কে ছিলেন নিরঞ্জন মহারাজ?

Our Voice

একলব্য মাহাত : বর্তমান সময়ের কুড়মি যুবরা বিভিন্ন সময়ে নিরঞ্জন মহারাজ কে সমালোচনা করছেন এবং করছেন। আজ এই যে কুড়মি সমাজের খারাপ অবস্থা চলছে , আদিবাসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছে কুড়মী সমাজ। কুড়মী সমাজের কিছু মানুষ হিন্দু রীতিনীতি মেনে চলছেন। এর পেছনে নিরঞ্জন মহারাজ এর বিরাট ভূমিকা ছিল।

শিব প্রসাদ মাহান্ত এর ‘The Life Story’ গ্রন্থ থেকে জানতে পারি , নিরঞ্জন মহারাজ এর আসল নাম নিরঞ্জন মাহান্ত। যিনি ময়ূরভঞ্জ এর ভঞ্জকিয়া গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। যে গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন এই শিব প্রসাদ বাবু। এই ভঞ্জকিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় পরবর্তিকালে সরকারি বিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে ১৯০৩ সালে । সেখানে বেশ কয়েকবছর শিক্ষকতা করে বৃহত্তর কাজে অংশগ্রহনের জন্য এই স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দেন। এই ছেড়ে যাওয়া স্থানেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন The Life Story’ গ্রন্থের লেখক শিব প্রসাদ মাহান্ত এর পিতা নবীন চন্দ্র মাহান্ত । চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরেই নিরঞ্জন বাড়ী ছাড়েন । তিন বছর ধরে ঘুরে বেড়ান কুড়মী অধ্যুষিত চার রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায়। সবজায়গায় দেখেন একই চিত্র । বর্নবৈষম্যের করাল রূপ। ব্রাম্ভন্যবাদের করাল রূপ তাকে ব্যাথিত করে। কুড়মীদের এসময় কোন মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হত না। (শিব প্রসাদ মাহান্ত এর ‘The Life Story’) । ব্রাম্ভন বা উচ্চবর্নীয়রা কুড়মীদের স্পর্শ পর্যন্ত করত না।
বৃহত্তর ছোটনাগপুর ছাড়াও নিরঞ্জন ঘুরে বেড়ান ভারতবর্ষের বিভিন্নপ্রান্তে । বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। তার এই দেশ ভ্রমনকালেই তিনি রচনা করেন ‘কুড়মী বংশাবলী ‘ গ্রন্থ। যা পরবর্তী কালে হিন্দি ও ইংরেজিতে অনূদিত হয়। ওডিয়া অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। এই গ্রন্থেই তিনি কুড়মি ইতিহাস লেখেন ।উল্লেখ করেন কুড়মীরা ক্ষত্রিয় , ‘low caste’ নয়। কুড়মিদের ইতিহাস লিখতে গিয়ে তিনি স্কন্ধ পুরানের প্রসঙ্গ টেনে এনে দেখান যে কূর্ম থেকে কুড়মী সম্প্রদায়ের উৎপত্তি। যা ছিল এক ঐতিহাসিক ভুল।

নিরঞ্জন মাহান্ত দেশ ভ্রমন শেষে ভঞ্জকিয়া গ্রামে ফিরলে তার গেরুয়া পোশাক, বাগ্মীতা , নানা কাজকর্মে মুগ্ধ হয়ে গ্রামবাসীরা তাকে মহারাজ বলে ডাকতে শুরু করেন । পরিচিত হন নিরঞ্জন মহারাজ নামে। শিব প্রসাদ মাহান্ত তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন , তিনি এতই বাগ্মী ও শাস্ত্রঞ্জান সম্পর্কিত ছিলেন যে বহু ব্রাম্ভন পন্ডীতই তাঁকে গুরু বলে স্বীকার করেন।

এর আগেই শুরু হয়ে গেছে কুড়মী দের ক্ষত্রিয়করন আন্দোলন । ১৮৯৪ ও ১৮৯৫  সালে দু দুটি মহাসভা অনুষ্ঠিত হয়। ইংরেজ শাসক দের অনুরোধ করা হয় ,কুড়মিদের যাতে ক্ষত্রিয় হিসেবে স্বীকার করে নেয় । প্রমান হিসেবে তারা ইতিহাসের বর্নময় চরিত্র বিক্রমাদিত্য ,Bhoja এবং শিবাজী কে কুড়মী হিসেবে উল্লেখ করেন। তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট লালা খুব চন্দজী মারফৎ ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষত্রিয়করনের আবেদন জানান। তাঁর প্রচেষ্টাতেই মূলত কুড়মীরা রেহাই পাই প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনিতে যোগদানের হাত থেকে । এই সময় অসংখ্য নিম্ন বর্ণের মানুষ কে সেনাবাহিনীতে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ।

নিরঞ্জন মহারাজ পরবর্তীকালে আর্য সমাজে অংশ গ্রহণ করেন । তাঁর বাগ্মীতা ও ঞ্জানের জন্য সারাভারত কুর্মি ক্ষত্রিয় মহাসভা তাঁকে স্বামী নির্ভয়ানন্দ নামে ভুষিত করেন। শিব প্রসাদ তাঁকে একজন মহান সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারক বলে উল্লেখ করেন । তাঁর মতে তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক দুরদর্শী সম্পন্ন ব্যাক্তি। তাঁর বর্ননায় , ‘ very knowledgeable and fearless person who worked for the community and a great orator’ ।

নিরঞ্জন মহারাজ স্বাধীনতা আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েছিলেন ।গান্ধীর স্বরাজ ভাবনা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে গ্রেপ্তারি এড়াতে ময়ূরভঞ্জ ছেড়ে বেশ কিছুদিন বিহার রাজ্যে চলে গিয়েছিলেন। ময়ুর ভঞ্জ এলাকায় সামাজিক সংস্কারের পাশাপাশি ব্রিটিশ দের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্ব পূর্ন ভূমিকা নেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় তিনি গান্ধীজির আদর্শ ও বানি প্রচার করতেন। তিনি ধর্মিয় নেতা হওয়ায় পুলিশও বেশি সন্দেহ করত না। ১৯২৫ সালে গান্ধীজি যখন চাইবাসা আসেন ,লেখক শিব প্রসাদ তখন নিরঞ্জন মহারাজ এর সঙ্গি হয়েছিলেন।

আজ আধুনিক কুড়মী যুবাদের কাছে নিরঞ্জন মাহান্ত খলনায়ক হিসেবে পরিগনিত হলেও, কুড়মী সমাজের নবজাগরনে অন্যতম ভূমিকা নেন তিনি। বর্নবাদ , জাতপাতের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে কুড়মি সমাজ কে ক্ষত্রিয়করনের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন একথা অনস্বীকার্য । কিন্তু, কুড়মী সমাজের মধ্যে তিনি আত্মবিশ্বাস ,স্বাভিমান বোধ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। আদ্যপান্ত কুসংস্কার ও নিরক্ষরতার বেড়াজালে নিমজ্জিত জাতিকে ঞ্জানের আলো দেখিয়ে গিয়েছিলেন। স্বাধিনতা সংগ্রামের এই তাত্ত্বিক নেতা প্রকৃত অর্থেই ছিলেন কুড়মি সমাজের অন্যতম অগ্রদূত।

তথ্যসুত্র -COMMUNITY, CULTURE, POLITICS: THE ‘LIFE HISTORY’ OF SIBA PRASAD MAHANTA – Chandi Prasad Nanda

Leave a Reply