ঝাড়খণ্ডের জালিয়ানওয়ালাবাগ – আজ আদিবাসী শহীদ দিবস

Beyond Borders, Editorials

সংকলক: লালন মাহাত

বাঙালী, বিহারী ও উড়িয়া বাবুদের চাপে পড়ে ঝাড়খন্ডী মানুষদের অস্তিস্ত সংকটে পড়ার কাহিনী সবাই কম বেশী পড়েছেন| কখনো ওড়িয়ারা গ্রাস করতে চেয়েছে তো কখনো মিথ্যা পরিসংখ্যান দেখিয়ে মানভূমকে বিহারী আর বাঙালীরা ভাগ করে নিয়েছে| ব্রিটিশেরা কখনো বলেছে চুয়াড় আবার কখনো বা ক্রিমিনাল ট্রাইবস| কেও চার্চ খুলতে দৌড়ে গেছে আবার কেও ব্রাহ্মণ্যবাদের অং বং চং বা বৈষ্ণববাদের খোল করতাল নিয়ে গেছে| সাম্প্রতিক বিদায়ী গেরুয়া সরকার সিএন্ টি এক্টও তুলে দিতে চেয়েছিল| ফরেস্ট রাইট এক্টসও উঠে যাবো উঠে যাবো করছে| সোশ্যাল মিডিয়াতে রোজ লড়াই হচ্ছে যে সরক্ষন জাতিভিত্তিক হওয়া উচিত কি না| আসুন এরকম সন্ধিক্ষণে মনে করিয়ে দিই স্বাধীন ভারতের বৃহত্তম হত্যা লীলা তথা ঝাড়খণ্ডের জালিয়ানওয়ালাবাগের সত্য ঘটনার কাহিনী| আজ শহীদ দিবস| আদিবাসী শহীদ দিবস|

স্টিল সিটি জামশেদপুর এর নাম শুনেছেন নিশ্চয়| সেখান থেকে প্রায় ষাট কিলোমিটার দূরে প্রাগার্য্য আদিবাসী জনজাতি উপজাতি-অধ্যুষিত শহরটি খারসওয়ান। ভারতের স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ মাস পরে, ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি দেশ যখন স্বাধীনতার পাশাপাশি ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন করছিল, তখন খারসওয়ান আদিবাসীভূমি ‘স্বাধীন ভারতের জালিয়ানওয়ালাবাগ কাণ্ড’ এর সাক্ষী হয়ে উঠেছিল।

সে দিনটি ছিল সাপ্তাহিক হাটের দিন। উড়িষ্যা সরকার পুরো অঞ্চলটিকে পুলিশ শিবিরে রূপান্তর করেছিল। খারসওয়ান হাটে ওড়িশা মিলিটারি পুলিশ প্রায় পঞ্চাশ হাজার আদিবাসীর ভিড়ে গুলি চালিয়েছিল। এটি স্বাধীন ভারতের প্রথম বড় গুলি চালানোর ঘটনা | এই ঘটনায় কয়জন মারা গেছে সে সম্পর্কে বিভিন্ন দাবি রয়েছে এবং এই দাবির মধ্যে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। আদিবাসীদের মৃত্যু কেই বা গুনতে যাবে – কোনো শহুরে গোরা চামড়ার অত্যাচারী আর্য্য সম্প্রদায়ের মানুষ মারা গেলে হয়তো দরদ উঠলে উঠতো অনেকের| কিন্তু আদিবাসী – ভারতবর্ষের আদিবাসীন্দাদের জন্য কারো কোনোদিন মন কাঁদেনা| ওদের সহজ সরলতাকে দুর্বলতা ভেবে বছরের পর বছর ধরে শোষণ করে এসেছে বিহারী, বাঙালী, উড়িয়া বাবুরা| তাদের বীর বীরত্ব, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের অবদানকে খাটো করে দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টাও কম হচ্ছেনা| সম্প্রতি এনআরসিতে যে আইন লাগু হয়েছে তাতেও কোনো আদিবাসী ভারতে আসলে তাদের নাগরিকতা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই| কেনোকি আদিবাসীদের ধর্ম, ভাষা এগুলোকে খেয়ে ফেলতে চাইছে সরকারেই|

