কুড়মি বঞ্চনা ~ আমার’ ভাখি’ আমার ‘নেগাচার’

Recent

 

– অমিত পরামানিক

 

 

                   বিভিন্ন  জাতি,ধর্ম, ভাষা,সংস্কৃতির দেশ এই ভারতবর্ষ। বৈচিত্রই এই সুমহান ভারতের ভিত্তি। আদিম অধিবাসীরা আজ নিজেরা অনেকেই আশঙ্কা তে। এন আর সি এর মতো কত জুজু ই ভিড় করে দিনরাত।  হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কোনরকমে দিনপাত করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় মাথায় ভাবনা ঘোরাফেরি করে নিজদেশে পরবাসী হয়ে যাওয়ার শুধুমাত্র কয়েকটি কাগজের অভাবে। মূহুর্তে তখন মনে হয়, ভাষা, সংস্কৃতি,জাতি ,ধর্ম সব আচমকাই নিজের শত্রু হয়ে ওঠে। পরিচয় পত্রের এগুলো কোনভাবেই দলিল হয়ে ওঠে না। সকাল হলেই হাড়ভাঙা খাঁটুনির ফাঁকে নিজের আইডেন্টিটি নিয়ে তবু তারা আন্দোলন জিইয়ে রাখে।
                  গত ২৯ এ নভেম্বর সংসদের নিম্নকক্ষে বিরোধী দলনেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী মহাশয় ‘কুড়মি’ আদিম উপজাতির  দীর্ঘদিনের এরকম এক বঞ্চনার  কথা তুলে ধরেছেন। এই আদিম উপজাতিদের নিয়ে আলোচনা একটা নির্দিষ্ট গন্ডীর বাইরে না বললেই চলে। সবাই জানেও না বিশেষকরে তাদের।  যদিও শহুরে বাবুদের কাছে ‘সাগিনা মাহাত’ অজানা নয় বা বিভূতিভূষণ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় এর ‘আরণ‍্যক। সেখানে কমবেশি আমরা ‘কুড়মি-মাহাত’দের কথা জানতে পারি যারা অরণ‍্যবাসী।যাদের বসবাসের বিস্তৃতি এই রাজ্যের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, মালদা,উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর,উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা নদীয়া সহ আরো কিছু জেলায়। তাছাড়া ছোটনাগপুর এর এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঝাড়খন্ড, বিহার – এ ছড়িয়ে আছে। ওদিকে আসাম, ওড়িশা  এই আদিম গোষ্ঠীর বসবাস। অধীর রঞ্জন মহাশয় এদের  আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার জন্য সংসদে উত্থাপন করেছেন। আমাদের বেশিরভাগের কাছেই এদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বা মানুষ জনদের নিয়ে জানা নেই কিছুই।  দেখে নেওয়া যাক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সরকারি নথিভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে ধীরে ধীরে বঞ্চিত হয়ে এসেছে এ জাবৎকাল ‘কুড়মি’রা।
                 ১৮৭২ সালের প্রথম জনগণনা থেকেই ভারতবর্ষের অন্যান্য আদিবাসী জাতির সঙ্গে একই তালিকায় Aboriginal Tribes হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৩১ সালের জনগণনাতে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কুড়মি জাতি আদিবাসী তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এমনকি ১৯১৩ সালে ভারতের Home Department কর্তৃক প্রকাশিত ৫৫০ নম্বর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী যে ১৩ টি জাতিকে Tribes হিসেবে উল্লেখ করা হয় তাতে নাম ছিল কুড়মি  জাতিরও ।সেই জাতিগুলির সব গুলিকে স্বাধীন ভারত সরকার ১৯৫০ সালের প্রথম Schedule Caste and Schedule Tribes এর তালিকায় ST হিসাবে তালিকাভুক্ত করলেও বিস্ময়করভাবে কেবল বাদ পড়ে যায় কুড়মি জাতি। এই বাতিলের বিষয় টি নিয়ে পার্লামেন্টে এ যাবৎ কোন বিল আসেনি। ঊথ্থাপিত হয়নি  কুড়মিদের দাবি পুনরায় ST তালিকাভুক্ত করার।
