ধরিত্রী রজস্বলা হলে

Beyond Borders, Language & Tradition

~ কৃত্তিকা পায়রা

 

 


যাদবপুরে তখন জোরকদমে ন্যাপকিন আন্দোলন চলছে। আমার একটা খটকা লাগল, আন্দোলনের পোষ্টার কাগজে না লিখে ন্যাপকিনে কেন? এটা নিয়ে আন্দোলনকারী দু চারজনের সাথে কথা হল। তারা বললেন, মাসিক ঋতুচক্র নিয়ে taboo (নিষিদ্ধ না বলে ছোঁয়াছুঁয়ি বললে ভাল হবে মনে হয়) দূর করার জন্য তারা এই রাস্তা নিয়েছেন।

আমি বিশ্বাস করতে রাজি হইনি। মাসিক ঋতুচক্র একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটা নিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি থাকবে কিভাবে? ওদের কথা অনুযায়ী আমি দোকানে ন্যাপকিন কিনতে গেলাম। দেখি সত্যি সত্যি কালো প্লাস্টিকে মুড়ে দিচ্ছে!! আমি কোনোভাবেই প্লাস্টিকে নিতে রাজি না। খুব প্রয়োজন ছাড়া দোকানে প্লাস্টিক নিই না। কিন্তু দোকানের কর্মচারী আমাকে ‘কালো’ প্লাস্টিকে মুড়েই দেবে। অগত্যা আমার জেদের কছে হেরে, কর্মচারী অন্যদিকে চলে গেল। আমিও টাকা মিটিয়ে খালি হাতেই নিয়ে এলাম।

কিন্তু, একটা অভিজ্ঞতা হল – ছোঁয়াছুঁয়ি আছে। একটা স্বাভাবিক জিনিস নিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি। যাই বলুন, আমাদের ইতিহাস এই ছোঁয়াছুঁয়ির কত বলে না। বরং তার উল্টো কথা বলে। রজস্বলা হওয়া কে উদযাপন করত (করে) ভারতের আদিম জনজাতি গুলো।

আদিবাসীরা প্রকৃতি পূজারী। পৃথিবীকে মা বলে গণ্য করে। মা একজন নারী। একজন নারীর শরীরে যেমন রজঃচক্র হয়, পৃথিবী মায়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়।
জৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তির পরে ধরিত্রী রজস্বলা হয়। বাকি নারীদের মতোই রজঃস্রাব সাতদিন ধরে চলে। রজঃস্রাব চলাকালীন যেমন নারীর সাথে সঙ্গম নিষিদ্ধ, তেমনি পৃথিবীর রজঃস্রাব চলাকালীন লাঙল চালানো নিষিদ্ধ। রজঃস্রাব শেষ হয়ে যাবার পরে একজন নারী ফলন্ত (fertile) হন। পৃথিবীর রজঃস্রাব শেষ হয়ে যাবার পরে পৃথিবী ভরে ওঠে বর্ষার আগমনে। তার পরেই শুরু হয়, চাষের মরসুম। ফলন্ত হয়ে ওঠে বসুন্ধরা।

ধরিত্রী রজস্বলা হলে খুশিতে ভরে ওঠে কৃষিভিত্তিক আদিবাসী জনজাতি। শুরু হয় উৎসব। শরীর থেকে ‘আম’ অর্থাৎ বিষ চলে গেলে পালন করা হয় আমাবতী। গ্রামে গ্রামে হয় গরাম পূজা। শালগাছের কাছে গিয়ে নিবেদন করা হয়, চাষের ফল যেন ভাল হয়। হাজারবার আগাম বর্ষা নেমে যেতে পারে, কিন্তু আমাবতী পার না হলে, কোনো গ্রামে ধান রোপণ করা হয় না। আগাম বর্ষা যেমন বিরল, তেমনি নারীর রজঃচক্রের দিন পরিবর্তন হওয়া বিরল।

শুধু ছোটনাগপুর নয়, অন্যান্য জায়গাতেও এই নারীত্বের উদযাপন হয়। যেমন কামাখ্যা। প্রতি বছর পৃথিবী রজস্বলা হওয়া উপলক্ষ্যে অম্বুবাচি উৎসব করা হয়। অসমীয়া ভাষা জানি না, তাই অম্বুবাচি শব্দের ব্যাখ্যা করতে পারছি না। আদিবাসীদের বিভিন্ন উৎসবের মতোই একেও হিন্দু রূপ দেওয়া হয়েছে। পৌত্তলিক হিন্দুদের দেবী বলা হলেও, কামাখ্যা মন্দিরে কোনো বিগ্রহ নেই। কেবল যোনী পুজো করা হয়। রজঃস্রাবের সাথে যোনির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন নারীত্বের উদযাপন করেছেন, তখন আমরা একে অছ্যুৎ করছি কেন? রজস্বলা নারীকে অছ্যুৎ করা হলে, আমরা সামাজিকভাবে আমাদের পূর্বপুরুষদের অবমাননা করছি। রজস্বলা নারীকে অছ্যুৎ করা হলে, আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞান কে অস্বীকার করছি। ঐতিহ্য – চিকিৎসা বিজ্ঞান – যাদবপুর বিপ্লব সবাই এক লাইনে আছে। আপনি কি লাইনে আছেন? নাকি রজস্বলার দিনে, লাঙল নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন?

(Photo courtesy:- Biswaranjan Mahata)

Leave a Reply