আমাদের হৃদয়ের পদধ্বনি, আমাদের লোকগান

Editorials

তরুন মাহাত: কবে ,কোথায়,কিভাবে লোকগানের উদ্ভব হয়েছিল তা আজ বলা মুসকিল।তবে অনুমান করা যেতেই পারে পৃথিবীর কোনো এক কোনায় সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর একদল মানুষ সমবেত হয়ে সন্ধ্যায় খালি গলায় তাদের ইশ্বরের কাছে ধন্যবাদ জানাতে অথবা সুন্দর আগামীর প্রার্থনায় যা গেয়ে উঠেছিল তায় কালক্রমে লোকগানের রূপ ধারণ করে।
ঠিক যেভাবে কোনো আফ্রিকান ক্রীতদাস কাজের ফাঁকে ক্যানেস্তারা বাজিয়ে গেয়ে উঠেছিল”Here we all work long the Mississippi”(Ol’ man river,/Paul Robson) বা আমাদের এই ছোটনাগপুর মালভূমির কোনো এক নদীর ধারে কোনো এক হতভাগ্য কৃষক গেয়ে উঠেছিল দুকলি ঝুমৈর-

“লদীর ধারে চাষে বঁধু মিছাই কর আশ
ঝিরিঝিরি বাঁকা লদী বইছে বারমাস।।”

এভাবেই আবহমান কাল ধরে মূহুর্তে মূহুর্তে তৈরি হয়েছে লোকগান যা ঠিক নদীর মতই ধাবমান।
এক কথায় বলা যেতে পারে লোকগান আসলে জীবনের গান, যাপনের গান।সমবেত ভাবে বা কখনো একা মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বিষাদ মাখা দিনরাতের মনের ভাবের বহিঃপ্রকাশের এক মাধ্যম লোকগান।
ঠিক এ কারনেই আমাদের বিস্তীর্ন ছোটনাগপুর কোনো গোঁফ গজানো সদ্য যুবক মাদলে ধাতুং তুং বোল তুলে সগর্বে বলে উঠতে পারে সেনগে সুসুন কাজিকে দুরাং(প্রাচীন প্রবাদ/কুরুক ভাষা)।তারপরেই পাতা নাচের আসরে নিজের প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে মন খুলে গেয়ে উঠতে পারে-

“বাসিভাতে নুন লঙ্কা লুচির মজা পুরি হে
লৌতন পিরিতির মজা আঁখি ঠারাঠারি হে।।”

হ্যাঁ, এটাই লোকগান, সহজ সরল,ঠিক আমাদেরএই মানুষগুলির মতই।আমাদের যেমন দুঃখ আছে তেমনি সুখ আছে, যেমন বিষাদ আছে তেমনই আনন্দ আছে ।তাই হয়তো আমরা আড়বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে এসব পাশে রেখে গাইতে পারি জীবনের গান।ভালো দিনের আশায় দুবাটি মাড়ভাতের আশায় গেয়ে উঠি-

“চল মিনি আসাম যাব
দেশে বড় দুখ রে”
আবার সুখের স্বপ্নভঙ্গ হলে আমরাই গেয়ে উঠি-
“পাহি পাহি পাতা তুলি টকরি ভরাই
হায়রে হায়রে হায়
এ সখী,জিয়ে কি উপায়?”

অথবা-

” হায় যদুরাম,ফাঁকি দিয়ে চালালি আসাম”

আমাদের যেমন দুখে সুখে গান তেমন পূজা ,প্রেমেও গান।করম পরবে শষ্য দেবতার কাছে আমাদের প্রার্থনা আমরা পৌঁছে দিই গানে গানে। সুরে ছন্দে।যেখানে ফুটে উঠে সহজ সরল আর্তি আমার সন্তান যেন থাকে মাড়েভাতে।টুসু পরবে টুসুকে মাতৃরূপে,কন্যা রূপে, সখী রূপে ঘরে বরন করে গেয়ে উঠি এই গানেই-

“বেলা উঠে ঝিকিমিকি তবু টুসু আল্য না
আস্য টুসু চেতন কর,আমায় জ্বালা দিও না”
(টুসুগান)

অথবা

” হামদে মনের এই বাসনা
টুসুধনকে জলে দিব না”
(টুসুগান)

এই আমাদের পূজার মন্ত্র,এই আমাদের পূজার গান।
আবার প্রেমেও এই গান সমানভাবে অনুঘটক স্বরূপ বিদ্যমান।তায় কোনো কর্মমুখর দিনে ব্যাস্ততার ফাঁকে নদীর পাড়ে বিস্তীর্ণ বালুচরে সোনার কনা সন্ধানী কোন পুরুষ তার ভালোবাসার নারীর জন্য গেয়ে উঠে-

“জনম পিরিতি,মরন পিরিতি
সনাকনাই গো,গহনা গো
গুনমনি গো,তখে দিব গড়হাঁয়”
( রচয়িতা সুনীল মাহাত)

