কৃত্তিবাস কর্মকার : সর্বকালের জনপ্রিয় ঝুমইর কবি

Literature_of_soil

সম্পাদনা: লালন কুমার মাহাত

ধন্য পুরুলিয়ার মাটি
যেটা জন্মায় সেটা খাঁটি হে
এই মাটি কাঁকর পলি চিটা—–

কৃত্তিবাস কর্মকার | সারা ছোটনাগপুর এলাকায় কোনো ঝুমইর প্রেমী এই নামের সাথে পরিচিত নয় তেমনটা সম্ভব নয় | যার ঝুমইর শুনে মানুষের হৃদয় আপ্লুত হতো, হাতের কাজ ভুলে যেত সাধারণ মানুষ সেই সর্বকালের জনপ্রিয়তম কবি কৃত্তিবাস কর্মকারের জন্ম ১৯৪২ সালের (১৩৪৯ বঙ্গাব্দে) বৈশাখের ১২ দিনে পুরুলিয়ার কেন্দা থানার গোবিন্দপুর গ্রামে| বাবার নাম ছিল ভিখু কর্মকার এবং মায়ের নাম পঙ্খবালা কর্মকার|

অভাবের সংসার, দুঃখ , কষ্ট ছিল জীবনের প্রতি পদের সঙ্গী| তাই পড়াশোনার পাঠ খুব একটা হয়ে ওঠেনি| তবুও গ্রামের স্কুলেই হাতে খড়ি| দ্বিতীয় শ্রেণী অবধি পড়াশোনা করার পরেই থেমে যায় পড়াশোনা| ছাড়তে হয়েছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়| সংসারের অভাবের তাড়নায় শুরু করেন গরু বাগালি|শৈশব ও কৈশোরের সন্ধিক্ষণে কৃত্তিবাস তখন রাখাল বালক | বাগাল খাটা হয়ে ওঠে ওনার পেশা | গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবারের গরু নিয়ে প্রতিদিন মাঠে চরাতে যেতেন তিনি | বাগাল খাটার নিয়ম অনুযায়ী মাঘ মাসের শেষে পেতেন বাগাল খাটা বাবদ বেরহুন ধান | সেই ধান দিয়ে চলতো তাঁদের সংসার| কিছু হোক না হোক কপালে মাড় ভাত টুকু কোনো রকমে জোটানোর জন্য এই পেশা তাঁকে সাহায্য করতো|

বাগালি করতে করতে মনের মধ্যে ঝুমইরের উদয় হতো | সেগুলো তিনি কাগজে লিখেও রাখতেন | কিন্তু বাড়িতে উপযুক্ত রাখার জায়গা না থাকায় পরবর্তী কালে অনেক গুলো গান এর কপি ধংস হয়ে যায় | কৈশোরের তিনি অনেক ঝুমইর লিখেছিলেন কিন্ত পরবর্তী কালে সেগুলো আর খুঁজে পাওয়া যায়নি | অবশ্য লোককবিদের কত গান , কত লেখা যে এরকম ভাবে নষ্ট হয়েছে তার হিসেবে নেই | এখন তো শহৈরা ফুলবাবুরা অনেক গান নিজের নামেও চালায়|

শোনা যায়, কবির পিতাও খুব সুন্দর ঝুমইর গান গাইতেন | এমনকি মনের খেয়ালে প্রায় প্রতিদিন ভোরে উঠে সুর ধরতেন , গান গাইতেন |

ভূবনে ভরাব ঝুমইর গান
আমরা রাইখ্ব মানভূমের মান|
যে ঝুমইরের সুরে লতাপাতা জাগে
যার সুরে চন্দ্র সূর্য উঠে ডুবে
যে ঝুমইরের সুরে পাখি গায় ভোরে
উষারানী হয় আওয়ান
ভূবনে ভরাব ঝুমইর গান………

