২১শে-র শপথ মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ

Language & Tradition

মৃনাল কান্তি মাহাত : দেখতে দেখতে আবারও ২১ ফেব্রুয়ারি চলে এল।পেরিয়ে গেল আবারও একটা ভাষা দিবস। সেই যে ১৯৯৯ সালে ভাষা দিবস এর স্বীকৃতি জুটেছে। তারপর নিয়ম করে ভাষা দিবস আসে। কটাদিন ফেসবুক, সংবাদপত্র জুড়ে হৈ চৈ হয়। আবার তলিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে। আর হৈ চৈ এর আড়ালে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রান্তিক ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ।কারণ,  আবারো একটা ভাষা দিবস আসা মানে আবারো ধ্বংসের দিকে একটি বছর এগিয়ে যাওয়া। মাতৃভাষা হারানোর আশংকায় দিন গুনছেন কয়েকশো ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ।UNESCO এর হিসেব মত সারা বিশ্বজুড়ে ৩৭০মিলিয়ন মানুষের যে ৭০০০ এর মত ভাষা রয়েছে, তার ৪৩% ভাষাই অবলুপ্তি হয়ে যেতে পারে। UNESCO এর ভাষায় যা ‘endangered ‘. হিসেব মত সারা বিশ্বের প্রায় ৪০% মানুষ এখনো মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পায় না।মাতৃভাষার সঙ্গে রাজভাষার এই দ্বন্ধ প্রায় সারা বিশ্বজুড়েই। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলিতে ভাষাকে নিয়ে রাজনীতি, দাঙ্গা, ও ক্ষমতার লড়াই তো সর্বজনগ্রাহ্য। আফ্রিকার মতই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ভারতের। ভাষা বৈচিত্রের দেশ, ইন্ডিয়া তে ৭৫০ টার মত ভাষা থাকলেও মাত্র ২২ টি ভাষা অষ্টম তফশিলের অন্তর্ভুক্ত। যা খুবই বেদনার এবং হতাশার। People’s Linguistic Survey of India এর প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর গণেশ দেবীর আশঙ্কা, আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ভারতের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি ভাষার অবলুপ্তি ঘটবে। সংখ্যাটা প্রায় ১৯৬ এর মত। আর এদের মধ্যে বেশিরভাগেই হল ভারতবর্ষের সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেনী। সরকার এদের নিয়ে রাজনীতি করে,  ক্ষমতায় আসে, এদের সংস্কৃতি দেশবিদেশে প্রদর্শন করে দেশের মান বৃদ্ধি করে কিন্তু, এদের ভাষা স্বীকৃতি দিতে বড়ই কার্পন্য। প্রতি রাজ্যের রাজভাষা ছাড়া অন্যভাষাগুলি আজো অবহেলার শিকার।

তবে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হয়েছে ছোটনাগপুর বাসীদের উপর।এই মালভূমি এলাকা আদিবাসী কৃষ্টি,কালচার এর হাব হলেও, সাঁওতালি ছাড়া আর অন্য ভাষা গোষ্ঠী স্বীকৃতি পায়নি। অথচ এই এলাকার ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় প্রায় কুড়ি থেকে ত্রিশটি জনজাতি ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। যারা ওই অবলুপ্তি আশায় দিন গোনা ১৯৬টি ভাষা গোষ্ঠীর মধ্যেই পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার বোধহয় টোটেমিক কুড়মীরা। চাররাজ্যে যাদের জনসংখ্যা এককোটির বেশি হলেও, মাতৃভাষার স্বীকৃতি নাই। ওড়িশার কুড়মীরা ওড়িয়া, বাংলার কুড়মীরা বাংলা এবং ঝাড়খণ্ড এর বাসিন্দারা হিন্দী ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। একটা গনতান্ত্রিক দেশে কেন এই অবিচার? রাজ্য ও কেন্দের রাজনৈতিক দলগুলি শুধু অন্যায়, বঞ্চনা নয় চরম অমানবিক আচরণ করছেন। একটা শিশুকে মাতৃভাষায় পড়তে না দেওয়া, বড় হতে না দেওয়া অসাংবিধানিক, অমানবিক কাজ।

