বেঁচে নেই মনিকা মাহাত| দুঃখ ও ক্ষোভের মাঝেই আজ ভোট জঙ্গলমহলে

Recent

সাধন মাহাতো : উনিশে বৈশাখ ১৪২৬| গরমে পুড়ছিল গোটা পুরুলিয়া| জঙ্গলমহলের রাজনীতির আগুন তখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে| কোথাও জয় শ্রীরাম তো কোথাও মা মাটি মাটি মানুষ| কোথাও কোথাও আবার কাস্তে হাতুড়ির গুঞ্জন| হেভিওয়েট নেতাদের ওজনে কোথাও মঞ্চ ভাঙছে, গোটা এলাকা থরহরি কম্পমান নেতাদের পদধ্বনি ও জয়ধ্বনিতে| মনিকার মোবাইলে তার জনৈক বন্ধুর ফোন আসে| ফোন হয়তো ছিল টিউশন পড়তে ডাকার জন্য| তারপর বেলা ১১ টা নাগাদ জ্যেঠুকে বলে বান্দোয়ানের ভাড়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সে| কথা ছিল টিউশন সেরে নিজের বাড়ি ফিরবে সে| আমরা কথা বলছি মনিকা মাহাতোর| প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বান্দোয়ান পশ্চিমবঙ্গের অন্তৰ্গত পুরুলিয়া জেলার একটি ব্লক শহর| সে বান্দোয়ানের ডঃ অমরনাথ ঝা উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়তো মনিকা মাহাত| থাকতো বান্দোয়ানেই জ্যেঠুর বাড়িতে| বান্দোয়ান থেকে নিজের গ্রাম বড়ো মামড়োর দূরত্ব প্রায় ৫ কিমি| সেদিন ১১টার সময় বেরিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রামে না ফেরায় শুরু হয়ে যায় খোঁজার তোড়জোড়|

কিন্তু কোথাও খুঁজে না পেয়ে শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ| অবশেষে এদিক ওদিক জিজ্ঞাসা করে পরিবারের লোক জানতে পারে যে মনিকাকে শেষ দেখা গেছে দুটো জায়গায়| প্রথমত বান্দোয়ান বাস স্ট্যান্ড এবং চিলা ও বান্দোয়ানের মাঝখানের কালভাটের পাশে| বান্দোয়ান বাসস্ট্যান্ডে মনিকাকে গল্প করতে দেখা যায় হাতিরামগোড়া গ্রামের এক ছেলের সাথে – নাম অরুন মাহাতো, পিতার নাম নবকিশোর মাহাত| সেখানে একজন তৃতীয় জনও উপস্থিত ছিল – তার নাম অরিজিৎ মাহাত| তার বাড়িও সেই অনতিদূরে হাতিরামগোড়া গ্রামে| আর তারপর মনিকাকে বান্দোয়ান ও চিলার মাঝখানে সেতু আছে সেখান থেকে কয়েকজন মিলে জোর করে একটা চার চাকা গাড়িতে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়| তারপর আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি মনিকার|

একজন প্রতক্ষ্যদর্শীর কথা অনুযায়ী সে গাড়িটাও চেনে এবং গাড়ির মালিকের নামও জানে| গাড়ির মালিক বান্দোয়ানের বাসিন্দা এবং প্রতিপত্তিশালী লোক| শাসক দলের নেতাদের সাথে উঠাবসা লেগেই থাকে গাড়ি মালিকের| কারণ জিজ্ঞেস না করে বেশি টাকা নিয়ে গাড়ি ভাড়া দেওয়ার অভ্যেস নাকি বেশ পুরানো| শেষে মনিকাকে খুঁজে না পেয়ে অনেক বাদ-বিবাদ, বাগ বিতন্ডা করে পরিবারের লোক বান্দোয়ান থানায় এফআইআর দায়ের করে| সেখানে গাড়ি মালিকের নাম লিখতে বারণ করে থানার পুলিশ, এমন অভিমতও গ্রামের অনেকের| অবশেষে উপায় না পেয়ে পুলিশের ইচ্ছার মতোই একখানা এফআইআর দায়ের হয় তিন দিন পর| হ্যাঁ, তিন দিন পর| কলকাতা , দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোরের মতো মেট্রো শহরের মানুষের জীবন একটু বেশি দামি তাই হয়তো কোনো ঘটনা ঘটলে সাথে সাথেই নেমে পড়ে পুলিশ| পুরুলিয়ার লোকের জীবন নিয়ে কেই বা ভাবে| দয়ার দানে চাল গম বিলি করা নেতাদের সরকার ও পুলিশ তখন নেতা মন্ত্রীদের রক্ষা দিতেই বেশি ব্যস্ত| নেতারা ব্যস্ত ভোটার প্রচারে| তাই কেই বা রাখে একটা গ্রামের মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার খবর| হাজার হোক ভোটার মরসুম| পাঁচ বছরের জন্য ভাগ্য নির্ধারণে ব্যস্ত চুনোপুঁটি থেকে হেভিওয়েট|

অভিযোগের ভিত্তিতে ও জিজ্ঞাসাবাদের বয়ানে অসঙ্গতি থাকায় অরুন ও অরিজিৎ মাহাতোকে গ্রেফতার করে পুলিশ| ঘটনা বান্দোয়ান থানার সীমানাতে হলেও বাকি সব বোরো থানার সংশ্লিষ্ট বলে বান্দোয়ান থেকে বোরো থানাতে কেস ট্রান্সফার করা হয়| ১০ই মে ধৃতের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় পুরুলিয়া জেলা আদালত| গত পরশু বোরো থানার জামিরা টিলা থেকে মেয়েটির পচাগলা দেহ উদ্ধার হয়েছে| ক্ষোভে ফেটে পড়েছে সারা জঙ্গল মহলের মানুষ| কার গাড়িতে অপহরণ করা হয় মনিকাকে, আর কেনই বা তাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে পুলিশ সে তার কারণ বুঝতে পারছেনা সাধারণ মানুষ| কেই বা গাড়ির মালিক আর কেই বা চালক| ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ছড়িয়েছে চরম আতঙ্ক| টিউশন পড়তে যেতে ভয় পাচ্ছে স্কুল কলেজের মেয়েরা|

