ঝাড়গ্রামে কুড়মালি ভাষা চর্চা

Language & Tradition

হপন মাঝি : ভাষার নিজস্ব গতি আছে । সেই গতিপথে সে সর্বদাই বিবর্তিত হয় । সেক্ষেত্রে কখনো সেই বিবর্তন একমুখী হয়, কখনো বহুমুখী । বহুমুখীতা তখনই হয় যখন সেই ভাষার চর্চা কম হয় । কিংবা তার ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্র সীমিত থাকে । বিবর্তনে এই বহুমুখিতা সূচিত হয় অপর কোন শক্তিশালী ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বা মিশ্রনে একটা সহাবস্থানে থেকে । কুড়মালি ভাষাও তার ব্যতিক্রম নয় । কুড়মালি ভাষা যেহেতু সরকারি ভাবে স্বীকৃত নয় সেজন্য তার পরিশীলিত চর্চার সুযোগ কম । ব্যক্তিগত তাগিদ কিংবা উদ্যোগ ছাড়া সেজন্য কুড়মালি ভাষার লিখিত রূপ খুব একটা নজরে আসে না । বাংলা হিন্দি উড়িয়া ভাষার মতো অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ভাষার ব্যবহারিক চাপের কাছেও সেজন্য কুড়মালি ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছে । আর সেই সুযোগে অতি দ্রুত তলে তলে যে বিবর্তন ঘটেছে তা অঞ্চল ভেদে হয়ে যাচ্ছে বাংলা হিন্দি উড়িয়া উড়িয়া ভাষার মিশ্রণ । আবার অঞ্চলভেদে কখনো বা উচ্চারণ ভঙ্গির বিকৃতি তে তাকে আলাদা বলে মনে হয় । ফলে প্রকৃত কুড়মালির নমুনা নির্বাচনে একটা ধন্দ এসে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনিপুরের বিশেষত ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে কুড়মালির যে বিবর্তিত রূপ লক্ষ্য করা যায় তাতে বাংলা ভাষার মিশ্রণ যথেষ্ট । তবে আশার কথা বাংলার ক্রিয়াপদ এবং কিছু কিছু শব্দ কিন্তু এখনো ঝাড়গ্রামের প্রায় সর্বত্র প্রবল ভাবে বিদ্যমান। ছোট্ট একটা উদাহরণে আসা যেতে পারে আমি না খেয়ে যাব না (বাংলা) মই নি খাইকে নি জাম(কুড়মালি), হামি নাই খায়ে নাই যাব ( ঝারগ্রাম এর আঞ্চলিক ভাষা ) ।মূল কুড়মালি ভাষার এরকম বিবর্তন ময়ূরভঞ্জ গিয়ে উড়িয়া ভাষার সঙ্গে ঝাড়খন্ড বিহার রাজ্যে হিন্দি ভাষার সঙ্গে অসমের চা বাগানগুলোতে অসমিয়া ভাষার সঙ্গে একটা মেলবন্ধন ঘটিয়েছে , যাতে খুব সহজে ধারণা জন্মে যায় , অঞ্চল ভিত্তিক নমুনা গুলি সেই সেই ভাষার উপভাষা ।গবেষক যদি আবার আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট হন , তাহলে তার মতটি আবার প্রামাণ্য এবং বিশেষজ্ঞের মন্তব্য হয়ে যায় ।ফলে , স্বাভাবিক ভাবে ভিন্ন ভিন্ন মত তৈরী হয়ে একটা বিভ্রান্তি স্বতঃসিদ্ধ হতে থাকে ক্রমশ । ঝাড়গ্রামে কুড়মালি ভাষা সম্পর্কে এরকম বিভ্রান্তি একটা হাতে গরম উদাহরণ । ঝাড়গ্রামের লোক জীবনে এই বিবর্তিত কুড়মালি মূলত কথ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয় । অতীতে এই ভাষায় ছড়া, ঝুমুর, প্রবাদ, ধাঁধা, কাহিনী , বিয়ের গীত , টুসু গীত ইত্যাদি যা কিছু রচিত হয়েছে তা মূলত মুখে মুখে । তাৎক্ষণিক পরিবেশ ,পরিস্থিতি , ঘটনা অভিজ্ঞতা কে কেন্দ্র করে লোকমনের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই সব উপাদান এ । ফলে ভাষার এই সব উপাদান হয়ে উঠেছে একমাত্র শ্রুতি নির্ভরতা । ঘটনা হলো যে সময় পরিবর্তনের সঙ্গে যেমন যেমন কুড়মালির যেমন যেমন বিবর্তন ঘটেছে , এই শ্রুতি নির্ভর উপাদান গুলি ভাষা ও তেমন তেমন ভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং ঝাড়গ্রামে বাংলা ভাষার প্রবল ব্যবহারিক চাপ সত্ত্বেও আজও তা টিকে আছে ।সত্তরের দশক পর্যন্ত লোকজীবনের এ কুড়মালি ভাষাকে তার শ্রুতি নির্ভরতা কিংবা কথ্য রূপের খোলস ছাড়িয়ে তাকে লিখিত রূপে নিয়ে আসার চেষ্টা বড় একটা চোখে পড়ে না ।কিছু কিছু স্বভাব কবি প্রতিবছরই টুসু পরবের আগে এই কুড়মালি তে টুসু গান রচনা করে সস্তার প্রেসে ছাপিয়ে হাটে বাজারে নাচ গানের মাধ্যমে বিক্রি করতেন । কিন্তু এক বছর বছর দুই বছরে সেই সব গানের অপমৃত্যু ঘটতো অথবা গীতিকারের অক্ষমতা বা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেত । তবু ঝাড়গ্রামের কুড়মালি ভাষায় এগুলি ছিল প্রথম লিখিত রূপের চেষ্টা । কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই সব কবিদের নাম ঠিকানা কিংবা তাদের সৃষ্টির নমুনা আজ বড়ই বিরল ।

