পরিযায়ী শ্রমিক ও সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং

Our Voice

লালন কুমার মাহাত: আমি ‘পরিযায়ী শ্রমিক’| মানুষ কি না সে প্রশ্ন আজ প্রসঙ্গাতীত। আমার হাজার গন্ডা সার্টিফিকেট নেই।কিন্তু, আমার কার্ড আছে। অনেক গুলো কার্ড আছে। রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড। আমার ইনকাম সার্টিফিকেট নেই। এ পি এল সাহেবদের দ্বারা চালানো আই পি এল, প্রিয় দেশে বি পি এল নামেই আমার পরিচয়। বি পি এল বললেই মানুষ বুজে যায় আমার অকাত। জানে আমি জীবনে ব্যর্থ। আমার কোনো রকমে দিন চলে। তার ওপরে আমার আরও একটা পরিচয় আছে। তার জন্যেও আলাদা সার্টিফিকেট আছে। তবে আমরা সত্যি অর্থে সোনার চাঁদ বা সোনার টুকরো। আদার বোকামার্কা কাস্ট – সে তো আপনাদের আদর করে দেওয়া নাম। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি – আমাদের জব কার্ডও আছে। আর একটা কি নাম স্বাস্থ্য সাথী না কি যেন। আমাদের সব অধিকারের কথা নাকি সংবিধান নামক কোনো এক বইয়ে লেখা আছে। মরার আগে সে বইটার মুখ খানা একবার দেখে যেতে চাই।

রেশন কার্ডে অনুরপ্রেরণার উন্নয়নের ভিক্ষে জোটে আমাদের কপালে। চাল, গম – মাঝে মাঝে মাঝে ডাল, চিনিও। আমরা শুধু খেতেই জন্মেছি। আমরা চাষও করি। আমাদের চাষ করা ধানে আমাদের ছেলে মেয়েদেরও খাবার কুলোয় না। আমাদের ছেলে মেয়েরা গাঁয়ের স্কুলে শুধু মিড্ -ডে মিল খেতে যায়। সকালে আই সি ডি এসের রান্না, দুপুরে স্কুলের দু-পৈহরা (মিড্-ডে মিল) এসব খেতে খেতেই বেড়ে উঠে আমাদের ছেলে মেয়েরা। বেড়ে উঠেনা মেধা – কাজ করার ইচ্ছে। আমাদের চাষে যে কম ধান চাল হয় তেমন না। তবে আমরা চাষ করা ধান বিক্রি করি কাপড় পড়ার জন্য। একসময় সারা বিশ্বের নীল যোগান দিতে নীল চাল করেছে আমাদের পূর্বপুরুষেরা – তবুও তাঁদের স্মৃতিতে এখনো অবধি কোনো সরকার কাপড় দেওয়ার কার্ড দিল না। হয়তো দেবে আগামী দিনে।

ভোটার কার্ড আছে আমাদের। ভোটার তালিকায় কোনো ভাগ করে দেওয়া নেই কিন্তু নেতাদের মুখে শুনেছি আমি নাকি অনগ্রসর শ্রেণীর দলিত ভোটারের মধ্যে পড়ি। কি জানি হয়তো ওটা আরও কোনো একটা নাম। আমাদের গাঁয়ের সব নেতা সাহেবরা বলেছিল আধার কার্ড এলে নাকি আঁধার কমবে জীবনে। কিন্তু সে আর হলো কই? তিনবার সংশোধন করেছি। এই কার্ডের সাথে ওই কার্ড, ওই কার্ডের সাথে এই কার্ড জুড়তে কতই না এদিক সেদিক ঘুরলাম।

আমি ওবিসি।
শুনেছি আমার দাদুর বাবা নাকি আদিবাসী ছিলেন। দাদু ছিলেন জেনারেল।
কে জানে হয়তো – চাইলেই বুঝি যাকে তাকে যেমন খুশি যে কোনো আওতায় ফেলা যায়।