নিশ্চয় ভাববেন না, মনিকা মাহাত কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর আগে বান্দোয়ানের এক ওষুধ দোকানে ডাক্তার দেখাতে এসে যৌন নিগ্রহের স্বীকার হয়েছিলেন এক আদিবাসী মহিলা, শুশুনিয়া একলব্য মডেল স্কুলের হোস্টেলে মেয়েদের যৌন নিগ্রহের ঘটনাও সবার জানা, এমনকি হেঁসলা গ্রামে এক আদিবাসী সাঁওতাল মেয়ের নির্যাতনের ঘটনাও বেশি পুরানো নয়| সব ঘটনার‌ই একটা যোগসূত্র বর্তমান। অবহেলিত অবদমিত শোষিত নিপিড়ীত। এমনি অনেক কিছু‌ই বলা যায় হয়তো। তবে কি তাই? অনেক কিছুর উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের। বঞ্চনার নাম‌ই কি নিপীড়ন। শোষনের নাম‌ই কি নির্যাতন। তাহলে এতোদিনের শিক্ষা দীক্ষা কোথায় গেল। না শুধুই দীক্ষিত হয়েছি। উপবীত ধারন করে ব্রাহ্মন হয়েছি শুধু। আচার শিখিনি। গালভরা শিক্ষায় শিক্ষিত সারা দেশ। আমরাও। কোনটা চাহিদা আর কোনটা প্রয়োজন বুঝে উঠতে পারিনি এখনো। দশচক্রে ভগবান ভূত। পাক খাচ্ছি শুধু যূগান্তরের ঘূর্নিপাকে। দিশাহীন সমাজ সংসার। দেশ রাজনীতি। সুতরাং আমার টুকু পেলেই খুশি। তোমার হাঁড়ির খবরে আমার কাজ কি! সর্বত্র এক অবস্থা। শহর হচ্ছে আধুনিক। গ্ৰাম হচ্ছে নাগরিক। ছুয়ে দেখার অদম্য ইচ্ছা। সবাই বলছে আমি ভালো আছি। অথচ কেউ ভালো নেই। অশুভ আঁতাতে সবাই বিপথগামী। কেউ আর গলা তুলে বলতে পারছে না, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’? পাছে উন্নয়নের খাড়া ঘাড়ে এসে পড়ে। মাপকাঠি, ২টাকা কেজি চাল, প্রধান মন্ত্রীর ঘর। খাদ্য শষ্যের জন্যেও যদি থলি নিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়…।

আমাদের ভালোথাকা ওইটুকুই। সব‌ই অদৃশ্য, সব‌ই অদৃষ্ট! আমরা এখনো জাগতে শিখিনি। পাতে যা পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্ট। পুনরায় খাদ্যান্বষনে বেরিয়ে গেছি। এইটুক‌ই। যতো চিল চিৎকার নিজেদের মধ্যেই। অনুকূল থেকে প্রতিকূল সবার‌ই শিষ্য আমরা। অথচ কী আশ্চর্য আমাদের কেউ নয়!

মনিকার খুন। নাকি মৃত্যু। কেন! বিঁধছে আমাদের ভাত কাপড়ের মতো! নাকি শুধুই কলরব। জবাব চাই-র মতো থেমে যাবে না তো সব কন্ঠস্বর আর‌ও একটা চমকপ্রদ প্রকল্পে। সামাজিক নিদান‌ই বা কি। বিচার কী। মোমবাতি জ্বালানো লোকেরাই বা আজ কোথায়? নেই কেন রাস্তায়? গ্রামের মেয়ে বলে? সংবিধান যাদের হাতে কাঠের পুতুল। না , এতোসব আমরা ভাববো না। আজ গনতন্ত্রের উৎসব। অধিকার প্রয়োগের দিন। অধিকার পাওয়ার নয় কিন্তু। যেখানে নায্য অধিকারের জন্য, নায্য বিচারের জন্য পচে মরতে হয় সাধারন মানুষকে। পচে মরতে হয় মনিকাকে|

এদিকে আদিবাসীদের আন্দোলন, সাঁওতালদের আন্দোলন, কুড়মি সম্প্রদায়ের চলে আসা আন্দোলন | রাজনীতি কম হয়নি| সাঁওতাল ও কুড়মি বিভেদ সৃষ্টি করে ভোটের ফায়দা নিতে চেয়েছে রাজনৈতিক দলেরা| কিন্তু বাস্তবের মাটিতে নিগৃহীত, শোষিত হয়েছে কুড়মি সাঁওতাল সবাই| আদিবাসীদের কথা কোন রাজনৈতিক দলের ইস্তাহারে নেই। অধিকারের কথা নেই। বঞ্চনার কথাও নেই। আছে শুধু উন্নয়ন। মানুষ যত তাড়াতাড়ি নিজেদের বঞ্চনার কথা, অধিকারের কথা বুঝবে তত তাড়াতাড়ি বদলাবে জঙ্গলমহল। সামাজিকভাবে একত্রিত হতে না পারলে অধরাই রয়ে যাবে অধিকার। ব্যর্থ হবে রোদে জলে পুড়ে ভোট দেওয়া|

Leave a Reply