সস্তা জনপ্রিয়তার প্রলোভনে আদিবাসী সংস্কৃতি

Recent

কলমে- মৃন্ময় বঁশড়িয়ার

একটা সংস্কৃতি তিল তিল করে গড়ে ওঠে। তার মানে সেখানে সংযোজনের সাথে বর্জনও থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে সেটা কখন উত্তরণ কখন অবনমনের দিকে পা বাড়ায়? সেটা নির্ভর করে সামগ্রিকভাবে দেশ, সমাজ, বহিরাগত সংস্কৃতির আগ্রাসনের শক্তির উপর। দারিদ্র্যতা একটা সংস্কৃতিকে চাপে রাখলেও সার্বিকভাবে ধ্বংস করতে পারে না। শহুরে সংস্কৃতি আর আদিবাসী ও গ্রাম্য সংস্কৃতির নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে। সারা রাজ্যজুড়ে এখন সমাজ, সংস্কৃতি ও বিনোদন ক্ষেত্রে বিশাল প্রতিযোগিতা এবং এই বর্নাঢ্য প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সস্তা, সহজলভ্য শো কেস হলো আদিবাসী সংস্কৃতি যাকে যখন তখন যেখানে সেখানে শুধু মাত্র পেটের ভাত আর সামান্য রাস্তা খরচেই হাতের নাগালে পাওয়া যায়। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী একটা সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতিকে আপনারা এভাবে ভাড়া খাটাচ্ছেন! লজ্জা করেনা আপনাদের?

রাজনৈতিক সভা, পুজো উদ্বোধন, শোভা যাত্রা সর্বত্র লালপেড়ে শাড়ি আর মাথায় হলুদ ফুল গুঁজে কালো মানুষের একটা দল আসে সঙ্গে ধমসা মাদল ফ্রি। কেউ বলতে পারবে না, কী গান তারা গাইলেন, কী নাচ নাচলেন, কী তার মানে, আর কী হল সব মিলিয়ে। কেউ দেখেও না, শোনেও না, দেখতে বা শুনতে ওদের লরি বোঝাই করে আনাও হয় না। এটা অপমান নয়!

টিভির বিজ্ঞাপনে, ধারাবাহিক গুলোতে উন্মুক্ত বক্ষে হাঁটু পর্যন্ত শাড়ি পরিহিতা যেকোনো মহিলাকে একটা আদিবাসী নাম দিয়ে চরিত্র উপস্থাপন করেন। এবং সমগ্র বাংলা পরিবেশিত খাবার গোগ্রাসে গিলতে থাকেন। অথচ যিনি চরিত্র উপস্থাপন করছেন বা যিনি অভিনয় করেছেন তার আদিবাসী জীবন যাপন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।

যেটার জন্য এতক্ষণ ভাঁট বকলাম, এবার আসি আদিবাসীদের উপাস্য ও গান নিয়ে। আদিবাসী ভাষায় কোনটা উপাস্য দেবতার নাম আর কোনটা গালি সেটা শহরের বাবুরা বোঝেন না। তাই যেখানে যা খুশি শব্দ ব্যবহার করে চলেন। শুনতে বেশ মজাদার তাই অর্থের কেউ ধার ধারে না। “শুন বিহারী ভাই, তরহা রাখত্যে লারবি ডাং দেখাঞ” মনে পড়ে ভাষা আন্দোলনের কথা? ২০ শে এপ্রিল, ১৯৫৬??? এই ঝুমুর টুসু, করম জাওয়া গীত সব মুখে মুখে রচিত হয়। তাই একটি সচেতনতা মূলক গান লিখতে হবে? শাস্ত্রীয় সংগীত সম্ভব নয়। হিন্দি লিখলে ক্যালানি জুটবে, বাংলাগান পাব্লিক খাবেনা। তাহলে টার্গেট এবার ঝুমুর। লিখে ফেললেন কেউ, পুরাতন কোনও ঝুমুর গান থেকে সুর করলেন চুরি। ব্র‍্যাকেটে লিখে দেবেন ‘প্রচলিত সুর’ কেউ তো আপত্তি করবে না।

