শাসকদলের সাথে অবৈধ পাথর খাদান মালিকদের পুরানো পিরিতির গল্প

Our Voice

লালন কুমার মাহাত:

বেশিদিন আগেকার কথা না । ২০১৭ জুন মাস।

পাথর খাদান গুলো লিজ দেওয়ার জন্য ‘ই-অকশন’ চালু করে পশ্চিমবঙ্গ  রাজ্য সরকার। তখনও সারা পুরুলিয়া জেলা জুড়ে অবৈধ পাথর খাদানের রমরমা ছিল। অবৈধ পাথর খাদান মানেই কোটি কোটি টাকা।কিন্তু জঙ্গলমহলে রাজস্বের পরিবর্তে কিছু টাকা নেতা, মন্ত্রীদের পকেটে গুঁজে দিলেই হয়। পার্টি অফিসের খরচ, ভোট করার খরচ এসব আসবেই বা কোথা থেকে ? মমতা ব্যানার্জীর মাথায় ঋণের বোঝা তাই নাকি রাজ্য সরকার এর আর্থিক অবস্থা টালমাটাল। নতুন পে কমিশন লাগু করা যায়না সময় মত। কিন্তু এলাকার নেতা সাহেবরা ভাগ্য করে পদ পেয়েছেন, তাই যতদিন চলে ততদিন অন্তত চেটেপুটে, চুরিচামারি করে , পাথর বিকে, বনের কাঠ বিকে চলুক। আর চলছেও সেভাবে। তাই ২০১৭ সালে রাজ্য সরকার ও পুরুলিয়া প্রশাসন যখন পাথর খাদান গুলো ‘ই-অকশন’ করে বৈধ ভাবে পাথর তোলার চেষ্টা করছিলো তখন নেতা মন্ত্রীদের কাছে পাথরের চোরা কারবারিদের ফোন যায় – ফোনে হয়তো বলা হয় যে তারা এতদিন ধরে যে মন জুগিয়ে এসেছে সেগুলো কিসের জন্য। নেতা সাহেবরাও ভাবলো পাথর খাদানের বৈধিকরণ বন্ধ হতে হবে। তাই, শুরু হলো স্ট্রাটেজি।

পথে নামলেন শাসকদলের নেতারা। ২৮ জুন, ২০১৭ বুধবার পুরুলিয়ায় ‘ই-অকশন’-এর প্রতিবাদে পথে নামে পুরুলিয়া জেলা পাথর ব্যবসায়ী যৌথ কমিটি। সাথে ভুল বুঝিয়ে নামানো হয় কিছু পাথর শ্রমিককেও। পাথর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সামিল হন পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল নেতাদের অনেকেই। তাঁরা পুরুলিয়া শহরে মিছিল করে তৎকালীন জেলাশাসকের কাছে দাবিপত্র তুলে দেন। শুধু তাই নয় সেদিন প্রতিবাদ সভাও হয়েছিল। সেখানে প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন তৃণমূলের জেলা সম্পাদক নবেন্দু মাহালিও। কিন্তু যেখানে স্বচ্ছতার স্বার্থে ই-অকশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার, সেখানে শাসকদলের নেতারাই কেন প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে।

পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করুন। ভাবুন, একদল ডাকাত এক এলাকায় চুরি করতে গেলো। গ্রামের লোকজন তাদেরকে বাধা দিলো। তাই, অনেকগুলো ডাকাত দল মিলে একটা সংগঠন বানালো , তারপর তারাই নেতামন্ত্রীদের সাথে মিছিল করে চুরি করতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানালো। ডাকাত দলের সভাপতি জানাতেই পারেন যে – আমাদের চুরি করতে অসুবিধে হচ্ছে। সেই ডাকাত দলকে আবার পুলিশের প্রটেকশন দিচ্ছে। নচিকেতার সেই একটা গানের মতো পরিস্থিতি তখন পুরুলিয়াতে।

