সংবিধান, সংরক্ষণ ও অন্যান্য

Recent

~ নিকিতা পায়রা

বিভাগ – ক
মাপ করবেন, এই লেখায় অনেক ইংরেজি শব্দ ব্যবহার হবে। সংবিধান থেকে হুবহু শব্দ না লিখলে, তার অনুবাদের ব্যাখ্যা সঠিক হবে কিনা, ঝুঁকি নিচ্ছি না। সংরক্ষণ কেন, যে কোন কিছু, আমার আপনার কথা শুনে হবে না। সংবিধানে কী লেখা আছে, সেটাই ধরা হবে। এবং সংবিধানের ব্যাখ্যাকার হল সর্বোচ্চ আদালত।
সংরক্ষণ কেন দেওয়া হয়? সংবিধানের ১৬ নম্বর ধারায় আলোচনা করা হয়েছে – Equality of opportunity in matters of public employment. অর্থাৎ, সরকারি চাকুরীর জন্য “equality of opportunity” রাখতে হবে। এটা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। দেশের সব নাগরিক এক অবস্থা থেকে শুরু করে না। তাই, সবার জন্য একই ব্যবস্থা থাকা সম্ভব না। এজন্য equality of opportunity দিতে হবে। এবার এই মৌলিক অধিকার পূরণ কিভাবে করা হবে, সেটা সংবিধান বানানোর সময় ‘ঠিকঠাক’ খেয়াল রাখা হয়নি। পূরণ করার সময়, সেটা লেখা হল ৪৬ নং ধারায়। সেখানে বলা হল – “The State shall promote with special care the educational and economic interests of the weaker sections of the people”. অর্থাৎ, রাষ্ট্র দুর্বলদের জন্য বিশেষ যত্ন (সংরক্ষণ বলা যায়) নিতে পারে। এখান থেকে সংরক্ষণ দেবার কথা শুরু হয়।
‘ঠিকঠাক’ খেয়াল না রাখার জন্য অসুবিধা হবার ছিল। এবং কিছুদিনের মধ্যেই হল। ডাক্তারি পড়তে না পেয়ে, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আদালতে হাজির হন, চম্পকাই দরাইরাজন নামে এক পড়ুয়া। কারণ, আসন খালি থাকলেও পড়ার সুযোগ মিলছিল না। যেহেতু আসন গুলো সংরক্ষিত ছিল। ফল যা হবার তাই । ৪৬ নং ধারা হল বিচার অযোগ্য, কিন্তু ১৫ নং ধারা মৌলিক অধিকার। তাই স্বাভাবিক ভাবেই, সর্বোচ্চ আদালত সংরক্ষণ কে অবৈধ ঘোষণা করল ১৯৫১ সালে।
মাথা চুলকানি শুরু হল। কারণ, ১৬ নং ধারা অনুযায়ী, Equality of Opportunity দিতে হবে, Equality নয়। তাই সংবিধান সংশোধন করা হল। ১৫নং ধারায় জুড়ে দেওয়া হল ৪নং উপধারা। বলা হল – Nothing in this article or in clause ( 2 ) of Article 29 shall prevent the State from making any special provision. অর্থাৎ, রাষ্ট্র কাউকে সংরক্ষণ দিতে চাইলে, আইন আটকাতে পারবে না। এখানে প্যাঁচ জুড়ে নেওয়া আছে। কোথাও বলা হচ্ছে না যে, সংরক্ষণ দিতে হবে। বলা হয়েছে, রাষ্ট্র সংরক্ষণ দিলে, কোনোভাবেই আটকানো যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যদি না দেয়? এই প্রশ্নের কারণেই, সংরক্ষণ মৌলিক অধিকার নয়।
আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, অনেক ST WBCS (Exe) হয়ে থাকেন। কিন্তু, এদেরকে জেলাশাসক করার নিদর্শন বিরল। সংরক্ষণ মৌলিক অধিকার নয় বলেই ৩৩৫ নং ধারায় লেখা আছে – “shall be taken into consideration, consistently with the maintenance of efficiency of administration”. মানে সরকার মনে করলে (আসলে সবসময় মনে করে) প্রশাসনিক কাজকর্ম ঠিক রাখতে, সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