                    সত্তরের দশকে ঝাড়গ্রামে এই কুড়মালি ভাষা চর্চার লিখিত রূপে সাহিত্য সৃষ্টি করে শিক্ষিত সমাজকে প্রথম চমক দেন কবি ভবতোষ সতপথি এবং সাহিত্যিকগণ ললিত মোহন মাহাতো । পাশাপাশি কুড়মালি ভাষায় ঝুমুর গান নিয়ে অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে আসার মাতাতেন বিজয় মাহাতো । ঝাড়খন্ড আন্দোলন নামক একটি জাতিসত্তার আন্দোলনে আশির দশকে গোড়ায় যে ভাষা মাধ্যমটি আন্দোলনকারীদের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল, তা নিশ্চিতভাবে কুড়মালি ভাষা । ঘটনাচক্রে এই আন্দোলন হাত ধরেই ঝাড়গ্রামে জেগে উঠেছিল কুড়মালি ভাষার সরকারি স্বীকৃতির দাবি । তখন থেকেই আন্দোলনের প্রয়োজনে কুড়মালি ভাষায় বহু কবিতা ঝুমুরের জন্ম হয়েছিল লিখিত রূপে । বলা যেতে পারে ঝাড়গ্রামে কুড়মালি লিখিত চর্চার সেই শুরু । প্রায় একই সঙ্গে রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শুরু হয় “আদিবাসী ও ক্ষেত্রীয় ভাষা বিভাগ” । এই বিভাগে অন্যান্য সাতটি আদিবাসী ভাষার সঙ্গে কুড়মালি ভাষা পঠন পাঠনের জন্য অন্তর্ভুক্ত হয় ।কুড়মালি ভাষী বুদ্ধিজীবীরা রাঁচিতে গড়ে তোলেন ‘আদিবাসী কুড়মি সমাজ’ , জামশেদপুরে গঠিত হয় ‘এবরিজিনাল কুড়মি পঞ্চ’, পশ্চিমবঙ্গে ‘মূলকি কুড়মালি ভাখি বাইসি ‘ এবং নয়াগ্রাম থানায় কুড়মালি ভাষা চর্চা কেন্দ্র । কুড়মালি ভাষার প্রচারে এবং তার স্বীকৃতির দাবিতে ঝাড়খন্ড আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একই রকম ভাবে ঐসব সংগঠন ঝাড়গ্রাম তোলপাড় করতে থাকে । অধ্যাপক শশীভূষণ মাহাতো লক্ষীকান্ত মুতরুয়ার, বসন্ত মেহেতা ,কেশব চ্যাংড়া মাহাতো ,রামপদ সিং, শ্রীপদ মাহাতো , রামেশ্বর মাহাতো ,কবি সুনীল মাহাতো সাহিত্যিক আনন্দ খুটদার প্রমুখ ঝাড়গ্রামের প্রতিটি প্রান্তে কুড়মালি ভাষার সঙ্গে গ্রামবাসীদের গ্রামবাসীদের নতুন করে পরিচয় ঘটাতে থাকেন । ঘটনা হলো এরা কেওই কিন্তু ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা নন । কিন্তু দেখা গেল এদের সঙ্গে কুড়মালি ভাষার জন্য দিন রাত এক করে হাত মিলিয়েছেন