অনুজ কুমার সিনহার বই ‘ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের নথি: শোষণ, সংগ্রাম ও শাহাদাত’ এই গুলিচালনার একটি পৃথক অধ্যায় রয়েছে। এই অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, “নিহত মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে খুব কম দলিল পাওয়া যায়”। প্রাক্তন সাংসদ ও মহারাজা পিকে দেবের ‘মেমোয়ার অফ আ বাইগন এরা’ বই অনুসারে এই ঘটনায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।দেবের বই এবং এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণগুলির মধ্যে অনেকটা মিল রয়েছে বলে মনে করা হয়। তৎকালীন ইংরেজি পত্রিকা দ্য স্টেটসম্যান, ঘটনার তৃতীয় দিনে ৩ জানুয়ারির ইস্যুতে এই ঘটনাসংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল – ৩৫ জন আদিবাসী খারসওয়ানে নিহত ।সংবাদপত্র তার প্রতিবেদনে লিখেছিল যে পুলিশ উড়িশায় খারসওয়ানের একীকরণের বিরোধিতা করে ত্রিশ হাজার আদিবাসীদের উপর গুলি চালিয়েছিল। এই গোলাগুলি তদন্তের জন্য একটি ট্রাইব্যুনালও গঠন করা হয়েছিল, তবে তার রিপোর্টে কী হয়েছিল, তা কেউ জানেনা না| বিজেপি থেকে কংগ্রেস কোনো সরকারেই কোনোদিন জানার চেষ্টা অবধি করেনি আর করবে বলেও মনে হয়না| পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা অনেকে মনে করলেও এই ঘটনা নিয়ে অনেকেই মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন|

অনেকের মতে গুলিবর্ষণের দিনটি বৃহস্পতিবার এবং হাট বাজারের দিন ছিল। ওড়িশা ওড়িয়াভাষী রাজ্য হওয়ার নামে সরাইকেলা এবং খারসওয়ান রাজ্যে যোগ দিতে চেয়েছিল এবং এখানকার রাজাও এই প্রস্তাব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল। তবে এলাকার আদিবাসীরা, সাধারণ জনগণ ওড়িশায় বা বিহারে নিজেদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়নি। তাঁদের দাবি ছিল একটি পৃথক আদিবাসী রাজ্যের। ঝগড়া এই নিয়েই ছিল। এমন পরিস্থিতিতে, কোলহান এলাকার আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই হাট-বাজারে গিয়েছিলেন সেদিন এবং ১লা জানুয়ারী জয়পাল সিং মুন্ডার ভাষণ শুনছিলেন। জয়পাল সিং পৃথক আদিবাসী রাজ্যের স্লোগান তুলে আন্দোলন করছিলেন। জয়পাল সিং মুন্ডা আসার আগে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল এবং পুলিশ তাঁদেরকে একটি লাইন অতিক্রম করতে বারণ করেছিল।

স্লোগান চলার মধ্যে জনসাধারণ কিছু বুঝতে পারার আগেই হঠাৎ গুলির শব্দ আসে। বিপুল সংখ্যক লোক মারা গিয়েছিল সেদিন পুলিশের গুলি চালনায়। গুলি চালনার স্থানে পাশেই একটি বিশাল কুঁয়ো ছিল। এই কুঁয়ো সেই জায়গার রাজা রামচন্দ্র সিংদেব তৈরি করেছিলেন। ঘটনার পর কুঁয়োটি আর কুঁয়ো ছিল না। কেবল মৃতদেহ ও অর্ধ-মৃত শরীর দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেছিল এবং তারপরে সেটি মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল।