একটি প্রকাশিত খবর অনুযায়ী পুরুলিয়াতে নাকি মোট ১৬৫টি পাথর খাদান রয়েছে। সেখানে ৪০-৪৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। জেলার অবৈধ পাথর ব্যবসায়ীরা সেসময় যেটা বলে নেতাদের হাত ধরে ‘ই-অকশন’ বন্ধ করেছিল তা হল – সরকার পাথর খাদানগুলি ‘ই-অকশন’ করলে তা বহিরাগতদের হাতে চলে যাবে। তাতে নাকি কাজ হারাবেন জেলার হাজার হাজার শ্রমিক। ভাবুন, অবৈধ ভাবে হাজার টাকার পাথর চুরি হচ্ছে সবার সামনে দিনের আলোয়, কোটি টাকার রাজস্ব লুট হচ্ছে , শ্রমিকদেরকে কম টাকা দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, শ্রমিকদের সেফটি ও স্বাস্থ্যের কোনো সুরক্ষা নেই তাদের স্বার্থে তৃণমূল নেতারা কথা বলেছিল সেদিন। পাথর শ্রমিক কাজ হারাবে সেটা তো অজুহাত মাত্র – আসল কথা নেতা সাহেবদের পকেটে টান পড়বে পাথর খাদান গুলো বৈধ হলে। পাথর খাদান গুলো বৈধ হলে এলাকার মানুষ কাজ পাবে, সুরক্ষাও পাবে, শ্রমিকেরা ঠিক বেতন পাবে, রাজ্য সরকার রাজস্ব পাবে। তা না করে উল্টে অবৈধ পাথর খাদান চালিয়ে যেতে তৃণমূল এর নেতারা সেদিন এভাবেই সাহায্য করেছিল।

পুরুলিয়া জেলার জেলার বালি ঘাটগুলির ই-অকশন হয়েছে আগেই। কিন্তু তাতেও অবৈধ ভাবে বালি তুলতে সাহায্য করেন অনেক নেতা মন্ত্রী। সেখানেও সরকারের খাতায় রাজস্ব না দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কাজও চলছে এই জেলায়। ফুলে ফেঁপে উঠছে নেতাদের পকেট। বিশ্বাস না হয় , কাশিপুর ব্লকে গিয়ে দেখে আসুন।

২৮ জুন ২০১৭ জেলাশাসককে বিক্ষোভ দেখানোর সময় ‘ই-অকশন’ এ যাতে জেলার পাথর ব্যবসায়ীদেরকেই পাথর খাদান গুলো দেওয়া হয় এমন ধরণের দাবি করে দাবিপত্র জমা দেন তৃণমূলের জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মাণিকমণি মুখোপাধ্যায়ও। পক্ষান্তরে অর্থটা এটাই দাঁড়ায় যে – নেতাদের সাথে যাদের কাট মনির সেটিং আছে তারাই যেন পাথর খাদান গুলোর দায়িত্ত পায়। অর্থাৎ পুরোপুরি একটা বে-আইনি জিনিসকে সেদিন সমর্থন করেছিল শাসক দল।

তখন জেলাশাসক ছিলেন অলকেশপ্রসাদ রায়। তিনি তৃণমূলের দাবিপত্র তথা অবৈধ পাথর ব্যবসায়ীদের , অবৈধ ভাবে পাথর লুন্ঠনের কান্ডারীদের দাবিপত্র পাঠিয়ে দেন রাজ্য সরকারের কাছে ।ফলস্বরূপ পাথর খাদান গুলোর বৈধিকরণ বন্ধ হয়ে যায় সেবারে।

কিছুদিন আগে তৃণমূলের দুই নেতা – জেলাস্তরের নেতা সুজয় বন্দোপাধ্যায় এবং ব্লক স্তরের নেতা সুদর্শন মাহাতো যেসব নাটক করছেন বা করেছেন সেগুলোও হয়তো সবই অবৈধ পাথর খাদান মালিকদের স্বার্থে। হয়তো সবটাই নাটক। সামনে ভোট। ব্যাপারটা বুঝতেই পারছেন।

এখনো বরাবাজার থানার তালাডি, ধারগ্রামে অবৈধ পাথর খাদান চলছে রমরমিয়ে। ভোটের আগে বন্ধ হবে বলে মনে হয়না। ভোটের পরে কি হবে সেটা সময় বলবে।

(ছবি ও তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার)

বরাবাজার ব্লকে বন জঙ্গলের জমিতে চলছে অবৈধ পাথর খাদান (ভিডিও সোর্স : জয়ন্ত মাহাত)

Leave a Reply