 

কুড়মালি লিপি

ধনু রায় ধুমসাই, ড: বিভূতিভূষণ মাহাতো ,পরমেশ্বর মাহাতো , সুধীর মাহাতো, ঝাড়গ্রাম এর হত ভবতোষ সতপথী, ললিত মোহন মাহাতো , বিজয় মাহাতো , অশোক মাহাতো, বীণাপাণি মাহাতো, সুধা রানী মাহাতো, গুণধর মাহাতো , ভূপেন মাহাতো , জয়ন্ত মাহাতো, বিমল মাহাতো জামবনির কেশব মাহাতো , বেলপাহাড়ি ডাক্তার মনোরঞ্জন মাহাতো ,রাখহরি মাহাতো ,ছাত্রমোহন মাহাতো ,যুগল মাহাতো ,অশোক মাহাতো স্বপন মাহাতো , শ্রীমন্ত মাহাতো , তরুণ মাহাতো ইত্যাদি রা ।এদের কেউ কবিতা , কেউ ঝুমুর , কেউ গল্প , কেউ যাত্রাপালা, একাঙ্ক নাটক নতুন করে কুড়মালি তে লেখা শুরু করে দিলেন । এই সময়ে প্রতিটা রবিবার কুড়মালি র জন্য কোন না কোন গ্রামের আখড়ায় কুড়মালি ঝুমুরে মাটি কাঁপাতেন বিজয়, লক্ষীকান্ত, গঙ্গাধর, ইন্দ্রানী, অজিত, অঞ্জলি, মাধবী, দেবাশীষ ইত্যাদি ইত্যাদি ঝুমুর শিল্পী নিয়মিত সেই সব আসরে কুড়মালি ভাষা ঝুমুরের সঙ্গে নাচে অংশ নিতেন বীণাপাণি মাহাতো সহ বিজয়ের পরিবার সুধা রানী পদ্মাবতী রা ।নীটফল পাওয়া গেল অচিরেই । বিজয় কে সামনে রেখে ঝাঁকে ঝাঁকে যেমন বেরিয়ে এলো শতাধিক ঝুমুর শিল্পী , তেমনি তাদের ভাষায় জন্য কুড়মালি ভাষায় রকমারি ঝুমুর গান লিখতে শক্ত হাতে কলম ধরেন ধরলেন ভবতোষ শতপথী , ললিত মোহন মাহাতো , মন্মথ মাহাতো , বিজয় মাহাতো ,ভূপেন মাহাতো , সমীর মাহাতো প্রমুখ । ঝুমুর গানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চললো কুড়মালি তে কবিতা রচনা । ভবতোষ সতপথি তো ছিলেন ই এগিয়ে এলেন ছত্রমোহন মাহাতো , ডাক্তার ভারতচন্দ্র মাহাতো , যুগল মাহাতো , নারায়ণ মাহাতো , ডাক্তার মনোরঞ্জন মাহাতো , ভূপেন মাহাতো ,জয়ন্ত মাহাতো, বিমল মাহাতো প্রমুখ । গল্প ,নাটক , যাত্রাপালা , একাঙ্ক নাটক রচনায় হাত দিলেন ললিতমোহন মাহাতো, বিভূতিভূষণ মাহাতো ,পরমেশ্বর মাহাতো ইত্যাদি । তবে কুড়মালির লিখিত রূপের চর্চা ছাপার অক্ষরে কিছু কিছু এলেও বেশিরভাগই রয়ে গেছে অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির আকারে । কুড়মালি ভাষা চর্চায় মুলকি কুড়মালি ভাখি বাইসির উদ্যোগে এর ঝাড়্গ্রাম শিলদা থেকে ‘ফুরুং’ নামে মুদ্রিত প্রথম মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে । কুড়মালি ভাষায় সংগৃহীত উপাদান ছাপা, কুড়মালি ভাষার উৎপত্তি , বিকাশের ইতিহাস , নতুন মৌলিক কিছু রচনা ছাপায় নিরন্তর মদত যুগিয়েছিল ‘ফুরুং’ পত্রিকা । তবে হাজার হাজার সাময়িক পত্রিকার ভবিষ্যৎ যা হয়, উচ্চমানের লেখা নিয়ে লেখা নিয়ে বলিষ্ঠ সম্পাদনা সত্বেও ফুরং পত্রিকা মাত্র আড়াই বছর বেঁচে ছিল । গ্রামীণ এলাকার পাশাপাশি বিয়ের গীত ,জাওয়া গীত , কুড়মালি ঝুমুর এর ক্যাসেটে ছয়লাপ হয়ে উঠতে শুরু করে এই সময় । ঝাড়গ্রামে এখন এমন পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে যে মফস্বল এর যেকোনো অনুষ্ঠানে কুড়মালি ভাষায় রচিত ঝুমুর গানের সিডি ,ডিভিডি কিংবা ঝুমুর নাচগানের দল ছাড়া ভাবাই যাচ্ছেনা ।ইদানিং সময়ে সরস্বতী পুজো কালীপুজো দুর্গাপূজার শেষে যে সমস্ত বিচিত্রানুষ্ঠান পূজার অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, সেখানেও হিন্দি বাংলা উড়িয়া ভাষার অর্কেস্ট্রা বা ডান্স দলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে কুড়মালি ভাষার নাচ গানের দল । অর্থাৎ ,সবমিলিয়ে সত্তর দশকের আগে কুড়মালি ভাষা মাধ্যমটিকে ব্যবহার করা লিখিত রূপে ব্যবহার করা কথা যেখানে ভাবাই যায়নি ,মাত্র আশির দশকের শুরু হয়ে বর্তমানে তা অত্যন্ত এক জনপ্রিয় ভাষা মাধ্যমে পরিগণিত হয়েছে । দুর্ভাগ্যের বিষয় মৌলিক প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অত্যন্ত অল্প । খাতা কিংবা ডায়েরির পাতাতে আজও ছড়ানো রয়েছে তার বেশিরভাগ রচনা । ফলে গুটিকয়েক গ্রন্থের নাম উল্লেখ ছাড়া লিখিত রূপ এর নমুনা দেওয়া সম্ভব নয় ।

