অমর শহীদ রঘুনাথ মাহাত : জীবন ও সংগ্রাম

Editorials, Our Voice

প্রদীপ মাহাত (ডুমুরিয়ার): ছটনাগপুরের এই বৃহত চড়াই উতরাই কঠিন পাথইরা মাটিতে সাল, মহুল, কেন্দ, ডেলা, ভেলা, শিমুল, পলাস, পিয়াল, আম, জাম ,বড় ,জইড় ,কুইল, কাঁঠালের সুশোভিত গন্ধে ভরা গহন অরণ্যে স্বাপদ সঙ্কুল বাঘ ,ভালুক, হরিণ, হাঁতি, লাকড়া, খেঢ়া, হুড়াইর, আরও বিভিন্ন ধরনের পশু পাখির কাঁসাই ,সিলাই, সুবননখা, গুয়াই, দামুদর, কুমারি, কুবাই, মেঝিয়া, নদি নালা আর পাহাড় বেষ্টিত এই ভূমিতে আদিবাসী কুড়মি জনগোষ্ঠী সমেত অন্যান্য হিত মিতান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের আদিভূমি। এই ভূমিতে চাষবাস,বসবাস ও নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের জন্য তাদের সুশোভিত পবিত্র শাল বৃক্ষকে প্রকৃতির সেবকরা আরাধনার জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সারনা থান/জাহির থান।রাঢ়ের সংখ্যাধিক্য কুড়মি জনগোষ্ঠীর মানুষেরা অভ্যন্তরীণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা কায়েম ছিল। এই শাসন ব্যাবস্থায় বিভিন্ন ধরনের পদ ছিল তার মধ্যে অন্যতম একটি পদ ছিল কোনো গ্ৰামের গন মান্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির পদ। সেই পদটির নাম, মাহাত/মাঝি/মুড়া/মানকি/সরদার এই পঞ্চ পদ গুলো আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিয়োগ হয়ে থাকতো।” মাহাত ” পদটা সংখ্যাধিক্য কুড়মিরা ছিল বলে পরবর্তীতে সেটাই পদবি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। তার আগে কুড়মিরা সিং,সিং দেও, প্রভৃতি এবং নিজ গুষ্ঠির নাম ব্যবহার করতেন।এই ভূমিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আর্যদের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল।ভারত বর্ষে আর্য আক্রমনের প্রায় 1500 – 1800 বছর পর ছটনাগপুরের এই রাঢ়ে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।রাঢ়ের মানুষ আর্যদের পিছনে পোষ্য লাকড়া,হুঁড়াইর লেলিয়ে দিতেন। এই কঠিন মাটির কঠিন মানুষের সরল হৃদয়কে সহজে বিদেশিরা জয় করতে পেরেছিলেন।