        অনেকের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এই কুড়মি সম্প্রদায়ের মানুষজন এর দাবি দাওয়া  অহেতুক। যদিও একটু শিকড়ের গভীরে গিয়ে অনুধাবন করতে চেষ্টা করি তাহলে অন্য একটা অজানা ছবি ধরে পড়ে যা আমরা খুব কম শিক্ষিত মানুষই খবর রাখি।
নিশ্চয় এখন জানাতে ইচ্ছে করে এই উপজাতির মানুষজনদের নিয়ে! জেনে নিই এই ফাঁকে এদের নিয়ে কিছু অজানা তথ্য।
১৮৭২ সালে ব্রিটিশ গবেষক E. T. Dalton তার নৃতাত্ত্বিক গবেষণা গ্রন্থে Descriptive Ethnology of Bengal এ লিখছেন ” The number of the principal aboriginal tribes who form 56.52 percent ,of the total population is as follows
1)Santhal 185149. 2)Ho or Kol 67768. 3) Bhumij 56157 . 4) Kurmi- 35968
Bengal Gazzeteers (Mayurbhanj)
অন্যদিকে  একটা বিজ্ঞপ্তিতে Home dept. notification, the 2nd May 1913 number 550 , whereas the tribes known as the Mundas, Oraons, Santals, Hos, Bhumij, Ghasis, Gonds, Khandhas, Korwa, Kurmis, Male, Saurias and Pans dwelling in the province of Bihar and Orissa have customery rules of succession……
          এমনকি ২০০৫  সালে বাঁকুড়া এর সারেঙ্গা এর একটি কোর্ট কেস এ কুড়মি জাতিকে schedule Tribe হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে~
Order dated 11.11.2005 by the BL & LRO, Sarenga, Dist- Bankura in a case under section 50(6) of the W.B.L.R Act for updation of Khatian – ” In terms of T.S. case no 76/1989 by Ld. Civil judge(Jr.div.Khatra) T.S. case no 49/1998 by Ld.civil judge (sr.div.BankuJra) and the Civil Rule no 3477/1981 by Hon’ble High Court Calcutta- In these court cases it has been held that the Mahatos are Kurmis who belong to the schedule tribe community and as such the females are not entitled to have shares in their fathers landed properties…..
            এ তো গেল ঐতিহাসিক দলিল পত্রাদির তথ‍্য। কুড়মি জাতির জীবন-যাপন, ভাষা (ভাখি)সংস্কৃতি (নেগাচার),ধর্ম ই বা কতটা অন‍্যান‍্য আদিবাসী সংস্কৃতির কাছাকাছি বা স্বতন্ত্র?
ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে পরিস্কার করে তার ‘ বঙ্গ সংস্কৃতিতে প্রাক্-বৈদিক প্রভাব’  বইয়ে লিখছেন ~ ”সেদায় মিৎ হড়ে বার্ এরালেনা । আদ বুড়কি হপন বার্ হড়, ছুটকি হপন দে মঁড়ে হড়। বুড়কি হপনগে কুঁড়বি আর মুণ্ডা, আর ছুটকি হপনগে ১) হড় ২) মাহালে ৩) কড়া ৪) দেশওয়ালী ৫) বিরহড়।”
অর্থাৎ~
“পুরাকালে এক ব‍্যক্তির দুই স্ত্রী ছিল।  বড় বৌয়ের যে দুই ছেলে তার মধ‍্যে একটা কুড়মি এবং মুণ্ডা……”
‘খেরওয়াল’জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি সম্পর্কে সাঁওতালী পুরাণকে মান‍্যতা দিলে এই সিদ্ধান্তে আসতে দুবার ভাবতে হয় না যে  ‘টোটেমিক- কুড়মি’ জনজাতির  সাঁওতালদের মত আদিবাসী তত্বের( কুড়মিরাও ৮১ টি টোটেম এ বিভক্ত সাঁওতালদের যেরকম টোটেম দেখা যায়)।
‘ভাষা’ সম্পর্কে যদি বলতে হয়  সেদিক থেকে কুড়মি জনজাতির ভাষা অন্যদের ভাষা থেকে আলাদা; ঠিক যেমন সাঁওতাল, হো, মুন্ডা দের আলাদা স্বতন্ত্র ভাষা আছে  । এ প্রসঙ্গে বলা যায়, যে ভাষাকে একসময় ‘সান্ধ‍্য ভাষা’ (চর্যাপদ), ‘খোট্টা’ বা ‘মানভূঞা’ ভাষা বা শহরবাসী বাবুদের কাছে ‘বাংলা’ ভাষার উপভাষা হিসাবে রাঢ় অঞ্চলের ‘রাঢ়ী ভাষা’ বলে পরিচিত তাই আসলে ‘কুড়মালি’ ‘ভাখি’ এরই নামান্তর মাত্র।অন‍্যান‍্য আদিম জনজাতির যেমন নিজস্ব ভাষা আছে – হো এর হো, মুণ্ডাদের মুণ্ডারী, খাড়িয়াদের খাড়িয়াস, সাঁওতালদের সান্তালি তেমনি কুড়মি দে্র কুড়মালি। পুরুলিয়া জেলার জমির যে শ্রেণীবিভাগ ‘টাঁইড়’, ‘বাইদ’, ‘কানালি’, ‘বহাল’ সবগুলি কুড়মালি শব্দ এবং কুড়মালি ভাষার অনন্য সম্পদ।এই ভাষা তাই বাংলা থেকে প্রকৃত অর্থেই স্বতন্ত্র এবংএই ভাষার প্রাচীনত্ব সহজেই অনুমেয়।
