মানভূম না প্রবাদভূম? কিছু প্রচলিত প্রবাদ

Literature_of_soil

টীম ছোটনাগপুর ভয়েস : উইকিপেডিয়া অনুযায়ী মানবসমাজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনসত্যের স্মারক কোনো জনপ্রিয় বিদ্রুপাত্মক সংক্ষিপ্ত উক্তিকে প্রবাদ বলে।প্রবাদ ও প্রবচনের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য হলো প্রবাদ লোকসমাজ বা কালের সৃষ্টি। কিন্তু প্রবচন কবি, সাহিত্যিক বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির সৃষ্টি।প্রবাদের কোনো লিখিত ভিত্তি নেই, কিন্তু প্রবচনের আছে। প্রবাদকে বলা যায়, লোকসমাজের অভিজ্ঞতার নির্যাস, একক কোনো ব্যক্তি এর রচয়িতা হিসেবে দাবি করতে পারে না। অন্যদিকে প্রবচন ব্যক্তিগত প্রতিভার দ্বারা সৃষ্ট বাক্য বা বাক্যাংশ। তবে, প্রবচন একসঙ্গে লোকসমাজের অধিকারে চলে আসে।প্রবাদ-প্রবচনের সংক্ষিপ্ত বাক্যে একটি জাতির নানান বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে থাকে।

প্রবাদের অর্থ গভীর ও তাৎপর্যময়। এর তীক্ষ্ণ অর্থভেদী মন্তব্য শ্রোতা ও পাঠককে সহজে সচকিত করে তোলে। এর শব্দার্থ নয়, রূপক অর্থই গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাদের শক্তিই হলো অভিজ্ঞতা ।লোকসমাজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সারৎসার থাকে প্রবাদে। যুগের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় যোগ হয়।প্রবাদ সহজ সরল হওয়ার কারণে তা সহজেই শ্রোতার মনে সাড়া জাগায়। প্রবাদের আলঙ্কারিক গুণ রয়েছে বলে মানুষ তা সহজে ভুলে যায় না। সাধারণত ছন্দ ও অন্ত্যমিলের জন্য বা কখনও উপযুক্ত অনুষঙ্গের জন্য প্রবাদ দীর্ঘদিন মানুষের মনে থাকে।

জঙ্গলমহলের মধ্যে কম বেশি প্রত্যেকেই প্রবাদের সাথে পরিচিত। প্রবাদের কথা বলতে গেলে সবার পহিলে যে প্রবাদ গুলো মনে পড়ে সেগুলো হলো চাষবাস সংক্রান্ত। চাষবাসেই আমাদের জীবন জীবিকার মূল অঙ্গ। হাজার খরা ঝরার মাঝখানে জীবন চলে। জঙ্গলমহলের নদী হয় প্রায় শুকনো আর না হয় হড়পা বানের স্বীকার। তাই কথায় বলে

নদী ধারের চাষ আর মিছাই কর আশ

শুধু কি চাষবাস। চাষবাসের সাথে সাথে পশুপালন এখানকার মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। বাগাইলাদের অবহেলায় অনেক সময় ক্ষেত্রে খামারের কষ্ট করে লাগানো ফসল নষ্ট হয়ে যায় । তাই চাষের জমির চারদিকে বেড়া দিতে হয় ফসল বাঁচাতে।

আগে রঁদ পরে খঁদ

এছাড়াও আরও অনেক কথায় প্রচলিত। যেমন –

ক) চাষের ধান মরাইয়ে যায়
চাকরির ধান চুলহায় যায়

খ) বাপের কালে নাই চাষ
ধানকে বলে ধুপ ঘাঁস

গ) গলা গেল ঘর
হাল উঠাইঁ চল ঘর

ঘ) রোদে ধান, আর
ছাঁইরহায় পান।

সামাজিক সম্পর্ক সংক্রান্ত:

 

১) ঘর আর বর যত সাজাবি সাজা

২) মনে জানে পাপ, আর
মাইঞে জানে বাপ

৩) অড়তল বড়তল সেই বুড়হির পাছাতল

৪) সুখে খা’লে ভূতে কিলায়

৫) কবে পাইকবেক তাল
আছে অনেক কাল

৬) কন বিহাকে দুঘৈড় আলতা

জঙ্গলমহলের বুকে জাতি ও জনজাতিদের সম্বন্ধেও অনেক প্রবাদ শোনা যায়।
যেমন :

১ ) আশায় মরে চাষা
ধেয়ানে মোর যোগী

২) সুঁড়ির স্বাক্ষী মাতাল

৩) বামহুন ঘরে খাবে ভাত
আর গবর দিবে আড়াই হাত

৪) বাঁশ বনে ডম কানা

৫) রাঁড় গরুকে বাউরি বাগাল

মানুষের নিছক বিশ্বাস গুলো নিয়ে যেই একেবারে কোন প্রবাদ নেই তেমন নয়।

১) ঢেইর কামিনের ভাত নাই
অতি সুন্দরীর জাইত নাই

২) ভাদরে বলদ – আঘনে মরদ

৩) কালা কুদরা বাড়ির ভূত
খুকড়া দিলেই চাপচুপ

৪) আইলোরে বাঁদনা, খুখড়ি ছাইয়ের কাঁদনা
গেলোরে বাঁদনা, বিটি ছাইয়ের কাঁদনা

৫) যখন পৈর্তে হবেক শাঁখা
তখন মুখটা কেনে বাঁকা

৬) ধন যৌবন আড়াই দিন
চামড়ার মুখে মানুষ চীন

৭) গাঁ বড় নঅ উপর কুলহি

৮) কন বৌকে বৈলব ভালো
খাতে দিয়ে হাইগতে গেল

৯) যার যখন চলে
তার মুতেও বাতি জ্বলে

১০) থাকিস বিটি সঁইহে
সকৈল যাবেক বঁইহে

এছাড়াও আরও অনেক অনেক প্রবাদ আছে:

১) হা ফাইড়লে ফফস গুনায়

২) হুড়মুড় যাত্তা, যা করে বিধাতা

৩) নাহ্য কথায় বাপ্ও লাট নাই

৪) যার বিহা তার মন নাই, পাড়া পড়শীর মন নাই

৫) উবগারকে বাটে মারে

৬) মুচির সাপে ডাংরা মরে

৭) কেকলাসের দৌড় বাদাড় তক

৮) গাইতে গাইতে গলা, বইতে বইতে নালা

৯) রাঁড়ের গরব নাই, পাইকারের পরব নাই

১০) শাগ হলে সিঝে, মানুষ হলে বুঝে

১১) ভূমিজের কাঁড়, কুড়মির মাড়

১২) কোল কুড়মি কড়া, বেদ শাস্ত্র ছাড়া

১৩) ছেইলা খেলাইঞ গেল দিন, আইজ বলে ডাহিন

১৪) নিধইন্যার ধন হলে দিনেই দেখে তারা

১৫) কুঁড়া খাইঞে মৈরল বাপ, তার বেটার এত বিদদাপ

১৬) ছ্যাংগুড় গুড় আইসকা পিঠা
দেখ ন জামাই কেমন মিঠা।
১৭) জল পড় গাইদে
ধান লাগাবো বাইদে
১৮) তর পেঁদে কুকুর কাঁদে
১৯) পেন ছিঁড়া গোবিন্দ, আইজ স্কুল বন্ধ
২০) উপায় নাই গুরু, টুপায় চাল ভাজা

Leave a Reply