আমাদের অবশ্য স্বভাবের একটু পব্লেম আছে।আমাদের জঙ্গল মহলে কয়েক কিমি মাত্র রেল লাইন, মাত্র কয়েকটা হাতে গোনা ট্রেন। তারও কয়েকটা রাজধানীর আগেই থেমে যায়। রাজধানী শহরে ভোর বেলা গেলে সেই মাঝরাত ছাড়া ফেরার উপায় নেই।আমার বাপ্ ঠাকুরদা তো জানলেনই না যে – ট্রেনে কিভাবে চড়তে হয়। জেনেরেল বগিতে চড়া আমাদের অভ্যেস। আমাদের মত অনেক গুলো কার্ড ধারি অশিক্ষিত মানুষদের জন্য যে জেনারেল বগি গুলো থাকে সেগুলো হয় ট্রেনের পেছন দিকে থাকে নয় সামনের দিকে থাকে। কোনো দিন কোনো দুর্ঘটনা হলে, ট্রেনের সাথে ট্রেনের ধাক্কা হলে আমরা যাতে সবার আগে মারা যায় সে পথ একেবারেই সুগম।৭২ জনের কেপাসিটিওয়ালা ট্রেনের কামরায় আমরা ৩৩০ জন আরামসে যেতে পারি। কামরার সব মানুষ গুলোকে কেমন যেন আপন মনে হয় – তাই কাউকে দূরে ঠেলতে ইচ্ছে করেনা। সবাই সবার কাছেই থাকে।

রেশন দোকানের ঠাসাঠাসি ভিড়ে, দু ফোঁটা কেরসিন পাবার লাইনে, ইঁট ভাঁটার ইঁট বইয়ে নিয়ে যাওয়ার লাইনে, ক্রাশারের পাথর ঢালার লাইনে, পাত তোলার লাইনে, ভোট দেওয়ার লাইনে, ব্যাঙ্ক একাউন্ট খোলার লাইনে, জেনারেল বগির টিকিট কাটার লাইনে এমনকি অসুর হত্যা লীলার কাণ্ডারিনি মা দুগ্গার প্যান্ডেল দেখার লাইনেও – কোনো জায়গাতেই দূরে দূরে দাঁড়নোর অভিজ্ঞতা নেই আমাদের। এমনকি হাওড়া স্টেশনে জেনারেল বগির লাইনে ওঠার জন্য যে লম্বা লাইন হয় ভিড়ের চাপে সেই লাইনের বাইরে দাঁড়ানোর জন্য পুলিশের দু -চার ঘা খাওয়ার অভ্যেস আছে আমাদের।

আমাদের ঘরের চারপাশে যে কালো পাথরের ডুংরি আছে, সেসব পাথরের দাম আমার জানা নেই। আমার পূর্ব পুরুষ হয়তো শাল পিয়াল মহুয়ার বাণিজ্যিক দাম জানতেন না, বুঝতেন না বলেই আজকে আমি সোনাঝুরির জঙ্গলে বাস করছি। আমাদের ডুঙরির পলাশ বনে লক্ষ টাকার মেলা হয়, আমার বাড়ি নামো’র পলাশ বনে আকছার পড়ে থাকা পলাশ শিমুল ফুল। এখন আমাজান ফ্লিপকার্টে বিক্রি হয়।আমাদের মনের আনন্দে গাওয়া গান নিয়ে ইউটিউবে ব্যবসা হয় আজকাল। আপনাদের মোবাইল এর ক্যামেরা গুলো বেশ ভালো।

সেই ক্যামেরা আর আমরা আছি বলেই আজকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাদের এতো সুনাম। দান-এর ছবির পোস্টার সাঁটিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।ভাত ছড়ালে কাকের অভাব নেই – আমরা হয়তো মানবরূপী ‘কাক’। যেই আমরা পরিস্থিতির স্বীকারে অধম – অমনি আপনারা নিজেদেরকে উত্তম বলে প্রচার করতে শুরু করে দিলেন।

বিশ্বায়নের ধাক্কায় উপরে উন্নিত হতে পারিনি। নীচে চাপা থাকতে থাকতে কোনো রকমে যেই মাথা ওঠানোর কথা ভাবছি অমনি মাঝখানে শিকেয় ঝুলে যাচ্ছে আমাদের ভাগ্য। আমি যখন উন্নয়নের ধাক্কা আর পেট ভরানো নীতির কথা ভেবে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে যায় – তখন বন্ধুদের সাথে পেটের দায়ে পাড়ি দিই মহারাষ্ট্র, গুজরাট কর্নাটকে। তখন কোন কার্ড টা সাথে নিয়ে যাবো সেটা বুঝতে পারিনা। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকালে শুধু একটা জিনিসই পরিচিত লাগে – আমাদের ডুংরি-র কালো পাথর। মনে পড়ে ক্রাশারের গল্প। কাজ করতে গিয়ে ফুসফুসের রোগে মরে যাওয়া মিচু মুর্মুর গল্প। শুনেছি রেলপথ নামক উন্নয়ন ঝাড়গ্রামের উপর দিয়ে হওয়ার পরেই নাকি জঙ্গমহলের শাল কাঠ পাচার হয়ে যেত ইউরোপে। যারা পাচার করতো তাদের বংশধরেরাই নাকি ঝিলিমিলি, শুশুনিয়া, জয়চন্ডী পাহাড়ে আগুন লাগাচ্ছে। শালী-ডিহের্ জঙ্গলে তাদের নিত্য আনাগোনা। পুলিশ তাদেরকে মনিকা মাহাতোর মৃত্যুর দিনে হারিয়ে যাওয়া মোবাইল খোঁজার দায়িত্ব দিতেই পারে – ইচ্ছে করলে।