এই সহজ সরল হৃদয়কে জয় করলেও রাঢ়ের মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন।পরবর্তীতে ভারতের মাটি থেকে ব্রিটিশ শাসকদের উৎখাত করতে নিজ মাতৃভূমির জল,জমি ,জঙ্গলের লড়াইয়ে এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথ দেখানোর ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা ক্রান্তিবীর রঘুনাথ মাহাত রাঢ় ভূমির নিজ মাতৃভূমি কে তার ভালোবাসা ও আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে সাহসিকতার সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে “প্রথম শহীদের “একটি অবিস্মরনীয় নাম। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ‘চুয়াড় বিদ্রোহে’ 1769 – 1799 সালে বিদ্রোহের প্রকৃত নেতা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম নায়ক। বীর নায়ক রঘুনাথ মাহাত তদানীন্তন সময়ে বিহার রাজ্যের অন্তর্গত (বর্তমান ঝাড়খণ্ডের) সরাইকেল্লা জেলার নিমডি থানার ঘুঁটিয়াড়ি গ্রামে 1738 সালের 21 শে মার্চ তারিখে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিল কাঁশীনাথ মাহাত , মায়ের নাম করমি মাহাত।রঘুনাথ মাহাত ছোটো থেকে সাল, মহুল, পলাশের প্রকৃতিক সৌন্দর্য্যে বড় হয়েছিলেন।কুড়মি জমিদারি প্রথা এবং তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা তাহাকে অনুপ্রাণিত এবং অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বলিষ্ঠ হতে নিজেকে যথাযোগ্য মর্যাদায় ভুসিত করেছিলেন।আর উদার প্রকৃতি মাতার ভূমিতে জন্ম ও জমিদারি প্রথার গাম্ভীর্য, সাহসিকতা ও খিপ্রতা তাকে তেজীয়ান বুদ্ধিদীপ্ত ও বীরযোদ্ধায় পরিনত করে তুলেছিল। তিনি ঘুঁটিয়াডি ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মৌজায় মালিক ছিলেন। বাপ ঠাকুরদার জমির উপর রাজস্বের বোঝা চাপিয়ে দিলে রঘুনাথ মাহাত অস্বীকার করে নিজ গ্রাম ছেড়ে পায়ে হাঁটা পথ ধরে সেই সময়কালে বাংলার মেদিনীপুর, বিহারের নিমডি, পাতকুম, বরাভূম, ধলভূম, কিংচুগ পরগনা এবং উড়িশ্যার বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করে সংগঠনকে মজবুত করে এক বিরাট আকার আন্দোলনের রূপরেখা কে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি 1769 সালে ফাল্গূনি পূর্ণিমার দিন ঝগড়ু মাহাত, বুলি মাহাত, পুলকা মাঝি, শঙ্কর মাঝি, ডমন ভুমিজ এদের সক্রিয় সহযোগিতায় লাঠি তীর ধনুক ফারসা,টাঁগি, তরোয়াল প্রভৃতি নিয়ে পাঁচ সহস্রাধিকের বেশি বিপ্লবীদের ছটনাগপুরের পাহাড়িয়া অঞ্চলের চিরাচরিত ঐতিহ্যবাহী বিশেষ রণকৌশল পদ্ধতি ” গুঁড়ুর ঘেরা ” আক্রমণে(গেরিলা আক্রমণ ) ইংরেজদের নিমধুল কেল্লা উড়িয়ে দেন।এরি পক্ষান্তরে ইংরেজ সৈনরা নরসিংহগড়ে পালিয়ে যায় । পালিয়ে গিয়েও 1774 সালে বিদ্রোহিরা কিংচুগ পরগনার পুলিশি হেড কোয়ার্টার আক্রমণ করে অত্যাচারী গোরাদের হত্যা করেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে, ব্রিটিশ সরকার ছোটনাগপুরকে পাটনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের প্রশাসনিক সুবিধার্থে যুদ্ধের রনকৌশল সুচারু করার জন্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মধ্যে অন্তর্গত করেন। বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান সিডনি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মাস্টার মাইন্ড আন্দোলনের তরঙ্গকে রাঁচী জেলার সিল্লীতে সরিয়ে আনলে গামহারিয়া সোনাহাঁতু, বুন্ডু, তামাড়, প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সিল্লীর লৌটাকিতা গ্রামে রামগড় পুলিশের ছাউনির আক্রমণের “নীল নকশা” তৈরি হয়েছিল, কিন্তু 1778 সালের 5 এপ্রিল ইংরেজরা অতর্কিতে “গুড়ুর ঘেরা ” আক্রমণ ( গেরিলা আক্রমণ ) চালালে রঘুনাথ মাহাত তীর ধনুক নিয়ে রুখে দাঁড়ান এবং ইংরেজরা তাকে ঘিরে নিয়ে গুলিবিদ্ধ করেন , আর নিজের জন্মভিটার রাঢ় মাটির কঠিন পাথইরা ভূমিতে ঢলে পড়ে তিনি শেষ বারের মতো তাঁর সহযোগীদের বলেছিলেন,
“হামর মরল বাদেউ তহরা লঢ়াই চালাই জাবেহে ” মনে রাখিহা শির শিখর নাগপুর আধাআধি খড়গপুর “, এহেটাই হামরাক ছটনাগপুর।” আপন মুলুক আপন রাজ ধুর খেদা বিরটিস রাইজ “।

রঘুনাথ মাহাত নিজের মাতৃভুমিকে স্বাধীন করার জন্য এবং জমি রাজস্বের বিরুদ্ধে প্রথম আঘাত হেনেছিলেন যা, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য বীজ বপন করেছিলেন।সার্বিক ভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে রঘুনাথ মাহাতর বিদ্রোহ” চূয়াড় বিদ্রোহ”(1769-1799) বললে ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হবে বলে মনে হবে,কারণ” চুয়াড় ” শব্দটি কুড়মালি শব্দ। চুয়াড় শব্দেক বিশ্লেষণ করলে দাঁড়াবে ” চুঁইআইড়”অর্থাৎ চুঁই +আইড় = চুআড় ।” চুঁই ” শব্দের অর্থ জল উপর থেকে নিচে গড়িয়ে পড়া , আর “আইড়” অর্থে পাহাড় বা উঁচু জমিন।এক কথায় বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে

Leave a Reply