ঘটনার দিন নাকি মেশিনগানও চলেছিল| কিছু প্রতক্ষদর্শীরা এটাও জানিয়েছেন তাদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে| শহীদদের স্থানটি আজ যেখানে রয়েছে সেখানে একটি বাংলো ছিল যা এখনও রয়েছে। কাছেই একটি ব্লক অফিস ছিল। সেখানে একটি মেশিনগান ছিল এবং সামনের দিকে একটি লাইন আঁকানো হয়েছিল। লোকজনকে বলা হয়েছিল যে তারা যেন রেখাটি অতিক্রম না করে, রাজার সাথে অহেতুক দেখা করার চেষ্টা না করে। গুলি চালানো শুরু হলে আদিবাসীরা প্রথমে তীর দিয়ে আক্রমণ প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল কিন্তু মেশিনগানের কাছে পেরে ওঠেনি আদিবাসীদের তীর ধনুক| পুলিশের বুলেটের আওয়াজ শুনে কিছু লোক পালিয়ে গেলেও পৃথক আদিবাসী রাজ্য পেতে আদিবাসীরা বুক উঁচিয়ে থেকে বন্দুকের গুলি হজম করেছে|

এই ঘটনার পরে নাকি ওই অঞ্চলে সামরিক আইন জারি করা হয়েছিল। সম্ভবত এখানে স্বাধীন ভারতে প্রথম সামরিক আইন চাপানো হয়েছিল। কয়েক দিন পরে উড়িষ্যা সরকার গ্রামগুলিতে বিতরণ করার জন্য জামা কাপড় পাঠিয়েছিল, যা আদিবাসীরা নিতে অস্বীকার করেছিল। জনগণের হৃদয়ে ছিল যে এই সরকার আমাদের উপর গুলি চালিয়েছে, তবে কেন আমরা এর কাপড় নেব? শাক দিয়ে মাছ ঢাকার এরকম প্রয়াস প্রত্যেক সরকারেই করে আসছে| এস টি হওয়ার ললিপপ ঝুলিয়ে কুড়মি সমাজকে এখনো নাচাচ্ছে পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক মহল| কুড়মালি ভাষাকে মর্য্যাদা না দিয়ে, কুড়মালি ভাষায় শিক্ষা দীক্ষা চালু না করে বাংলার উপভাষা করে মিলিয়ে দিতে চাইছে একদল মানুষ| ব্রিটিশ সরকার এমনকি স্বাধীনোত্তর ভারতের সরকারের জনগণনার রিপোর্ট কে ভুল ভাবে পেশ করে মানভূম কে ভাঙা হয়েছিল ১৯৫৬ সালে| নাহলে আজকে পুরুলিয়া ঝাড়খণ্ডে হত|

একথায় দ্বিমত নেই যে, গুলি চালানোর মূল কারণটি ছিল উড়িশা রাজ্যে সাথে খারসওয়ানের একীকরণের বিরোধিতা। অনুজ সিনহা লিখেছেন যে “ঝাড়খণ্ড (তত্কাল বিহার) এ বসবাসকারী আদিবাসী এবং গোষ্ঠীগুলিও এই সংযুক্তির বিরোধীতা করেছিল ছিল। কিন্তু কেন্দ্রের চাপের ভিত্তিতে খারসওয়ান রাজপরিবারের পাশাপাশি খারসওয়ান রাজত্বও একীভূত হওয়ার চুক্তিতে পৌঁছেছিল।”
এই চুক্তিটি ১৯৪৮ সালের ১লা জানুয়ারীতে কার্যকর হয়। এরপরে মারঙ্গ গোমকে নামে পরিচিত আদিবাসীদের অন্যতম বৃহত্তম নেতা এবং অলিম্পিক হকি দলের সাবেক অধিনায়ক জয়পাল সিং মুন্ডা আদিবাসীদের খারসওয়ানে পৌঁছে এই একীভূতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই আহ্বানে, প্রত্যন্ত অঞ্চল ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে হাজার হাজার আদিবাসী তাদের প্রচলিত অস্ত্র কাঁড় বাঁশ নিয়ে জড়ো হয়েছিল। কয়েক দশক পুরাতন ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের দাবি এগিয়ে নিয়ে যেতেই আদিবাসীরা আসলে খারসওয়ান গুলি চালানোর দিন জড়ো হয়েছিল।