প্রশাসন, রাজনৈতিক দলগুলি এবং সমাজের বোদ্ধা মানুষেরা যদি এই উদ্যোগ না নেয়, শেষ হয়ে যাবে এই মানুষগুলির আত্মপরিচিত, প্রেমনিবেদনের ভাষা। আর একটা ভাষা শেষ হওয়া মানে তো শুধু কয়েকটা শব্দের অবলুপ্তি নয়। অবলুপ্তি হয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, বোধ,চেতনা। ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে সেই সেই গোষ্ঠী কে ভূমিহীন, আত্মপরিচিতি হীন উদ্বাস্তু করে তোলা। এও একধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, পরাধীন করে রাখা। দেশীয় Colonization ।

যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা cultural hegemony শুরু হয়েছিল ঋকবৈদিক যুগে  সংস্কৃত ভাষাকে হাতিয়ার করে, সেই আগ্রাসন এখন চলছে ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা, ওড়িয়া কে কেন্দ্র করে। এখনো প্রকারান্তরে প্রান্তিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষগুলিকে সংশ্লিষ্ট রাজ্যসরকার কতৃক বাধ্যকরা হয় মাতৃভাষা ছেড়ে রাজভাষায় পড়াশোনা করতে। এভাবেই ভাষার রক্তক্ষরণ হচ্ছে প্রতিদিন। প্রতিদিন মৃত্যুবরন করছে শব্দভাণ্ডার। রক্তপ্লতায় ভুগতে ভুগতে শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে একদা এদেশের আদি ভাষাগুলি।

এরপরও বলব এখনো সব শেষ হয়নি। রোগী ভেন্টিলেশনে থাকলেও পরিজন দের একটু শুশ্রুষায় আবার বেঁচে ফিরে আসতে পারে। মূল দায়িত্ব টা নিতে হবে সেই ভাষা গোষ্ঠীর মানুষজনকেই। কারণ, এদেশে শাসকরা রাজনীতি করতে আসে, ক্ষমতা ভোগ করতে আসে। সমাজসেবা দেশসেবা করতে আসে না। চাই সাঁওতাল ভাইওদের মত তীব্র আন্দোলন। যাতে সরকার বাধ্য হয় দায়িত্ব নিতে।  এরপরের দায়িত্ব নিতে হবে সেই সমাজের সচেতন, শিক্ষিত মানুষদের। যারা অনুবাদের মাধ্যমে মাতৃভাষায় পড়াশোনায় বিশ্বমান বজায় রাখবেন।

কে বলেছে, মাতৃভাষায় পড়াশোনা করলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা যাবে না। চায়না, জাপান, রাশিয়া, ইজরায়েলে এর দিকে তাকান। তাদের উন্নতি উপলব্ধি করুন, তাহলেই মাতৃভাষায় পড়াশোনার হীনমন্যতা দূর হবে। তবে, হ্যাঁ, অনুবাদের মাধ্যমে পঠন পাঠন এর মান যেন সমান থাকে। এই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ভাষার পন্ডিতদের।

 আর, হ্যাঁ সবার কাছে অনুরোধ, আপনি যতগূলো ভাষায় জানুন কেন, মাতৃভাষাকে ভুলে যাবেন না। মাতৃভাষাকে অবহেলা করা মানে শিকড় কে অস্বীকার করা। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোন মানুষেই শিকড় কে অস্বীকার করে ‘বড়’ হতে পারেনি। নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা কে দূরে ঠেলা মানে নিজস্ব শিকড় কে দুর্বল করা। আর জানেনই তো, দুর্বল শিকড় নিয়ে কোন গাছেই কি বেশি বাড়তে পারে?

One thought on “২১শে-র শপথ মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ

Leave a Reply