মদনা ছঁড়াদের দৌরাত্ম্য : অপমান বাড়ছে টুসুমণির

Language & Tradition

সাধন মাহাত: যে দেশে রক্ত মাংসের মায়ের (নারী) সম্মান‌ই নেই, সেখানে মানস কন্যা অথবা আদরের দেবীর সম্মান আশা করা মনে হয় ভুল। একদিন কথা হচ্ছিল, ইচাগ ক্ষেত্রে সাঁওতালদের সে‌ইভাবে চোখে পড়ে না। কেন, তাদের‌ই দে‌শ ভুঁইয়ে তারা নেই কেন? প্রচলিত কাহিনী, তবে কতটা সত্যি জানি না। সত্যি বলেই বোধ হয় অবশ্য। বার বার মদনা ছঁড়াদের কারনে টুসু মনিকে, সতীত্বের পরীক্ষায় অবতীর্ন হতে হয়। ইচাগ অঞ্চলের টুসুমনি সতীত্বের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল কিনা জানিনা; তবে যাতে আবার এই পরিস্থিতিতে পড়তে না হয় তার জন্য সমস্ত সাঁওতাল ভাই বোন – দুঃখে, অপমানে সভ্রম বাঁচাতে ইচাগ ক্ষেত্র ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। কাহিনী: সেই সময় ইচাগের রাজা নাকি এক সাঁওতাল বোনকে বলপূর্বক ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। ঘটনা যাই হোক, এখনো নিজের মা বোনের সম্ভ্রম বাঁচাতে নিজের প্রান‌ও বাজি রাখতে। তবে মদনা ছঁড়াদের তো কোন দেশ নেই – তারা সর্বত্র‌ এক। তাদের কোন মা বোন‌ বোধ নেই। তাদের একটাই পরিচয় তারা ধর্ষক! তারা বিকৃতকামী। সর্বত্র। তা সে জনগনের সম্মুখে হোক কিংবা কলমের ডগায় হোক।

আর এই কারনে, নারীকে বারবার নিজেকে বাঁচাতে-নিজেদের বাঁচাতে, নিজেদেরকেই আত্মহূতি দিতে হয়। এ যেন তাদের‌ই সম্ভ্রম! আর আমরা মদনা ছঁড়ার ধমসার তালে তালে, নাচতে নাচতে ঘোর। নিজের কাপড়‌ও যে খুলে পড়েছে সেদিকে খেয়াল নেই। টুসুমনি সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ঝাঁপ দিয়েছে সুবর্নরেখায়। আমরা বলছি না এ রকম কোন ঘটনা ঘটেনি; শুধু শুধু না জেনে ঢপের গবেষকরা এসব উল্টোপাল্টা লিখে চলেছে। চারদিকে যা ঘটে চলেছে ‘সভ্য’ সমাজে, তাতে ঐতিহাসিক কালে এসব ঘটনা ঘটা তো মামুলি ব্যাপার। বর্তমান সময়ে ধর্ষকদের শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও, সেই সময় জোতদারদের বিরূদ্ধে মুখ খোলা তো আত্মহত্যার সামিল। সুতরাং সামলে চলো – মুখ বুজে থাকো। আর আমাদের টুসুমনিরা আত্মহূতি দিক; ঝাড়গ্ৰামে পুরুলিয়ায় কিংবা মেদিনীপুরে। এ শুধু কথার কথা নয় এভাবে চলতে থাকলে, আরেকটা সতীঘাট গড়ে উঠতে খুব একটা সময় লাগবে না। আর আমরাও মেতে উঠবো মেলা-পার্বণে। আসবে সরকারি অনুদান। আসবে আমাদের মা বোনেরা। মঞ্চে মাইক নিয়ে উঠবে, মদনা ছ‌ঁড়া। ধমসা বাজাবে, মাদৈল বাজাবে। নাচবে, গাইবে। চৈখ ঠারবে। আমরা কোমর হিলাব, কুলকুলি দিব। আর হামদের টুসুমনি…!