এই ‘কুড়মি’ জনজাতির আদি বাসস্থান সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়- বলা হয়ে থাকে কুড়ুম নদীর তীরে চম্পা নগরে যেখানে খেরোয়াল সম্প্রদায়ের হো, মুন্ডা বা সাঁওতালদেরও বাস ছিল।  বর্তমানে ছোটনাগপুর এর বিস্তৃর্ণ এলাকা, সাঁওতাল পরগণা, ঝাড়খণ্ড -বিহার ও পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর,মালদা, নদীয়া, ২৪ পরগণা,পশ্চিম দিনাজপুরে এই জনজাতির বাস এবং কৃষিকাজেই এদের মূল জীবিকা।লোকসংস্কৃতিবিদ দুলাল চৌধুরী সম্পাদিত এবং Academy of Folklore থেকে প্রকাশিত ‘ বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ’ গ্রন্থে প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছেন-” আদিবাসী সমাজে নারী পুরুষ উভয়েই সমভাবে কাজ করেন। কুড়মি আদিবাসীদের মধ্যে আবার শতকরা তিরিশ জন ক্ষেত মজুর। চাষী পর্যায়ভুক্ত আদিবাসী ব্যতিরেকে তেইশ শতাংশের মধ্যে প্রায় চোদ্দ জন চা বাগানের ও কয়লা খনির শ্রমিক এবং বনে শিকার করে ফলমূল সংগ্রহ করে অথবা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। অর্থাৎ কৃষির ন্যায় এই ক্ষত্রেও বেশিরভাগ আদিবাসী মজুর শ্রেণীর। বাকি নয় শতাংশ আদিবাসী কুটির শিল্পে, ব্যবসা বাণিজ্যে এবং চাকুরী ইত্যাদিতে যুক্ত আছেন। “
এই জনজাতির মানুষেরা একটা অতি প্রাচীন প্রবাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়~ ‘কোল- কুড়মি -কোড়া ~বেদ শাস্ত্র ছাড়া।’
যেরকমভাবে অন‍্যান‍্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাথে একসাথে পাশাপাশি বসবাসের দরুণ সাংস্কৃতিক মিল দেখা যায় তেমনি তাদের এইসব সংস্কৃতির মূল আধার ‘বেদ’ এর বাইরে। অর্থাৎ ভারতের অতি প্রাচীন জনজাতি কোল, কোড়া বা সাঁওতালদের সংস্কৃতির সাথে কুড়মিদের সংস্কৃতির এক নিবিড় যোগ রয়েছে।জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ অন্যান্য আদিবাসীদের সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক এবং অভিন্ন। জন্ম সংস্কারের নেগাচার ৯ দিনে ‘নরতা’ ২১ দিনে ‘একুইসা’ দেওয়ার রীতি-নিয়ম সাঁওতাল,ভূমিজ,শবর, হো দের সঙ্গে একই।তাছাড়া সামাজিক নেগাচার মেনে বিবাহ ও মৃত্যু তে ব্রাহ্মণ বর্জিত পুরোহিত দের কাজ করে যথাক্রমে জামাই আর ভাগ্নে। ‘আমবিহা’ মহুলবিহা’ এর মত ‘নেগাচার’ কুড়মিদের পাশাপাশি অন‍্যান‍্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ‍্যে গভীর উৎসাহে পালিত হয়। একসময় বিবাহ অনুষ্ঠানে কুড়মি দের ‘সারভার’ ডালা বহন করত আদিবাসী সাঁওতালরা।এই সব সক্রিয় অংশগ্রহণ  H.H Risley এর কথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।……….. In Manbhum and the North of Orissa it is difficult to distinguish, a kurmi from Bhumij or a santal, and the latter tribe,who are more particular about food than is commonly supposed, will eat boiled rice prepared by kurmis, and according to one tradition regard them as half breathren of their own, sprung from the same father, who begot the kurmis on the eleder and the santals on the younger of two sisters.( The Caste and Tribes of Bengal).