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন এই পিরিতি আজকের না।যুগ যুগ ধরে কাঁসাই, কুমারী, টটকো,ডুলুং এর ক্ষীণ স্রোতে কখনো বা হড়কা বানে প্রবহমান এই পিরিতি।এই পিরিতি যেমন মানুষে মানুষে,তেমনি মানুষে গানে,মানুষে জীবনে।
আর সাহিত্য গুন বা সাহিত্য রসের কথায় যদি বলতে হয় তবে এখানেও কিন্তু এই লোকগান তার স্বমহিমায় বিরাজমান।

“মেঘ আঁধারি রাতি বিজুরি চমকে”
কিম্বা
“মেঘের মাদলে নাচে মনের ই ময়ূরী
নিয়েছে আমার মন না দেখা সুন্দরী”
(রচয়িতা সুনীল মাহাত)

এরকম সুন্দর পদও লক্ষ করা যায় আমাদের লোকগানে।
এখন এরকম রূপে গুনে ভরা আমাদের জীবনের জীয়নকাঠি স্বরূপ এই গানকে বর্তমানে কিছু মানুষ না অনুধাবন করেই কেবলমাত্র লোকগান গাইতে হবে বা লোকগান গাইতে পারি এই ধারনায় সস্তার জনপ্রিয়তার লোভে ভুল সুরে,তালে ,কথায় কখনো বিকৃত উচ্চারনে গেয়ে চলেছে।যার ফলশ্রুতি এই লোকগান তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছে।রংয়ের দুনিয়ায় রিঝ্ ক্রমশ কমতে কমতে তার স্বকীয়তা হারিয়ে আমাদের গান আমাদেরই থাকছে না।
যেমন একটি অতি জনপ্রিয় ঝুমুর গানের বতর শব্দটির পরিবর্তে গতর গাওয়া হয় ,নেংটি ইঁদুর হয়ে যায় নাংটা ইঁদুর। পিঁদাড় কে করে দেওয়া হয়েছে পিন্দার যার কোন অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না।। আবার-

“পেছাপাড়্যা রাজকুমারী গলায় চন্দ্রহার
দিনে দিনে বাড়ছে তুমার চুলেরই বাহার”

এই দুকলির ঝুমুরটির পেছাপাড়্যা শব্দটি পরিবর্তিত উচ্চারিত হয়ে আসছে পেছপাড়িয়া।যার ফলশ্রুতিতে শব্দটি কোনো রকম অর্থই বহন করছে না এবং একই সঙ্গে এই গানটির আসল ভাব নষ্ট হচ্ছে।
পেছাপাড়্যা শব্দটির অর্থ হলো পেছনে দিকের পাড়।এই রকম পাড় যুক্ত শাড়িকে বলা হয় পেছাপাড়্যা শাড়ি।ছোটনাগপুর অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মহিলাদের মধ্যে এই ধরনের শাড়ি পরার চল আজও বর্তমান।এই গানে রাজকুমারীর শাড়ির পাড়কে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে সেই শাড়ির নামেই রাজকুমারীকে সম্বোধন করে সৌন্দর্য বর্ণনা করা হয়েছে।এরকম অনেক উদাহরন বর্তমান।
এটি অসাবধানতাবশত ভুল নাকি ইচ্ছাকৃত তা হয়তো শিল্পী যিনি এই গান গাইছেন তিনি বলতে পারবেন।তবে যখন কোনো শিল্পী এই লোকগান গাইতে এসে নিজস্ব স্বীকৃতি আদায় করার পর রচয়িতার নাম বলতে ভুলে যান বা ভনিতা পদটুকু না গেয়ে গান শেষ করে দেন তখন তো বলতেই হয় এই ভুল ইচ্ছাকৃত।তায়তো অভিমানের কথাও ফুটে উঠে আমাদের গানেই-

আসেছিলে নব্বই সালে
দুটি ঝুমৈর নিয়ে গেলে
ঝুমৈরাকে বাঁচাব বলেছিলে সাঁঝ সকালে
বাবু তরা বেড়ে ঠকালে।।
( রচয়িতা কিশোর গুপ্ত)

তবে যাইহোক বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে সমস্ত লোকগানের গায়ক গায়িকাদের প্রতি অনুরোধ যে কোনো লোকগান গাইতে আসার আগে গানটাকে ভালোবাসুন, এই জনজীবন এই যাপনটাকে ভালোবাসুন।একটু পড়াশোনা করে মঞ্চে উঠুন দেখুন কেমন এ গান সবচেয়ে আগে আপনার মনেই অনুরনন তুলে দেবে।নইলে ওই ফাঁকা হাততালি আর কিছু মদনা ছঁড়ার কুলকুলিই পাওনা হবে ,বুকপকেটের নীচে যে হৃদয়প্রাপ্তি সেটা কিন্তু অধরাই থেকে যাবে।

Leave a Reply