প্রচারের কচকচানি, আলোর নীচে সভ্যতার আদিমতম সংস্কৃতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া; যা থেকে এখনও প্রকৃতির লালাভাব স্নেহলতা স্পষ্ট, প্রকৃতি মায়ের আদরমাখা হাসি লুপ্ত হয়নি, তাকে নিয়ে এসে ফেলা হয় হিংসালোলুপ মস্তবড় হ্যালোজিনের সামনে; সবচাইতে বড় বিপত্তি আদিবাসী মহলের সাংস্কৃতিক আঁকর কোথাও একটা পরিশীলিত মার্জিত গণ্ডী পেরিয়ে সংস্কার ভাঙনের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে। নবপ্রজন্মের শহরমুখীনতা, গ্লোবালাইজেশনের গোলকধাঁধায় স্বসত্তা উজাড় করছে ক্রমশ। বাজারি অর্থনীতির ছোবলে প্রকৃতির ধ্বংসসাধন। প্রকৃত অবস্থান ব্যতিরেকে আধুনিকতার উলঙ্গ জীবনজোয়ারে গা মেলাতে এসে লোকচর্চা/ লোকসঙ্গীত/ লোকানুষ্ঠান হারাচ্ছে আপন সাধনার পীঠস্থান! নিজেদের একত্রতায় বেঁধে যাবতীয় নাগরিক প্রলোভনের ঊর্দ্ধে গিয়ে আপন সংস্কৃতিসত্তা টিকিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস ও সৎ-সাহস বলবৎ রাখতে হবে সর্বদা। যদিও বর্তমান সমাজের সর্বগ্রাসী ধ্বংসলোলুপতা, সর্বপ্রকার রাজনৈতিক চাটুকারিতা, উন্নত জীবনধারা পরিচর্যার সার্বিক সুবিনিময় মোহ তার অন্যতম প্রধান অন্তরায় !

শহুরে কলকাতার বাবুদের এই এলাকার সংস্কৃতি ,রীতি রেওয়াজ ,দেবদেবীর সম্বন্ধে সাধারন জ্ঞান থাকে না বা জানার চেস্টা করে নাই। ভোট বাবুরা আদিবাসীদের গান ভোটের বাজারে কাজে লাগিয়ে ফায়দা তোলে ও আদিবাসী দরদ দেখায়।কিন্তু আমদের আরাধ্যাদেবীর নিয়ে অবমাননাকর গান পরিবেশন হলেও সেই ভোটবাবুদের কোন মন্তব্য নজরে আসে না।’ বই মেলা’ থেকে ‘ সৃজনভূমি’তে আরাধ্যা দেবী টুসু ‘ ছুঁড়ি ‘ বলে অবহিত হয়।অথচ রাজনৈতিক নেতাদের ‘ টুঁ’ শব্দও কানে আসে না।অথচ সরকারি টাকা খরচ করে আদিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণের মেকি দরদ দেখায়।

প্রতিবাদ হলে হোক সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে। বিকৃত সংস্কৃতি পরিবেশকে জানাই ধন্যবাদ প্রতিবাদের অবকাশ তৈরি করার জন্য। আমিও চাইছি প্রতিবাদ হোক। কিন্তু আদিবাসী যদি নিজেকে নিজের সৃষ্টিকে মর্যাদা না করতে পারে, এরকম অপমান বারবার আসবে। শেষে শহরের বাবুদের আমাদের ভাষায়, আমাদের গীতে বলি-
“গঠে সাজে গাই গরু, খেতে সাজে ধান লো
মায়ের কলে ছেইলা সাজে যেমন লৌতন চাঁদ লো”।

বন্যেরা বনে সুন্দর। শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

Leave a Reply