প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ: ভবতোষ সতপথিঅরণ্যের কাব্য ও অন্যান্য , চণ্ডালিকা(অনুবাদ),বদানন্দের পদাবলী, এককুড়ি ঝুমুর , আলকুশি , ঢ্যামনা মঙ্গল, তিতকি, জুমরা, শিরি চুনারাম মাহাত ইত্যাদি

ছত্রমোহন মাহাতোমায়া মঙ্গল, মহুল কড়ির মহক।
জয়ন্ত মাহাতোহ্যালো মহুল বইনা বলছি 
যুগল মাহাতো – বন বাদাড়ের মন , রাঙ্গামাটির ঢাকা পিরিত
হপন মাঝি– ভাদর
ভূপেন মাহাতো – ঝাড়খণ্ডী কবিতা ।
একাঙ্ক নাটক – বিভূতিভূষণ মাহাতো – বহু দেখা
পরমেশ্বর মাহাতো -পিরিত ।
লালিত মোহন মাহাতো – চাষির হাল
গীতিনাট্য – প্রেমচাঁদ মাহাতো – সতী বেহুলা
যাত্রা – বিভূতিভূষণ মাহাতো – গাছেরও খাব তলেরও কুড়াবো ।
ভিডিও সিনেমা – বিভূতিভূষণ মাহাতো – জা জাওলি ।
ক্যাসেট সিডি ভিডিও সিডিবিজয় মাহাতো ,ইন্দ্রানী মাহাতো ,অঞ্জলী মাহাতো ,দেবাশীষ মাহাতো , অজিত মাহাতো,মাধবী মাহাতো সুধা রানী মাহাতো সমীর মাহাতো ইত্যাদি
টুসু গীত ডাক্তার ভরত মাহাতো  – জাগরণী সঙ্গীত
নারায়ন মাহাতো – হড়মিতান টুসু সংগীত , হামদের টুসু ইত্যাদি
ব্যাকরণ : বিভূতি ভূষণ মাহাত , কুড়মালি ভাওর , কুড়মালি শব্দমালা

Leave a Reply