মহুল মহক আর জাগরনের রাত

Editorials, Literature_of_soil

সাধন মাহাত:

ভালাভালির আর শেষ নেই
জাড় পাইরা‌ঞ ফাগুন মাস
ইবার চৈতের গুড়গড়ানি।
কাকে ধরবো কাকে নাই।
ভিতরে শিরশিরানি আড়বেলায়
মাড়ভাতের বতর খুঁজে।
সাথে পিয়াজকাটা আর কাঁচা লঙ্কা।
সুয়াদের আর শেঁষ নাই।

হবেক নকি এক জাম!

আমাদের বাঁধাধরা জীবন। বীজ ফেলা আর চাষবাস। তার‌ই মাঝে যত আনন্দ বিনোদন। আষাঢ়ে ঘোরতোর বর্ষা ঘনালেই মনে হয়, আফর ফেলার কথা। জল টিপটিপ মুধনাভাঙা আপন জীবন। ঠেস-বজড় বারমাস। ছিঁড়া ছিঁড়া কথা ছেঁড়া কাঁথার পারায়। সিয়ালেও রেহায় নাই। শিয়রে যতক্ষণ না অভাব এসে কনুই মারে ততক্ষণ আমরা আছি, রসে বসে। লিয়ায় লাগা থেকে ভালোবাসাবাসি কোথাও খাদ নেই। আলো আঁধারের নিত্য যাত্রী। অমাবস্যা পূর্ণিমায় সতত যাতায়াত। কুলহির পিঁড়হা থেকে ভিতর আঙিনা তক্ক কোন ছলচাতুরি নেই। ছিল না!

তবে মহুল‌ও গেছে, আর টুপাও গেছে। মহুলবনের অবর্তমানে আকাশমনির ছলাছ‌ইল। চোখ টিঁটরাঞ ভাললেও, ছামড়াতলের মহুলডাল ছাড়া কিছু দেখা যায় না। তবে কি কিছুই নেই। না, আছে। সেই সুবাসে ভেজাল মিশলেও, এখনো কিন্তু ঘর দুয়ারে একটা রাত অন্তত আমরা মাতি মহুলের রসে। পরবে ম ম করে উঠে কুলহিডাঁড়ি।

আছি হে আমরাও। ঢোল নাগড়ায়।

আর মহুলের বাস বারো মাস। সেটা দাদু ঠাকুর দাদুর আমলের গল্প। ঢেঁকি কুটার দিন শেষ। মহুল লাঠাও আর নাই। জুয়ান মরদ পাব কোথায়। কুলহির মুড়া ডেঙতে শিখলেই বুঢ়হায় থেরেথেপে। দিলসে আর ক্যাপটেন। তার পরেও আছে ঘর আঙিনার কুচানি। বেঙ্গালোর, চেন্নায়, মাদ্রাজ। আধা দিনে দাগা দিল কালা ঘনশ্যাম।

শ্যাম গেল মধুপুরি
শিখে আ’ল ছলচাতুরি।

তবে মহুলের বাস, আর উয়ার মিঠা সুয়াদ…
আছে হে। এখনো আছে। চৈত মাসের জাগরনের রাতে খুঁজে পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। আসরে চারপাশ ঘিরে যেমন রয়েছে ভালাভালি। তেমনি রয়েছে মহুলের সুবাস‌ও। তার আঘ্রানে আজও অজান্তে মেতে ওঠে আট থেকে আশি। কার্তিকের চালের সাথে সাথে তার পাও তালে তালে পা ফেলে চলে সেই সুবাসের দিকে। মহুল বনে। খাঁ খাঁ দুপুর। ঢুলু ঢুলু আঁখি। ভিজতে থাকি আমিও। জাগরনের রাতে।

এ বছর লকডাউন। ঢাকের আওয়াজ কানে এসেও মিলিয়ে যাচ্ছে। সানাই সেই কথাটি বলতে পারছে না কিছুতেই। ঢোল নাগড়া আজ তালাবন্দি। ঘরবন্দী মহুলের সুবাস। সুতরাং একা। একা কাটবে এ বছর মহুলের মাস। জাগরনের রাত। তালাবন্দি আসরের কলধ্বনি। ঢেঁকি চালায় ঢেঁকির শব্দ‌ও নেই। কুঁড়হা পরবে, কুঁড়হা খাওয়া নেই। ঢোল নাগড়া নেই। নেই কতকিছু। চারিদিকে কিসের যেন আশঙ্খা। কিসের। আপাতত বাঁচতে হবে আমাদের। তবুও প্রকৃতি এসে জানান দিয়ে যায় সবকিছু। আজ আমাদের পরবের দিন।

বেঁচে ওঠার দিন।

মাথাতলের স্বপ্ন আজ ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘনঘোর গ্রীষ্মের মাতন নেই। চারিদিক নিঃস্তব্ধ । চরাচর জুড়ে শুধুই একটা মহুল গাছ। যেন তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। যেন তার সাথে আমাদের ভাব ভালোবাসা ছিল না কোনদিন। আর তার তলায় সেই মহুল কুড়ানি- আর তার অপেক্ষা। অপেক্ষায় অপেক্ষায় ছায়া দীর্ঘ হয় ক্রমশ। আজ কেউ নেই। পথচারীর‌ও উধাও। একরাশ আক্ষেপ সঙ্গে নিয়েই সূর্য আশ্রয় নেয় গজাবুরুর গহীন জঙ্গলে। নিঃসাড়ে নেমে আসে জাগরণের রাত। আগামীকাল ভগতাঘুরা।

ঘুম হয় না। ঘুম হয়না জাগরণের রাতে। সন্ধ্যা নামতেই পরবের প্রস্তুতি। ইতি উতি চাউনি। সাঙ্ঘাতের আনাগোনা। জাগরু কাকার হাঁক- ‌’ক‌ই হে ছো পাটিগিলা কতধূর…’।

সাঁঝ হলেই সিয়ানিগিলা ফুটে বার হয়, আঁধার রাতে শালুক ফুলের পারা নিঃশব্দে। এসে দাঁড়ায় পিঁদাড় কলে। না এখানে কোন রাধাকৃষ্ণ নেই। শুধুই একটা জাগরণের রাত। জ্যোৎস্নার প্লাবন। আজানুলম্বিত একটা নদী। আর তার বালুচর। ঝপ ঝপ করে জল ভাঙতে ভাঙতে উঠে আসছে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। যার কানে কুন্তল। নাকে নাকছাবি। গলে চন্দ্রহার। চারিদিকে শুধুই নাগড়া বাজতে থাকে। দু হাত অসার করে ছুটে আসছে একটা জাগরণের রাত।

ওইটুকুই। ওইটুকুই স্বপ্ন। ওইটুকুই ভালা ভালি। ওইটুকুই জাগরণের রাত। ওইটুকুই মহুলের বাস।

গেজাঘিন গেজাঘিন গেজাঘিন ঝাঁ।
ঝাঁ গেজাঘিন ঝাঁ।
ঝাঁ গেজাঘিন ঝাঁ।
ঝাঁ গেজাঘিন ঝাঁ।।

 

 

ছবি: অভিজিত মাঝি, রমেশ মাহাত

Leave a Reply