | গাড়ির মালিকের নাম সম্ভবত বিশ্বনাথ গোপ| সেই গাড়িতে খুঁটি থেকে নাচ করে ফিরছিলেন পুরুলিয়ার জয়পুর থানার ভাটডি গ্রামের স্বপন কুমারের ছো দল| ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য সবাইকে মেসো হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়| সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর আহতদের রাজেন্দ্র ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সাইন্সেস এ পাঠিয়ে দেওয়া হয়|

আহতদের মধ্যে আছেন দেবাশীষ মাহাত, জয়ন্ত কুমার, স্বপন কুমার, সম্পিত কুমার, যোগেশ্বর কুমার, ভীম কুমার, ফনি কালিন্দী,সোমনাথ কুমার, ঠাকুরদাস কালিন্দী, লালিত কুমার, কুশ কুমার, তপন কুমার, সুরেশ কুমার, ভূতনাথ কুমার, পরিলোচন কুমার, নলিনী কুমার ইত্যাদি| এঁরা পুরুলিয়া জেলার জয়পুর থানার বীরডি, সিয়ারামপুর, কোটশিলা, বাঁধডি ও আলকুশার বাসিন্দা| শুধুমাত্র রাস্তা খারাপ থাকার কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ীটি দুর্ঘটনা গ্রস্ত হয়|

ছো নাচ আজ বিশ্ববিখ্যাত| সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা| সময়ের সাথে বদলেছে ছো নাচের দর্শক| গ্রাম থেকে শহর হয়ে সারা বিশ্বে পাড়ি দিয়েছে ছো নাচ| হলফ করে নাম জুড়েছে বাংলা সংস্কৃতির সাথে| কলকাতা এয়ারপোর্টে লাগানো হয়েছে ছো মুখোশের ছবি| কিন্তু ছো নাচ করা শিল্পীদের জীবন রয়ে গেছে মুখোশের আড়ালেই| আজ ছো নাচ এক সস্তা পণ্য| সংস্কৃতি কাগজে কলমে| কোথাও কোথাও শিল্পী ভাতা’র ছিঁটে ফোঁটা| তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে| বাজারি বাবুরা আদর করে ছো নাচের দলকে নিয়ে ব্যবসা পেতেছে কোথাও কোথাও| কেওবা বিভিন্ন মেলার নাম করে ছো নাচকে ব্যবহার করে নিজেদের নামের ওজন বাড়াচ্ছে|

ছো নাচকে ব্যবহার করতে রাজনীতিটিও কসুর করেনি| নিজেদের দলের প্রচারে আসরের ছো নাচকে রাস্তায় নামিয়েছে| বাঙালি বাবুদের দুর্গাপূজার বিসর্জনেও রাস্তায় লাফায় ছো নাচের রসিক – লক্ষ্য শুধু রিঝ মেটানো আর নাচকে ভালোবেসে নেচে যাওয়া| কাঙাল পেট তাতেও ভরেনা| দূর্গা পূজার সময় একই মঞ্চে ছো নাচ কারী ১৫-২০ জনের ছো নাচের দল পায় জোরে মাথা পিছু এক হাজার টাকা, আর কোনো নামি দামি শিল্পীর পকেটে যায় লক্ষাধিক টাকা| আসলে ছো নাচ তো আদিবাসীদের নাচ| ‘অশিক্ষিতদের নাচ ভাবতেও কসুর করেন বোধহয় বাবুরা’| তাই ছো নাচের মূল্য মানে শিল্পের মূল্য নয় – শ্রমিকের মূল্য| চড়িদা ঘুরতে এসে ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে সানগ্লাস পরে মুখোশের দাম জিজ্ঞেসকারীরা পেছনে ঠাট্টা তামাশা করে হয়তো এসব সংস্কৃতি নিয়ে| কেও কেও অনলাইন এ ওয়েবসাইট খুলে ব্যবসাও ফেঁদেছেন| ছো নাচ কারীর দল হয়তো জানেনই না যে তাঁর ছবি ইন্টানেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে|

যাঁরা ছো নাচ করেন তাঁদের আর্থিক অবস্থা ততটা উন্নত নয়| শিক্ষা দীক্ষাও অনেক ক্ষেত্রেই গোল্লায়| তাই তার সুযোগকে ব্যবহার করতে ছাড়েন না কেউই| শ্যামাপদ মাহাতোর মতো ছো শিল্পী আজ রাজনীতির যাঁতাকলে নিজের গ্রামেই ব্রাত্য| রাজ্যের বাইরে বা বিদেশে নিয়ে গেলে ছো নাচকারি দলকে থাকতে দেওয়া ঘুপছি করে| যেটা একজন শিল্পীর মর্য্যাদা লঙ্ঘন ছাড়া কিছু না| ছো নাচের দেবতা ও অসুরের লড়াইয়ে অসুরদের পরাজয়ের কাহিনী দেখে মনে মনে হাসে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধজ্বাধারী সমাজ| আদিবাসীদের নাচে আদিবাসীদের পূর্বপুরুষদের পরাজয় ক্রমাগত দেখিয়ে তাঁদেরকেই মাথায় তুলে রাখার বন্দোবস্ত যে পাক্কা হল সেকথা ভেবে আনন্দ দেয় তাদের|

আসরের ছো নাচ এখন রাস্তায়| কখনো অপরিপক্ক অ্যালবাম বানানো সংস্থার উদ্যোগে জঙ্গলের উপর পাথরে নাচ করছে| রাতে ফেসবুকে সময় দিতে হয় পাবলিককে তাই হয়তো দিনের বেলার নাচের আসর এখন বাড়ছে| বিদেশের লোকেরা জানেনই না নাচের জন্য কেমন মাঠের দরকার| কখনো শান বাঁধা মেঝে বা মঞ্চেও নাচ করতে ছো নাচ কারীদের| কোথাও কোথাও আবার হল ঘরে| আসলে ওনারা তো সাধারণ মানুষ, নিজেদের কথা নিজেরা মুখ ফুটে বলতে জানেননা| দরকার পরে তুখোড় দালাল দের, যাঁরা সংস্কৃতির আড়ালে ব্যবসা করেন| বদলাক ছো নাচ কারীদের ভাগ্য| ওডিশা সরকারের মতো কিছু কিছু পদক্ষেপ নেক বাংলার সরকারও| শিল্পী ভাতা দিতে ভোট পাওয়া যায় কিন্তু শিল্প বাঁচেনা| বেঁচে থাকে ধামসার আওয়াজ, ঝুমইরের তান, ঢোলের কাঠি – পরশুরামের বিরুদ্ধে গর্জে উঠুক গনেশ কার্তিক| হিন্দু দেবী দূর্গা বধ করে চলুক হুদুড় দুর্গাকে কিন্তু ছো নাচ করতে গিয়ে পাথরের ঠোকা খেয়ে চোখ বেয়ে জল পড়লে সে জল দেখা যায়না মহড়ার মুখে| বোবা, চাপা কান্না, অসহ্য দুঃখ কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকার আমার ছো তোমার ছৌ| রিঝে রঙে দৈনন্দিন বসুক নতুন নতুন আসর|

Leave a Reply