স্বভাবতই মা বাবার মুখের শোনা গান, কথা, গল্প এসবের সংস্কৃতি রক্তের সাথে মিশে যায় মানুষের মধ্যে| কৃত্তিবাস কর্মকারের ক্ষেত্রেও তার বিকল্প হয়নি | বাবার সাথে গলা মিলাতে মিলাতে কবে যে তিনি ঝুমইরের প্রেমে পড়ে যান তার কাহিনী সত্যি রোমাঞ্চকর| কিন্তু পদে পদে প্রত্যেক মুহূর্তে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের অভাব| বাগালি করার কাজ ছেড়ে দেন কৃত্তিবাস | পরে হঠাৎ করে কোলাঘাট গিয়ে টায়ার রিসোলিং এর কাজ শিখতে লাগেন| সেখানে কাজ করতে করতে মনের আবেগে বেরিয়ে যায় ঝুমইর| তাঁর অসাধারণ গলার আওয়াজ শুনে ভিড় জমে যায় টায়ার দোকানে | দোকানের মালিক ব্যবসায়ী মানুষ , টাকা পয়সায় সবকিছু তার কাছে , ঝুমইর কি জিনিস তা হয়তো তিনি বুঝতেন না | তাই একদিন কাজ ছেড়ে ঝুমইর গাওয়া আর তার চারপাশে ভিড় দেখে মালিক বেশ করে ধমক দেন কৃত্তিবাস বাবু কে | এক বেলা না খেয়েও থাকা যায় কিন্তু ঝুমইর এর মধুতে যার মনে প্রাণ সিক্ত সে যে ঝুমইর ছাড়া থাকতে পারবেনা সেকথা বোধ হয় সমস্ত ঝুমইর প্রেমী মানুষরাই স্বীকার করবেন | তাই পেটের দায়ে কাজ করতে যাওয়া ছেলেটাও সেদিন টায়ার রিসোলিং এর কাজ ছেড়ে টাটানগরে পালিয়ে যান| সেখানে কিছুদিন থাকার পর চলে যান রাঁচি, তারপর ধান বাদ এবং অবশেষে নিজের মাতৃভূমি পুরুলিয়াতে চলে আসেন তিনি |

এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে অনেক অভাব অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় ওনাকে | তাই পুরুলিয়া ফিরেই মনযোগ দিয়ে কাজ করতে শুরু করেন তিনি | টায়ার রিসোলিং এর কাজে তার নাম ছড়িয়ে পরে চারদিকে | গাড়ির মালিকেরা কৃত্তিবাস বাবুকে খুঁজে খুঁজে তার কাছেই কাজ করাতে চাইতেন | পুরুলিয়াতে অমিতাভ সিং মহাপাত্রের ‘শিখা টায়ার’ নামক দোকানে কাজ করতেন তিনি | দোকানের মালিক অমিতাভ বাবু কৃত্তিবাস কর্মকারের ঝুমুর গাওয়াকে সমর্থন করতেন, উৎসাহও দিতেন| তাই কৃত্তিবাসও টায়ার রিসোলিং এর সাথে সাথে ঝুমইর চর্চা অব্যাহত রাখেন| অমিতাভ বাবুও বিভিন্ন প্রোগ্রামে গান করতে যেতেন , তেমনি এক অনুষ্ঠানে নিজের সাথে নিয়ে যান কৃত্তিবাসকে| মঞ্চে নামার সুযোগ করে দেন | তারপর আর দেখে কে ? মুহূর্তেই দর্শকদের মন জয় করে নেন কৃত্তিবাস |দর্শকদের অনুরোধ আসে আরও বেশি করে গান করার| শুরু হয় সর্বকালের জনপ্রিয়তম ঝুমইর কবি কৃত্তিবাস কর্মকারের ঝুমইর জীবনের যাত্রা | রাতের পর রাত গান গাওয়ার ডাক পেতে থাকেন তিনি | ধীরে ধীরে টায়ার রিসোলিং এর কাজ এর জন্য সময় কম পেতেন তিনি , বেশির ভাগ সময় কাটতো ঝুমইরের প্রোগ্রাম করে | তবুও মালিক তাঁকে সমর্থন করতেন | ঝুমইরা হিসাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে কৃত্তিবাস কর্মকারের নাম | অবশেষে ঝুমইর এর উপর ভরসা করেই জীবন কাটাতে টায়ার দোকানের কাজ ছেড়ে দেন তিনি | শুধু পুরুলিয়া জেলা নয় সারা ছোটনাগপুর এলাকায় ঝুমইর প্রেমী মানুষের কাছে পৌঁছে যায় কৃত্তিবাসের প্রতিভার ছোঁয়া | কৃত্তিবাস কর্মকার ঝুমইর গাইতে রওনা দেন ওড়িষা, ঝাড়খন্ড, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় | ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন সাংসদ শিবু সোরেন তাঁকে চারণ কবি আখ্যা দেন |

কৃত্তিবাস কর্মকার কতগুলো ঝুমইর রচনা করেছেন তার সঠিক সংখ্যা হয়তো কারো জানা নেই | তবে সেই সংখ্যা যে হাজারের উপরে সে ব্যাপারে কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই| তিনি ভবপ্রীতানন্দ ওঝা, দীনা তাঁতি, রামকৃষ্ণ গাঙ্গুলি, বরজুরাম দাস, বিনন্দীয়া, গৌরাঙ্গিয়া, চামু কামার প্রমুখ কবির লেখা ঝুমইরের সাথে সাথে নিজের লেখা ঝুমইরও গাইতেন | তবে তাঁর নিজের লেখা ঝুমইরের চাহিদায় এতো বেশি করে মানুষের মনকে ছুঁয়ে যেত সে আর বলার অপেক্ষা রাখেনা| তিনি অনেক গুলো ঝুমইর এর বই লেখেন ও প্রকাশ করেন | তার মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হল –