সামনে চৈত পরব – এবারের লকডাউন-এ রক্ষা একটায় – মহাজনের নতুন খাতার নেমন্তন্ন পায়নি। ১৪ দিন বাড়ির মধ্যে আলাদা কাটাবো কিভাবে? আমাদের যে লোকের ঘরের আংরা না আনলে আগুন জ্বলেনা – দেশলাই কাঠি থাকেনা যে ঘরে। হাগা ঘর নেই যে আমাদের। গাঁয়ে যাদের আছে – তাদেরই বা জল কোথায় ? সমাধান কোথায়? ঘুপচি ঘরে দুপুর বেলা অনেক গরম লাগে – বাড়ির আম গাছের ছায়ায় গ্রীষ্মের দুপুরে ঘর গুষ্ঠির ঝিমোনোর অভ্যেস সেই বহুকাল থেকেই। জানেন নিশ্চয় শালবনি, পলাশবনি, জামবনি, ধবনী, হলুদবনির ইতিহাস।

আগে চৈত বৈশাখ এলে দু’ চার কলি ঝুমইর, দু’ এক পালা ছো নাচ করে দু’ চার পয়সা আসতো। কিন্তু আজকাল পিঁদাড় কে পিন্দার ও বতর-কে গতর বলা লোকেরা সেগুলো কেড়ে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও মদনা ছোঁড়াদের সাথে আমার ডিনি মাঁইঞকে নাচাতেও কসুর করেনি মুখোশধারীরা। ভট্টাচায্যি বাবু নাকি ছো নাচ আবিষ্কার করেছেন – কলম্বাস আসার আগে কি এদেশ ছিলোনা?

কি আর করা যায় বলুন? যেখানে পুরো হাত পা ঢেকে কাপড় পরা মানুষ দেখে আপনাদের হাসি পায়, ছাগল পালন করলে গেঁয়ো লোক, আর কুকুর পালন করলে সভ্য ভাবেন , শুধু মাত্র গাছ পালা বন জঙ্গলের লিখিত আইন কানুন জানা লোককে পরিবেশবিদ আখ্যা দেন। আর কোটি কোটি বছরের প্রকৃতির পূজারী আদিবাসীদেরকে ঘর ছাড়া করতে ফরেস্ট রাইট এক্ট তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন, সেখানে আর কিই বা আশা করা যায়। আপনারা ঢং করে হিন্দিতে কথায় কথায় বলেন – ডাল মে কুচ কালা হে। কত সাদা চামড়ার চোর দেখলাম এদেশে!

আপনারা ভালো করেই জানেন আমাদের পূর্ব পুরুষেরা সেই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর-এর পর থেকে আমেরিকা, মরিশাস, সুরিনামী, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া এমনকি আসামের চা বাগানে পশু পাখিদের মতোই বিক্রি হয়েছে। আমারই কখনো Indenture লেবার, কখনো ক্রিমিনাল ট্রাইব্স, কখনো দলিত, কখনই হরিজন, কোথাও কোথাও চুয়াড়, কখনো বা মাওবাদী নামে পরিচিত হয়েছি। নুতন নামটা বেশ ভালো – তাইনা ? “পরিযায়ী শ্রমিক”। এমনিতেই পড়াশোনার আলো জ্বলেনি ঘরে, মাতৃভাষায় পড়া শোনা করার অধিকার নেই – তার উপরে এতো ইংরেজি শব্দ – এস সি, এস টি, সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং। ব্রিটিশেরা কি যায়নি এখনো ? হজম হচ্ছেনা যে।

রোগে না ভখে – কোনটায় মরা সহজ একটু বলবেন হুজুর।

One thought on “পরিযায়ী শ্রমিক ও সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং

  • আমার টাইমলাইনে অনেক আগেই বলেছি গরীব মরবে ভখে,বড়লীক মরবে রোগে।করোনার দাদুরও ক্ষমতা নেই কোন গরীবকে মারার।ওদেরকে মারবে লুটেরা নেতারা। তার জন্য দায়ী ওই ভোটাররাই যারা অন্ধের মত না বুঝে ভোট দেয়।

Leave a Reply