আমার ছাতা দেখা

Language & Tradition, Our Voice

নির্মল হালদার: ছাতা পরব, আমাদের মানভূম অঞ্চলে মাহাত-কুড়মি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের কৃষিনির্ভর উৎসব।
বৃষ্টি বন্দনার উৎসব।

বৃষ্টির জন্যে ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করার এই একটি দিন, ভাদ্র সংক্রান্তি।
এই উৎসবকে ঘিরে মানভূমের জনজাতি সম্প্রদায় নাচগানের খুশিতে মেতে ওঠে।
এবং এই উৎসব কে জড়িয়ে আদিবাসী সম্প্রদায় মুক্ত এক পরিসরে যুবক-যুবতীরা নিজেদের সঙ্গী নির্বাচন করে।

এক কথায়, স্বয়ম্বর সভা।

এই ভাদ্র সংক্রান্তির দিন, শাল গাছের কাঠকে পুজো করা হয়। পুজোর পরে, এই কাঠ কে পুঁতে দেওয়া হয় মাটিতে।
কাঠের মাথায় বাঁধা হয় একটি ছাতা। অর্থাৎ, ইন্দ্রের ধ্বজা।

যাকে বলা হয়ে থাকে ইন্দ্র ধ্বজ। ছাতাটি তারই প্রতীক।

একসময় মানভূম ছিল পঞ্চকোট রাজার অধীনে। তারা, আদিবাসী বা জনজাতির নানান পালা-পার্বণে ঢুকে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, ক্ষমতা দখল করাই ছিল লক্ষ্য।
তাই, রাজাদের বংশানুক্রমে কেউ একজন ছাতা উত্তোলন করতেন।
রাজাদের আমল থেকে এই প্রচলন হয়ে আসছে এখনো।

আসলে এই ছাতা পরব মূলত মানভূমের জনজাতির পরব।

পুরুলিয়ার যে অঞ্চলে ছাতা পরব হয়ে থাকে, আমি গেছি।
দেখেছি, ঝাড়খন্ড বিহার উড়িষ্যা থেকেও আদিবাসীরা এসে মিলিত হয়। একসঙ্গে আনন্দ করে সবাই।
এই মেলাতে আদিবাসীদের তৈরি ঢোল ধামসা বিক্রি হয়ে থাকে। বাঁশি বিক্রি হয়ে থাকে।
ঝাঁটা ঝুড়ি ও পাওয়া যায়।

এখানে ইন্দ্র ধ্বজ নিয়ে একটু কথা বলতেই হয়, এক সময় গ্রামে যখন পুকুর খনন করা হতো, তখন ইন্দ্রের পুজো করে পুকুরের মধ্যিখানে পুঁতে দেওয়া হতো একটি রুই কাঠ।
যাকে মানুষ বলতো, ইঁদ কাঠ।
কারণটা হলো এই, ইন্দ্রদেব জলকে রক্ষা করবেন। বিশুদ্ধ করবেন। এবং এই জলে দেব দেবীর পুজো করা হবে।
ইঁদকাঠ থেকেই আমাদের পুরুলিয়া বাঁকুড়ায় অনেক জনবসতির নামকরণ হয়েছে, ইঁদকুড়ি।

পুরুলিয়া জেলার মানবাজারের কাছে, ইঁদকুড়ি আছে। বাঁকুড়ার খাতড়ার কাছেও আছে।

পুরুলিয়ার কোন একটি গ্রামে ইঁদ পরব নামেও একটি উৎসব হয়ে থাকে।
জেনেছি।

আষাঢ় শ্রাবণের পর ভাদ্রের রোদে, অসহ্য রোদে মাঠে ঘাটে ফসলের ক্ষেতে বৃষ্টির জল শুকিয়ে যায়। রোয়া ধানের চারা মরে যেতে থাকে। দরকার হয় বৃষ্টির।

শুরু হয় বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা।

প্রার্থনার বিশেষ দিনটি হয়ে ওঠে ভাদ্রের শেষ দিন।
অর্থাৎ আজ।

এই দিনটিকে ঘিরেই, আজ পুরুলিয়ার ছাতা টাঁড়ের মেলায় অসংখ্য মানুষের সমাগম।
যা বছরের পর বছর হয়ে আসছে। মানুষ শুধু জানে না, এই পরবের মূল গল্পটি।

আমি এখানে সংক্ষিপ্ত করেই জানালাম। আরো অনেকে আছেন, তারা হয়তো বা এখানে এই তথ্যের চেয়েও বেশি কিছু জানেন। যদি জানেন তারা, তাদের কাছে আমি জানতে আগ্রহী।

অপেক্ষায় রইলাম।

—- ৩২ ভাদ্র ১৪২৬—-১৮—৯—১৯

Leave a Reply