শিকার উৎসবের বার্তা

Our Voice

নির্মল হালদার:

কদিন বাদেই বৈশাখী পূর্ণিমা।

এই দিনটিতে পুরুলিয়ার অযোধ্যায় শিকার উৎসব হয়ে থাকে।

বিভিন্ন রাজ্য থেকে আদিবাসী–সাঁওতালরা অযোধ্যায় এসে মিলিত হয়।
শিকার হয়।

শিকার বললেই, আমাদের সামনে এসে পড়ে বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের মুখ। পাখির মুখ।

আদিতে এই ছবিটা ছিল না।

আদিবাসী সাঁওতালদের বসবাস বরাবর জঙ্গলে জঙ্গলে। পাহাড়তলীতে।
ঘরের বাইরে এলে তাই, সঙ্গে থাকতো তীর ধনুক। আরো অন্যান্য অস্ত্র।

হিংস্র জন্তুর সামনে পড়ে গেলে, আত্মরক্ষা করতেই,
অস্ত্র ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু শিকারের নামে উৎসব
কখনোই ছিল না।
ছিল “সেঁদরা”।

সেঁদরা শব্দটির অর্থ অনুসন্ধান

আদিবাসী সাঁওতালদের অনুসন্ধানের দিন বৈশাখী পূর্ণিমা।

কি অনুসন্ধান?

শীতের সময় পাতা ঝরে যায়।
বন-জঙ্গল ফাঁকা হয়ে যায়। বসন্ত এলে দেখা যায় গাছে গাছে নতুন পাতা। যা পরিপূর্ণ হয় গ্রীষ্মকালে।

অনুসন্ধান করার প্রকৃত সময়
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ। এবং পূর্ণিমার আলো পেলে রাস্তা দেখা গাছপালা দেখা পশু পাখি দেখার কোন সমস্যা হয় না।
সমস্যা নেই, গাছপালা চিনতে।

আদিবাসী সাঁওতালদের অনুসন্ধানটা এই, কোন কোন গাছে ফল আসে। কোন কোন গাছ ঔষধি গাছ।

ধারণা করা হয়,
আদিবাসী সাঁওতালরা শাকাহারি ছিল। ফলাহারি ছিল।

বনের ফলমূল খেয়েই ধারণ করেছে জীবন। অনেক অনেক পরে, বন্য জন্তুর দেখা পেলেই, হত্যা।

জটিলতাও এসেছিল, হত্যা করে প্রাণরক্ষা তো হলো, তারপর কি করবে?
ভক্ষণ করো।

পাহাড়ের শুঁড়ি পথে , জঙ্গলে
আগুন জ্বালিয়ে ঝলসানো হতো জন্তুদের।
তারপরেই উল্লাসে উল্লাসে খাওয়া-দাওয়া। নাচ গান।

আদিবাসী সাঁওতালদের নিরামিষাসী দিনের পর শুরু হয়েছিল আমিষের দিন।

এখন ধারাবাহিক।

এই আদিবাসী সাঁওতালরা তাদের বাৎসরিক উৎসব থেকে এবছর বঞ্চিত হচ্ছে।

আদিবাসী সাঁওতালদের সর্বভারতীয় সংগঠন ভারত
জাকাত মাঝি পারগাণা
ঘোষণা করেছে করোনা ভাইরাসের কারণে, এবছর বন্ধ থাকছে শিকার উৎসব।

এবছর
লা–বির বাইসি বসছে না
অযোধ্যার মাথায়।

লা–বির বাইসির অর্থ বিচার সভা। যে যেখান থেকে এসেছে, এই বিচার সভায় জানাবে, নানান অভিযোগ। এবং বিচার চাইবে। বিচার হবেও।

সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে
অনেক কিছু পাল্টে গেছে। এবং পাল্টে যাওয়া রূপের
নানান ব্যাখ্যা হয়েছে। বিকৃতিও ঘটেছে।

আদিবাসীদের জীবনের বাইরে থেকে যারা দেখে আদিবাসীদের , প্রধানত তারাই অনেক সময় ব্যাখ্যা দিয়েছে ভুল। প্রচার হয়েছে
মনগড়া গল্পের।

আমাদের ঔপনিবেশিক শিক্ষা লোকজীবনকে কখনোই মর্যাদা দিতে শেখায়নি।ফলে, লোকজীবনের ধর্ম সংস্কৃতি জীবনযাপন থেকে আমরা কেবলই দূরে দূরে চলে এসেছি।

নিজেদের শিকড় চিনতে পারিনি।

আমরা কেউ কেউ আদিবাসীদের জীবনকে দেখেছি গবেষণা গ্রন্থে। কখনো কখনো চলচ্চিত্রে।
তাদের জীবনের কাছে খোলা মন নিয়ে দাঁড়াতে পারিনি। এই অক্ষমতা কিংবা দোষ আজ স্বীকার করতেই হয়। আমাকে অন্তত বলতে হয়, বন্ধু রাজেন টুডুকে—–ভাই,
শিকার উৎসব নিয়ে কিছু কথা বলো। জানাতে চাই সবাইকে।

শিকার উৎসব এ বছর বন্ধ, সমর্থন জানিয়েছে আদিবাসী কুড়মি সমাজ ও।

বন্ধের ফলে, অন্য এক ক্ষতি হলো পুরুলিয়া তথা অযোধ্যার।

বেচাকেনা বন্ধ হলো। আর্থিক লেনদেন বন্ধ হলো। সর্বোপরি, মিলনের একটা দিন। ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে বিহারের, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ওড়িষার
দেখা হলো না।

হয়ত বা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বেঁচে গেল কিছু মানুষ। কিছু গাছপালা। নদী-ঝর্না-পাহাড়।

আগামী বছর সজীব সতেজ অরণ্য গভীরে সবার সঙ্গে সবার দেখা হবে কথা হবে।

বেজে উঠবে মাদল। কেঁদরি।
বাঁশির সুরে সুরে বইতে থাকবে বাতাসের সঙ্গে বাতাস।

 

Leave a Reply