অন‍্যদিকে কুড়মি জাতি অন্যান্য আদিম জাতির মতোই প্রকৃতির পূজারী (Animist)। প্রকৃতির বিভিন্ন রূপকে কুড়মি রা আজও দেবতা জ্ঞানে পূজা করে থাকেন। গরাম, জাহিরা, মা ষষ্ঠী, বড়াসিনী, শিলাবতী,বড়পাহাড়,ইত‍্যাদি দেবদেবী  সূর্য , অগ্নি, জল, গাছ, পাথর, নদী, পাহাড় এরই নামান্তর। কুড়মি দের কাছে ‘বুঢ়াবাবা’ (মহাদেব) আজও সমানভাবে শ্রদ্ধার যোগ্য। ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতায় যে ধর্ম উপাসনার কথা জানা যায় কুড়মি দের ধর্ম উপাসনায় সেসব চিহ্ন আজও লেগে থাকায় প্রমাণিত হয় কুড়মি রা সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষকারী
পরবর্তী উত্তরসূরি। কুড়মিরা আদিম জনজাতিদের মত সারনা ধর্ম কেই নিজেদের ধর্ম বলে মনে করেন। যারা প্রকৃতির উপাসক।
কেবল মাত্র সংস্কার নয় আদিবাসী ‘কুড়মি- মাহাত ‘সম্প্রদায় এবং সাঁওতাল সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীগত মিল যে কত কাছাকাছি তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-
কুড়মি                                    সাঁওতাল
টিড়ুয়ার                                       টুডু
মুরমু                                            মুর্মু
হাঁসদাগিআর/ হাঁসদা।            হাঁসদা
বঁশরিয়ার                                বেসরা
কইড়আর                                কয়ড়া
হেমরমিআর।                           হেমরম
কুড়মি দের সংস্কার ও সাংস্কৃতিক ধারাটি যেমন সমৃদ্ধ তেমনি জীবন ও জীবিকাকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র জীবন ধারা- যার মূল ভিত্তি হল কৃষি। কুড়মি দের করম গীত, করমনাচ, বাঁদনা বা অহিরা গীত, বিহারগীত, টুসু , ছো নাচ, নাচনি নাচ,নাটুয়া,ঝুমুরের মধ‍্যে বেশ কয়েকটি প্রাচীন বলে গবেষণায় প্রমাণিত।
আর সেই সাথে ভাষা,সংস্কৃতি বা অন‍্যান‍্য ক্ষেত্রে সংরক্ষণ এবং সেগুলোকে জিইয়ে রাখার জন‍্য প্রসারের দাবিটা নেহাত অমূলক নয়।
সমালোচনা তবু আসেই আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সমালোচনার ভিতও টেকে না।  নিন্দুকেরা যখন এসব জানা সত্ত্বেও বলে থাকেন, যে ‘কুড়মি-মাহাত’ সম্প্রদায়ের মানুষের প্রধান ভাষা হিসাবে যে ‘কুড়মালি’ কে দেখানো  হয়ে থাকে তারা নিজেরাই বিশেষ করে নুতন প্রজন্ম ঠিকমত এই ভাষায় কথা বলতে পারে না। কথাটা বহুলাংশেই ঠিক কিন্তু একথাও সত‍্যি যে, বর্তমান সভ‍্যতা বা সংস্কৃতি অনেক বেশি পাঁচমেশালি ।তাছাড়া নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতি বা ভাষা ধরে রাখার থেকেও যা বেশি মূল‍্যবান বা অধিক প্রয়োজন তা হল  চাকুরির সংস্থান। তাই যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি সেদিকে ঝোঁকটা ততবেশি। শহুরে নাগরিক সভ‍্যতাতে যা কিছু ঘটে তাই  প্রশংশনীয়, তা উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত।এমন একটা ভাবধারা বর্তমান প্রজন্মের মধ‍্যে সঞ্চারিত।রাজ্যে সরকারি ভাষা যেহেতু বাংলা তাই অন্যান্য যেগুলোকে উপভাষা বলে ‘চালানো হয়’সেগুলোর জায়গা নেই। যদিও সেই ভাষাগুলি  উপভাষা নয় বরং স্বতন্ত্র। আসলে ক্ষমতাবানদের হাতেই ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। একথাও ঠিক আধুনিক  রাষ্ট্র কাঠামোয় উপভাষা গুলো স্বতন্ত্র ভাষা হলেও যেগুলো সংখ্যালঘুর পর্যায়ে পড়ে তাদের পরিচিতি হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রচার বিমুখ এর জন‍্য বা মেন স্ট্রীম এ দৈনন্দিন কাজ কর্মে খাতায় কলমে কাজে না লাগার জন‍্য কেবলমাত্র মৌখিক আদান প্রদানে যেকোন ভাষাই তার স্বতন্ত্রতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলে ।এ প্রসঙ্গে প্রখ‍্যাত ফরাসী লেখক গ‍্যাব্রিয়েল ট্রেড ( Gabriel Trade) এর ‘ Law of Imitation’ বা  ‘অনুকরণের নীতি’ স্মর্তব‍্য। তিনি দেখিয়েছেন – সমাজের মধ‍্যে বিরাজমান সংস্কৃতি অনুকরণের মাধ‍্যমে (imitation) ঊচ্চশ্রেণি থেকে নিচুশ্রেণিতে প্রবেশ করে এবং সেই অনুকরণ এতই বেশি নিত‍্য ঘটনা হয়ে উঠে তা ঠিক প্রাকৃতিক নিয়মের মতই সংঘটিত হয়ে থাকে। আর এই কারণেই মূলত নিচু শ্রেণি উপরের শ্রেণিকে সবসময় অনুকরণ করে।তাই সেসব ভাষাকে সংরক্ষণ করে তার লিপি নির্মাণ করে ( প্রাচীন ভাষার প্রায় কোনটির ই প্রচলিত কোন লিপি নেই পরবর্তীকালে লিপির আদল দেওয়া হয়েছে।)বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশি জরুরি । সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ‍্য।
এই নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন অব‍্যাহত। যে আন্দোলন কয়েক বছর আগে ‘পূর্বাঞ্চল কুড়মি সমাজ ‘এর ব্যানারে  আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয়েছিল পরবর্তীকালে সেটা বিভাজন হয়ে  গণ- আন্দোলনের রূপ ধারণ করে ‘আদিবাসী কুড়মি সমাজ’ এর ব্যানারে। আড়োলিত হয় পুরুলিয়া- বাঁকুড়া- ঝাড়গ্রাম। এমনকি এই রাজ্যের বাইরেও তার ঢেউ পৌঁছে। একের পর এক আন্দোলনে সফলতা অর্জন করে । শেষ পর্যন্ত  ঠিক করে দাবি আদায়ের জন্য দিল্লীর যন্তর মন্তর থেকে পার্লামেন্ট পর্যন্ত ঐতিহাসিক ‘মাহুড় ডড় আগুয়ান’ এর । এর জন্য  সমাজ দুটি রেল রিজার্ভ করে। দিল্লিতে ২১-২২ ,২০১৮ নভেম্বর দুদিন অবস্থান করে ‘ছোটনাগপুর টোটেমিক কুড়মি সমাজ’ এর ব্যানারে। যেখানে কেবল এই রাজ্য থেজেই নয় আসাম, ওড়িশা,  ঝাড়খন্ড থেকেও কুড়মি সম্প্রদায়ের মানুষেরা জড়ো হয়।  