এক সড়পে, দুই সড়পে, তিন সড়পে লক চলে

হামদের টুসু ম‌ইধে চলে, বিন বাসাতে গা দলে।

শস্যের দেবী। ক্ষুধার অন্ন। সম্মানের ঘেরাটোপে যার আসা যাওয়া। তাকে নিয়ে অশালিন ইঙ্গিতে, তার ভালবাসার মানুষজনের গায়ে লাগে বৈকি। ধর্ষকের তাতে কি!! তোমাদের টুসুমনিকে তারা টেনে হি‌ঁচড়ে আসরে নামালেও তোমাদের কিছু বলার নেই। তোমরাই তো ঝাঁ চকচকে চেহরা দেখে ,তাদের ডেকে এনেছো। এখন বলা বৃথা। টুসু নয়, এখন নিজের সম্ভ্রম বাঁচানোও দায় হয়ে পড়েছে। যেখানে পেট চালাতে ‘মূলুকে নাই কাম’ হিল্লি দিল্লি করে বেড়াচ্ছি, সেখানে সংস্কৃতির খবর বিলাসিতা। সম্মান বেচেই ,বেঁচে থাকা – কাক শকুনের উচ্ছিষ্ঠ খেয়েই বেঁচে থাকা। চোখ কান বুজে মেনে নেওয়া। যে সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য রঘুনাথ মাহাত, সিধো, কানহু, বিরসা শহীদ হয়েছেন – সে বোধ‌ই বা কোথায়! সব অপমান ভুলে যাওয়াই, মঙ্গল। সব অপমান হজম করে নেওয়াই, কাজের কাজ। শুধুই হাতে হাত মিলিয়ে ,হাততালি দেওয়া।

মদনা ছঁড়ারা পার পেয়ে যায়, টুসু মনিরা অপমানিত হয়-লাঞ্ছিত হয়-ধর্ষিতা হয়! হচ্ছেও। আমরা দিব্যি আছি, রসে বসে – উন্নয়নের দিবাস্বপ্নে। স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা, মদনা ছঁড়াকে উন্নয়নের ভার দিয়ে, পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। আমরা ভাতা-র লাইনে ভিড় করি। রাস্তায়-ঘাটে সভা-সমিতিতে মিছিলে-মিছিলে, তাং ধাতুং-এ মেতে উঠি। এ সংস্কৃতি কুড়িয়ে পাওয়া। তাকে নিয়ে, যা ইচ্ছা করা যায়। লোকসংস্কৃতি! তা নিতান্ত‌ই হেলাফেলার যোগ্য। এত এত মানুষের ভাবাবেগের মূল্য‌হীন।

টুসু আর মদনা ছঁড়া প্রতীকী মাত্র। সর্বত্র এক‌ই দামামা। লোকসংস্কৃতির নামে, মানভূমের নামে, জঙ্গলমহলের নামে, আদিবাসীর নামে বিকৃত মনস্কতার পরিচয়। ডিজের বিকট আওয়াজে ফিকে হয়ে পড়ছে ‘ইঁদুর পিঠা’র মিঠা সুয়াদ। সংস্কৃতকরণের ঠেলায় পেছনে পড়ে যাচ্ছে, বাঁদনা- করম- টুসু। কাঁসাই ধারের আড়বেলার বাঁশিও নেই। হাসিও উধাও। টুসুভাসানে গিয়ে আমরা নিজেদের ভাসিয়ে ঘরে ফিরছি। ঘরে ফেরার তাড়া। হাতে হাতে আনন্দ। মদনা ছঁড়ার হাতে ধমসা, মাদৈলের ভার দিলে যা ঘটার তাই ঘটছে। পাতে পাতে উন্নয়ন!