আদিবাসীদের তাদের রাজ্য ও স্বশাসনের জন্য দাবী অনেক পুরানো। ১৯১১ সাল থেকে এর জন্য সরাসরি লড়াই হয়েছিল। এর আগে ‘দিসুম আবু’আ রাজের বীরস মুন্ডা আন্দোলনের সময়, অর্থাৎ’ আমাদের দেশ, আমাদের রাজ ‘ স্লোগান চলতো। তারও আগে, ১৮৫৫ সালের দিকে, ‘হামারি মাতি, হামারা সরকার’ স্লোগান দিয়ে সিধু ও কানুও একই কথা বলছিলেন। “হামর গাওঁ হামর রাজ, দূর ভাগ চালবাজ ” এর স্লোগানও অনেক পুরানো|এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরে, স্বাধীনতার পরে সরাইকেলা-খারসওয়ান অঞ্চলের আদিবাসীরা দাবি করছিলেন যে আমাদের আলাদা পৃথক আদিবাসী রাজ্যের দাবি অটুট থাকবে এবং আমাদের কোনও রাজ্য অর্থাৎ বিহার বা উড়িষ্যাতে ভোট দেওয়া উচিত নয়। ঘটনার পর নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনেক বেঁচে থাকা মানুষকে জামশেদপুরে এবং পরে কটকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেছিল সরকার|

এই ঘটনায় সাধুচরণ বিরুয়ার ট্র্যাজেডির কথা অনেকের জানা| সাধুচরণ বিরুয়া নামক ব্যক্তিকে বেশ কয়েকটি গুলি লেগেছিল। এই ব্যথায় তিনি বুঝতে পারেননি যে একটি গুলি তাঁর হাতের মধ্যেও রয়েছে। ৫৪ বছর ধরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে তাঁর হাতে ব্যথা হয়, গুলি আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে, তারপরে সেই গুলি একটা বন্দুকে ভরে চালানোও হয়েছিল।

এই ঘটনার পরে পুরো দেশে একটি প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। সেই দিনগুলিতে দেশের রাজনীতিতে বিহারের নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল এবং তারাও এই সংহতকরণ চান না। এমন পরিস্থিতিতে এই ঘটনার প্রভাবটি ছিল যে উড়িষ্যার সাথে এই অঞ্চলে একীকরণ বন্ধ হয়ে গেছিল। ঘটনার পরে সময়ের সাথে সাথে এই জায়গাটি খারসওয়ান শহীদ স্থল নামে পরিচিতি লাভ করে, যা আদিবাসী সমাজ এবং রাজনীতিতে অত্যন্ত আবেগময় এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করে। খারসওয়ান হাটের একটি অংশে আজ শহীদদের স্মৃতিসৌধ রয়েছে এবং এটি এখন একটি পার্কেও রূপান্তরিত হয়েছে।
এর আগে এই পার্কটি সাধারণ মানুষের জন্যও উন্মুক্ত ছিল, তবে ২০১৩ সালে এখানে ‘শহীদ দিবস’ সম্পর্কিত একটি অনুষ্ঠানের সময় ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী রঘুবার দাস প্রতিবাদ করেছিলেন এবং জুতা উপড়ে ফেলেছিলেন। সেই থেকে এই পার্কটি সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ হয়ে গেছিল।

একদিকে যেখানে ৫ জানুয়ারী শহীদ স্থানে উপজাতিদের আচার-অনুষ্ঠান করা হয়, অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডের সমস্ত বড় রাজনৈতিক দল এবং উপজাতি সংগঠনগুলি প্রতি বছর এখানে কর্মসূচি পালন করে। এবারও খড়সানওয়া চক অনেক দলের হোর্ডিংয়ে পূর্ণ।বিজয় সিং বোদরা বর্তমানে শহীদ স্থানের পুরোহিত। বংশ পরম্পরায় তাঁর পরিবার এখানে পূজা করে আসছে। ১লা জানুয়ারি শহীদদের নামে পূজা করা হয়। লোকেরা শ্রদ্ধা জানায়। ফুল-মালা দিয়ে ধানের রশি দিয়ে পূজা হয়। শহীদ স্থানে তেলও দেওয়া হয়।
ছোটনাগপুর ভয়েস এর পক্ষ থেকে সমস্ত আদিবাসী শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য|

Leave a Reply