যুব সম্প্রদায় এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর আর রাজ‍্যসরকারের  ‘কুড়মালি’ভাষার  স্বীকৃতি(২০১৮ এর মার্চ মাসের প্রথমেই রাজবংশী ভাষার সাথে কুড়মালি ভাষাকেও স্বীকৃতি দেয় রাজ্য ভাষা হিসেবে) যা কুড়মি সম্প্রদায়ের আদিবাসীত্ব প্রমাণের একটা জোরালো শংসাপত্র হাজির করে। কুড়মি ঊন্নয়ন  এর জন‍্য ‘ কুড়মি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করে। আদিম সংস্কৃতিতে যে আলাদা একটা স্বতন্ত্রতার মাদকতা আছে তা টিকিয়ে রাখা দরকার।
তাই যখন অনেকের মনে হতেই পারে , নতুন করে ‘কুড়মালি’ভাষাকে আর স্বীকৃতি দেওয়ার তাৎপর্যটা কোথায়?? এখানে স্মর্তব‍্য- ইউনেস্কো এর একটি রিপোর্ট বলছে শুধুমাত্র ভারতেই ১৯১ টি ভাষা আজকে হয় ‘এনডেঞ্জারড্(Endangered) বা ‘ভালনার বল(vulnerable) এর তালিকাভুক্ত। ২১ শে ফেব্রুয়ারী আসার সাথে সাথেই যেমন আপামর বাঙালি ‘বাংলা’ ভাষা সংকটের জন‍্য আঁতকে উঠে। ব‍্যাপারটা ঠিক সেরকমই। প্রতিটি ভাষার সংরক্ষণ দরকার। না হলে ধীরে ধীরে ভাষার সাথে সেইসব সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিও তলানিতে ঠেকবে আর তাদের খুঁজে পাওয়া একদিন দুর্বিসহ হবে।
যাইহোক, সরকারের দায়বদ্ধতা কতটা তা সময় বলবে। সেটা রাজ্যেরই হোক বা কেন্দ্রের। তবে কোন একটা ভাষাকে’ রাজ‍্য ভাষা’ স্বীকৃতি দেওয়া মানে শুধু হাত গুটিয়ে আর বসে থাকা নয়। তার প্রয়োগের জন‍্য সুযোগ তৈরি করাটা জরুরি।  ঠিক যেরকমভাবে রাজ‍্য সরকার ‘কুড়মি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন’ করে তাদের উন্নয়নের কথা বলে তেমনি তাদের সংস্কৃতি, ভাষা, তাদের বঞ্চনা থেকে উত্তরণের জন‍্য লোকসভায় বিল ঊথ্থাপন করে সরকারি শীলমোহরটাও একান্তভাবে আবশ‍্যিক।
আশা রাখি কেন্দ্রীয় সরকার নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত একটা উপজাতির উপর সহমর্মিতা দেখাবে এবং আগামীদিনে কুড়মালি ‘ভাখি’ ‘নেগাচার’ এবং সেইসাথে সরকারী স্বীকৃতিতে আবার পুনরায় তাদের আদিবাসী উপজাতির তালিকাভুক্ত করবে এবং কুড়মি জাতির দীর্ঘদিনের শাপমোচন ঘটবে এবং আবার তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে । কুড়মিদের বিশ্বাস শেষমেশ সংসদে এইভাবেই একদিন বঞ্চনার বিল ঊথ্থাপিত হয়ে পাশ হবে আর অবহেলিত দিকটা ভারতবাসীর কাছে তুলে ধরবেন ঠিক যেভাবে মাননীয়া উমা সরেন তুলে ধরেছিলেন জেনেভায় বিশ্ব মাঝারে।
তথ্যসূত্র ঃ-
১.কুড়মি জাতির নৃ-তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক পরিচিতি ( স্মারক লিপি :২০১৫)
২. Untouchabilty,the Dead Cow and the Brahmin. ( B.R. Ambedkar)

Leave a Reply