আত্মনির্ভর ভারত

Beyond Borders, Conservation, Nature, Our Voice

~ কৃত্তিকা পায়রা

 


ধরুন, এমন একটা বাড়ি বানানো হল, যেখানে বিদ্যুৎ খরচ খুব কম। এসি তো দূরের কথা, ফ্যান অব্দি চালাতে হয় না, এমন বাড়ি। ভাবছেন, হবে হয়তো। টাকা দিলে বাঘের দুধ পাওয়া যায়। কিন্তু এই বাড়িটা তা নয়। ১৯৬০ সালে গুজরাট হাউসিং এক প্রতিযোগিতা করেছিল কম খরচে বাড়ি বানানো নিয়ে। লোড বিয়ারিং প্রযুক্তিতে এই বাড়িটা বানিয়েছিলেন, চার্লস কোরিয়া নামে এক স্থাপত্যবিদ। উনি আধুনিক কাঁচ, স্টিল দিয়ে বাড়ি বানানোর বিরুদ্ধে ছিলেন।
লস এঞ্জেলসের মতো কাঁচ দিয়ে বাড়ি বানানো যেতেই পারে। কিন্তু, আমাদের মতো গরমের দেশে এর ব্যবহার একবার ভাবুন তো। কাঁচ দিয়ে তাপ ঢুকলে বেরোতে পারবে না। তখন ঘরের ভিতরের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। সেটা সামাল দিতে এসি চালাও। এসি মানেই সিএফসি। এরপর সমস্যা এক এক করে বাড়তেই চলল।
স্বাচ্ছন্দ্য সবাই চাই। স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে একবারের জন্য বলছি না। ওটা নিয়েও এমনকিছু করা যেতে পারে, যাতে চারদিকে খরচ কমবে। গ্রীষ্মকালে সূর্যের অবস্থান খেয়াল করে, আপনি যদি ঘরের কাছে পর্নমোচি গাছ রোপন করেন, তাতে বিশেষ আপত্তি দেখি না। এতে আপনার নিজেরই বিদ্যুৎ খরচ কমবে। না, আপনাকে গ্রীন বিল্ডিং বানাতে বলছি না। কিন্তু, একটা সোলার প্যানেল বসিয়ে, কিছুটা বিদ্যুৎ খরচ কম করতেই পারেন। এতে কয়লা পোড়ানো একটু হলেও কমবে। দুনিয়াতে এমন কোনো মেশিন বার হয়নি যে, একদিনে কার্বন ডাইঅক্সাইড দিলে, আরেকদিকে সোনা বেরোবে। বিন্দু বিন্দু করেই সিন্ধু হবে। আপনার এই একটু কার্বন কমানো, একটু গরম কমাতে অবদান রাখবে। কম গরম হলে ফ্যান চালানোর খরচ কম … এভাবেই চক্রাকারে লাভ করতেই পারি।
গত কয়েকবছরে জিরো ডে শব্দটা বেশ উঠেছে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট খেলা কেপটাউনে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। কারণ, জল নেই। আমাদের বৃষ্টি খুব কম হয় না। তারপরেও ক্ষরা হয়। কারণটা খুব সহজ – মাটির তলায় জল যায় না। ঘরে তো একটা সোকপিট বানানো যায়। আমাদের ডাঙ্গায় ছোট ছোট আইল বানানো যায়। অনেকটা জল বেঁচে যায় দেখবেন। রিসাইকেল করার মতো ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বলব না। কিন্তু, এইটুকু তো করাই যায়।
শহরাঞ্চলে, বিশেষতঃ সমভূমি এলাকায় সাইকেল চালানো সুবিধাজনক। সত্যি বলতে কি, আমরা একটু টাকার গর্ব করি। আমার টাকা আছে, বাইক না কিনলে সম্মান থাকবে না। আরেকটু টাকা জমলে, সেটা পাল্টে চার চাকার গাড়ি হয়ে যায়। আপনাকে, গাড়ি কিনতে মানা করছি না। কিনুন। একটু কম ব্যবহার করলে আপনার (স্বাস্থ্যের) আমার (পরিবেশের) সবার লাভ। দেখা গেছে, গাড়ি শিল্প সবরকম ভাবে ক্ষতি করে। একটু চেষ্টা করুন না, কম দূরত্ব ও কম কষ্টের রাস্তা গুলো সাইকেলে যেতে। এমনিতেই কলকাতা শহরের গড় গতিবেগ ৩০ কিমি। সেখানে সাইকেল চালানো খুব একটা ধীর গতির নয়। করোনা পরবর্তী সময়ে, সাইকেল জনপ্রিয় হচ্ছে। সরকার যদি একটা সাইকেল লেন চালু করে শহর এলাকায়, তাহলে সোনায় সোহাগা হয়।
মাঝি সিনেমার ওই কথাটা বড় মনে পড়ে – “ভগবানের ভরসায় অপেক্ষা করো না। কে জানে, ভগবান তোমার অপেক্ষা করছে”। তেমনি সরকার করবে কিনা, সেটা অপেক্ষা করে বসে থেকে কি করব। নিজেরাও অল্প অল্প করতেই পারি। জল বায়ু আর মাটির সাথে দৈনন্দিন আমাদের মেলামেশা। এজন্য বিশাল কিছু দরকার নেই। নিজেদের সাধ্যের মধ্যেই সুখ স্বাচ্ছন্দ্য জারি রেখে সম্ভব। চার্লস কোরিয়া নাহয় ভারতীয়। লরি বেকারের মতো বিদেশি লোকও বলছেন, স্বদেশী আপনাও। দেশীয় মালমসলায় করা বাড়ির খরচ উনি বলছেন কম হয়। ইঁদুর ফাঁদ বানিয়ে ঘরের বানানোর আর মেরামতের খরচ কম বলছেন। একটু একটু করে আমরা আত্মনির্ভর হয়েই যাই না। দিনের শেষে লাভ তো সকলের।

Leave a Reply