১) মানভূম রস মঞ্জরী
২) পুরুলিয়া ঝুমুর সঙ্গীত
৩) সোনার ঝাড়খন্ড
৪) যুগে যুগে টুসু গান
৫) পুরুলিয়া জেলার গুণীজন গ্রন্থমালা
৬) ধন্য পুরুলিয়ার মাটি
৭) ঝুমুরে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু সংবাদ
৮) পুরুলিয়ার ঝুমুরে কারগিলের সমস্যা
৯) পুরুলিয়ার ঝুমুরে রাজীব গান্ধীর মৃত্যু সংবাদ
১০) কাঁসাই নদীর বন্যা

১৯৭২ সালের কাশিপুর থানার অন্তৰ্গত চুনাগ্রামে বিয়ে করেন তিনি | তাঁর তিন পুত্র সন্তান হয়েছিল |ঝুমইর গান করে এক রাতে এক থেকে দেড় হাজার টাকা পেতেন| কিন্তু ঝুমইর দলের অন্যান্য সদস্যদের টাকা দেওয়ার পর হাতে এক দেড়শো টাকার বেশি বাঁচতো না | তবুও ঝুমইরকে অদম্য ভালোবেসে এবং সম্বল করে দিন কাটাতেন তিনি |

গোবিন্দপুরের অমূল্য রতন মাহাত কৃত্তিবাস কর্মকারের জীবনী সংক্ষিপ্ত ভাবে লিখেছিলেন | তাতে তিনি লেখেন –
“কৃত্তিবাস কর্মকার পুরুলিয়ার মানুষ| পুরুলিয়ার হাওয়া বাতাস বন জঙ্গল পাহাড় পর্বত যদি নালা সাংস্কিতি খুব ভালো বাসেন| তাই ঝুমুর গান লিখতে লিখতে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার লোকের সঙ্গে বিরাট পরিচিতি গড়ে উঠে| ঝুমুর জগতে – যেখানে ঝুমুর, সেখানেই কৃত্তিবাস| পুরুলিয়ার সংস্কৃতিকে বাঁচানোর জন্য তার যে অবদান আছে সেরকম মানুষ পুরুলিয়াতে অনেক কম খুঁজে পাবেন | এমনকি ১৯৯৫ সালে তাঁর বড় পুত্র মারা যায়| তবুও ঝুমইর লিখতে বা গাইতে ছাড়েন নাই| সত্য কবি কৃত্তিবাস কর্মকার – কর্মকার সমাজ কেন , পুরুলিয়া জেলার গৌরব |”

কৃত্তিবাস কর্মকার ঝুমইর ছাড়া জাওয়া, ভাদু, টুসু, অহিরা প্রভৃতি গান রচনা করেন এবং সেগুলি তিনি গাইতেনও সুর করে| অনেক গুলো ক্যাসেট ও প্রকাশ হয় কৃত্তিবাস কর্মকারের নামে| একটা সময় ছিল যখন তিনি প্রায় ৪০ জন নাচনির জন্য গান লিখতেন|

এত প্রতিভা, এতো জনপ্রিয়তা , এতো মানুষের জীবনের গান লিখলেও সরকারি সম্মান , সুযোগ , সুবিধা থেকে চিরকালই বঞ্চিত ছিলেন তিনি | তবে বেসরকারি ভাবে অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন তিনি| তিনি যেসব সম্মান পেয়েছিলেন তার একটি তালিকা নীচে দেওয়া হলো –
১) আদিবাসী লোকসংস্কৃতি বিকাশ পরিষদ থেকে দেওয়া সম্মান ও মানপত্র
২) ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া মানপত্র (২০০৩)
৩) ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ৫০০০ টাকার সমানিক (২০০৩)
৪) দলিত সাহিত্য সংস্কৃতির দেওয়া সম্মান ও মানপত্র
৫) ময়ূরভঞ্জ লোকশিল্প কোলাকেন্দ্রের মানপত্র ও সম্মান
৬) জামশেদপুরের নির্মল মাহাতো শহীদ মেলার সংবর্ধনা
৭) রাঁচি থেকে ‘নাগপুরী কলা সঙ্গম’ পুরস্কার
৮) ধানবাদে লোকসংস্কৃতি উৎসবে সম্বর্ধনা
৯) দিল্লিতে বাণিজ্য মেলায় প্রদত্ত সম্মান ও মানপত্র ( ১৯৯৭ )

তাঁর রচিত কুড়মালি ঝুমেইর রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত। এই মহান কবির জীবনের সামান্য কিছু দিক তুলে ধরতে পেরে আমরা আপ্লুত|

Leave a Reply