‘মাঁই ভুঁই দুখে জরঅ জর গো….’

Editorials

পলাশ রায়: সেই এক যে ছিল বাগাল ছেলে। সে পেয়েছিল এক পিঠে গাছের খোঁজ। তারপর কোথায় বা সেই গাছ গেল আর কোথায়ই বা বাগাল ছেলেটি। দধিলতে বাঁধিব উয়াকে। দধিলতে বাগাল বাঁধা থাকেনি। যে রেলগাড়ির জন্যে আদিম অরণ্যের শালগাছগুলি বুক পেতে দিয়েছিল। সেই ঝিকির ঝিকির রেলগাড়ি চড়েই বাগালকে চলে যেতে হল হরিয়াল আসাম দেশের চা বাগানে। এরপর যে ভূমি পড়ে রইলো -তার নাম অহল্যা– পাষাণময়ী পুরুলিয়া। সবুজ আচ্ছাদিত একটি বিশাল বনাঞ্চল কাটা পড়ল রেললাইনে। এ তো গেল লাল সিপাহির আমলের কিস্যা।

দেশ স্বাধীন হল। আহা মানভূমিয়াদের অন্তর যেন বলে উঠল ভাত খাঁইয়ে লে দেহির গরবে। বন তো সেই কবেই কেড়ে নিয়েছিল ইংরেজ সরকার। কিন্তু বনের থেকে মনটা ওঠানো যায়নি তখনো। জাহের গরাম কুদরা সিনি বেঁচে রইল এড়াছেড়া জঙ্গলখন্ডে। কিন্তু সেটুকুও তো হাতে এলো না।গেল স্বাধীন দেশের সরকারি বনবিভাগের কোঁচড়ে। বনের সঙ্গে মানুষের ছিল অনেক অনেক বছরের বাঁধন। ফরেস্টবাবুর দল এসে দিল বনের সঙ্গে মনের সেই বাঁধনটুকুকেও ছিঁড়ে। মাঝ থেকে আবার দুই প্রদেশের টানাটানি। বিহার বাঙলায় বাঁটি লেলা। পরবর্তী প্রজন্মের আর কোন সম্পর্কই গড়ে উঠল না বনের সঙ্গে। বিরবুরুর কন্দরে থাকা একটা সামান্য অংশ হয়তো বনকামড়ে পড়ে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কিন্তু ছিন্ন মানুষের দল অভাবের নতুন অভ্যেসে হয়ে পড়ল লুটেরাদেরই দোসর। এরপর তো বহুমুখী লুটতরাজের এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলেই চলেছে।

গত এক দেড় দশকে দেখা গেল পুরুলিয়া হয়ে উঠেছে হট কেক। মাও ভয়ের মধ্যে অযোধ্যা পাহাড় তো শহুরে বাঙালির এডভেঞ্চারের নেশাটাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর সেটা কেটে যেতেই ভোকাট্টা। ঝাঁকে ঝাঁকে পর্যটকের ভিড় জমল জঙ্গলমহল জুড়ে। ধামসা মাদল পলাশ মহুয়ায় একেবারে মাতামাতি। অল্প সংখ্যক মানুষের হাতে হয়তো টাকা এলো কিছু। কিন্তু বনপাহাড়ের আসল খবর কোথায় তলিয়ে গেল। পর্যটক ব্যবসায়ীরা খাঁটি আদিম স্বাদ দিতে দায়বদ্ধ পর্যটকদের কাছে। আদিবাসী রমনীর উদ্দাম নৃত্যের প্রলোভন তো শিক্ষিত সমাজের মজ্জায় মজ্জায়। সেই টোপও ফেলা হল। হোটেল রিসর্ট গাছবাড়ি মাচাবাড়ি আয়োজনের কমতি রইলো না একটুও। প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন তো দূর অস্ত। মাটির মানুষগুলো যাদের মন অনেক আগেই বন থেকে সরে গিয়েছিল, মাটি থেকেও তারা সরল দূরে। অপসংস্কৃতির পসরা সাজিয়ে বসল সুবিধাবাদীর দল। নতুন প্রজন্ম উদোম নাচছে। কাঁচা টাকা উড়েই চলেছে। সস্তা শ্রমিকের হাতে কাঁচা টাকা আর মুখে কাঁচা খিস্তি। কে লিবি আমার কাঁচাকাঁচা আম।

হারিয়ে যাওয়ার ফর্দটা ক্রমশ বাড়ছে। হারানো বাগালের পিছু পিছু হারিয়েছে বৃহৎ বনাঞ্চল। আজও পবিত্র শাল গাছ পাচার করেই চলেছে ফরেস্ট বাবুর দল। অনেকগুলো মহামূল্যবান ভাষা উধাও হয়ে গেল দেখতে দেখতে। ইচ্ছে করে কালভৈরবের মতো একটা মানুষ বুক চিতিয়ে এসে দাঁড়াক। বুরু ডুংরি রিম্বিল সেরমা গাডা এতল বেতল করে বলুক- সেন গে সুসুন, কাজিগে দুরাং।

আমাদের চলাটাই নাচ, বলাটাই গান….

Leave a Reply