সম্ভ্রম বাঁচাতে শুধুমাত্র কি টুসুধনিকেই আত্বহুতি দিতে হচ্ছে? আমদের‌ও ভিতর ঘরে টান পড়েছে। ধন-যৌবনের ঠেলায় ভুলে যাচ্ছি, ভূত-ভবিষ্যৎ। পূর্বপ্রজন্মের হাতে লালিত সমাজ সংস্কৃতি, আজ চরম সংকটের মুখোমুখি। উন্নয়ন আমার সব নিয়েই, সবাইকে নিয়েই। উন্নয়ন মানে সব কিছু ভুলে যাওয়া নয়। টুসুও নাচবে সেই উন্নয়নে, আমার মা বোনের সাথে। চোখে চোখ রেখে বলবে, তার অভাব অভিযোগ বঞ্চনার কথা। যে অভাবে চা বাগান থেকে শুরু করে নামাল খাটতে যায়, আমাদের টুসুমনি। সেখানে সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয়নি। সমস্ত অভাব অভিযোগ নিয়েই, আমাদের সাথে সুখে দুঃখে সমব্যথী। তাহলে তাকে মদনা ছঁড়ার সাথে জনসভায় নাচতে হবে কেন! আমরাই কি দায়ি! কোথাও টুসুধনির সাথে আমাদের বাঁধনটা আলগা হয়ে পড়েছে। আজকে তাই, আমরা প্রতিবাদে সামিল হতেও ভয় পাচ্ছি। পাছে কোন প্রকল্প থেকে আমার নামটা বাদ চলে যায়। হায়রে আমার সংস্কৃতি বোধ – হায়রে আমার বেঁচে থাকা। শেকড়হীন। যেখানে ফুলজলের সিঞ্চন নেই – প্রেম নেই – ভালবাসা নেই : শুধুই গড্ডালিকা প্রবাহে হেঁটে যাওয়া। উইঢিপিকে পাহাড় বলে প্রণাম নিবেদন। যার সমাজ সংস্কৃতির প্রতি ন্যুনতম মমত্মবোধ নেই, তার কাছে নিঃস্ফল আবেদন নিবেদন। আমরা আছি, তোমার শয়নে স্বপনে- নিশি জাগরনে। যে জাগরনের ঘড়িটাও তার ভারাভারে। স্বপন‌ও তার হাতে। পথে ঘাটে তার‌ই হাতছানি। উধাও হতে চলেছে বুঢ়ি বাঁদনার রাত। বেদখল হতে বসেছে পরব টাঁইড়। এখন আমার পরব তোমার গরব নয়, বরং তোমার পরব আমার গরব! উড়োখ‌ই গোবিন্দাই নমঃ। তোমার হিজিবিজিই আমার সংস্কৃতি, আমার আনন্দ-বিষাদ, আমার ভবিষ্যৎ, মদনা ছঁড়ার কাঁধে হাত। ধমসা মাদৈলে উথাল পাথাল, আর টুসুমনি মনগুমানে আসরের একধারে। মদনা ছঁড়া টেনে নামায় আমাদের‌ই প্রশ্রয়ে।

চৈখের মনি টুসুধনি কৈলকাতা যায় মিছিলে…

চৈখের কাজল। মা বলা ধন। পথশ্রমে আকুলি বিকুলি। নিজেকে কূনজর থেকে আড়াল করাও মুশকিল। যার চোখ জুড়ানো রূপের বাহারে চোখ ঠিকরে যাওয়ার জোগাড়, সেখানে মদনা ছঁড়ার চোখ আটকাবেই। দোষ তো আমাদের‌ই। যেখানে আমাদের দেবী নিজের মহানুভবতায় সমস্ত আড়াল আবডাল ছেড়ে সঁগের সঁগতি হয়েছে তাকেও কিনা মিছিলে হাঁটতে হয়! মদনা ছঁড়া হাত ধরে টানাটানি করলেও কিছু করার নেই, মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়া ছাড়া। মাথা উঁচু করলেই উন্নয়নের দাবড়ানি। দুবেলা পেটের মাড় তো পেয়েছো, আবার কি! উন্নয়ন চলছে। আর আমাদের সন্তান সন্ততি, এখনো সমানতালে দেশান্তরি।

শুধু মদনা ছঁড়াকে দোষ দিলেই হবে না। আমাদের দুয়ারের আগলটা আলগা হয়ে পড়েছে। দ্বার রক্ষীরাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সরকারি আনুকুল্যে তারা নিশ্চিত, ঘুম থেকে উঠে পড়লেই তাদের চাকরিটা যাবে। নিশ্চিত জীবন যাপন থেকে, আবার মাঠে মাঠে ভেড়া চরানো। রোদে জলে পুড়তে হবে, ভিজতে হবে। আহারে সাধের দেশসেবা! শ্যাম রাখি না কুল রাখি।

সুতরাং ধরো ঝান্ডা। শীত ঘুম থেকে এবার জেগে উঠার পালা। মাঠে মাঠে ঝুমৈর নাচ, করম নাচ আর মদনা ছঁড়ার তালে তালে জিন্দাবাদ। প্রকল্পের আনাগোনা। উন্নয়নের ধ্বজা। সম্ভ্রম আবার কি বস্তু! স্বাধীকার‌ই আবার কি! বোধ‌ই আবার কি জিনিস! সমস্ত জলাঞ্জলি দিয়েই আমার উন্নতি। উন্নয়ন!

2 comments

Leave a Reply