বিভাগ খ
বঞ্চিত কারা হয়? পিছিয়ে থাকা জনজাতির লোকেরা। মাথায় রাখবেন ৪৬ নং ধারায় (যা বিচার অযোগ্য) “weaker section” বলা হলেই, মৌলিক অধিকারে ১৫(৪) ধারায় “any socially and educationally backward classes of citizens ” বলা হয়েছে। বিখ্যাত ইন্দিরা সাহানি মামলায় আদালত জানিয়ে দিয়েছে, সংরক্ষণ দেওয়া হয়, জাতির ভিত্তিতে, আয়ের ভিত্তিতে নয়। এখান থেকেই শুরু হয়েছে আরেক বিতর্ক – সংরক্ষণ হঠাও। টিনা দাবির ছবি দেখিয়ে বলা হয়, এই মহিলা কেন সংরক্ষণ পাবেন?
বেশি দূরের গল্প বাদ দিই, ছোটনাগপুরের ভাবি। আজ ৭০ বছর ধরে ভুমিজ ও সাঁওতাল জাতি ST এবং বাউরি জাতি SC সংরক্ষণ সুবিধা পেয়ে আসছে। এরপর ভাবুন তো, এই তিন জাতির চেয়ে কুড়মি জাতি শিক্ষায় বা আর্থিক অবস্থায় এগিয়ে আছে কিনা? কানা না হলে বলবেন, কুড়মি জাতি এগিয়ে আছে। কেন ওই তিন জাতি সংরক্ষণ পেয়েও পিছিয়ে? তার কারণ, ওই টিনা দাবির মতো লোকেরা। তারা বাকিদের থেকে এতটাই এগিয়ে যে, সহজাতির লোকেদের এগোতে দেয় না। একজন ডাক্তার বা অধ্যাপকের ছেলের সাথে একজন শ্রমিকের ছেলে প্রতিযোগিতায় পারবে না। এখানেই সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা। সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছে, টিনা দাবির মতো মুষ্টিমেয় কিছু লোক। এদের কারণেই, এখনো অব্দি দেশের পিছিয়ে পড়া জনজাতির বেশিরভাগ অংশ এখনো পিছিয়েই আছে।
এটা কোনোভাবেই Equal opportunity দিচ্ছে না। তাই এটা বন্ধ করা দরকার। যদিও, আইনসভার বর্তমান অবস্থা দেখে, সে ভরসা হয় না। OBC Creamy layer, তুলে বার্ষিক আটলাখ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মাসিক ষাট হাজার টাকা রোজগার করা এক পরিবারের সাথে বার্ষিক ষাট হাজার রোজগার করা পরিবারের অসম লড়াই হচ্ছে। দিনের শেষে সংরক্ষণের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। সেজন্য ভরসা হয় না যে, সব জায়গায় creamy layer আনা হবে। Creamy layer না থাকলে, কোনোভাবেই Equality of Opportunity আসবে না।

বিভাগ গ
সংরক্ষণ দেওয়া উচিৎ কি নয়? অবশ্যই উচিৎ। হালের একটা গরু দুর্বল হলে, জমি চাষ করা হয় না। দেশের একটা অংশ পিছনে পড়ে থাকলে দেশ উন্নত হয় না। ২০১১ সালের আর্থ-সামাজিক রিপোর্ট পাল্টে দেখুন না, কে পিছিয়ে আছে। দোতলা বাড়ির মালিকও আমাদের দেশে BPLএ থাকেন। সেটা নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ জটিল। সবাইকে সমান সুযোগ করে দেবার জন্যই সংরক্ষণ প্রয়োজন। যদিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে একবারও মনে হয় না, সবাইকে সুযোগ দেবার কথা ভাবা হচ্ছে। কর্পোরেট পুঁজির দাসত্ব করতে গেলে, তাদের জন্য সস্তার শ্রমিক তৈরি করতে হবে। কে হবে সেই শ্রমিক? পিছিয়ে রাখা হোক দেশের একশ্রেণীর লোককে। তারাই সস্তার ‘পরিযায়ী’ শ্রমিক হয়ে রাস্তায় প্রাণ দেবে। আর যারা এগিয়ে থাকবে, তারা লকডাউনের প্রয়োজনীয়তা বোঝাবে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সংরক্ষণ নেই বলেই, হাজার প্রতিবাদের পরেও নেপটিজম রয়ে গেছে সিনেমা শিল্পে। রাজকুমার রাও, আয়ুষ্মান খুরানা, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর মতো প্রতিভাবান অভিনেতারা জায়গা পান না। সংরক্ষণ না থাকলে, এটা সমাজের সর্বক্ষেত্রে হবে।

Leave a Reply