আমার ফুটানি ছাতা পরব

Language & Tradition, Our Voice

সাধন মাহাত: কথায় আছে ‘চাকলত‌ইড়ের ছাতা (যুবতি) আর অযোধ্যার শিকার যে (যুবক) দেখেনি বা যায়নি সে এখনো মায়ের গর্ভেই আছে।’
নিছক আনুগত্য নয়। ভালবাসাও। যেখানে শুধুমাত্র চাওয়া- পাওয়ায় জীবন ধর্ম নয়। জড়িয়ে আছে শত শত বৎসরের যাওয়া আসা। ভাব-ভালবাসা। সবাক পদধ্বনি। জীবনাচরন। আনন্দ-বিনোদন। আমাদের ফুটানি।

আনন্দ যৌবনের প্রতীক। জীবনের‌ও। শালপ্রাংশু শারীরিক কাঠামোর মাঝেই, নবযৌবনের ডাক। এসো হে নতুন। এসো বরাভয়। কড়া নাড়ে, অজানা রহস্য। দু’হাত তুলে ডেকে নিয়ে যায়।

আমার‌ই পদধ্বনিতে চমকে উঠে অযোধ্যা পাহাড়। ছলকে উঠে মনকে ভেজায় কাঁসাই নদীর জল। মেলায় মেলায় চোখে চোখ, হাতে হাত। আঁখি ঠারে নতুন স্বপ্ন।

শাল গাছের বিশাল কান্ডের (ডাঙ) মাথায় ছাতা। শীত গ্ৰ‌‌ীষ্মের, বর্ষা বাদলের ভরসা। হতেও পারে পারস্পরিক নির্ভরতা। যতনে রাখতে হয় ভালবাসা। সম্পর্ক। না হলে ভেঙে যেতেই বা কতক্ষন। তাই হাতে হাত রেখে শপথের‌ও দিন- পাশে থাকার, সাথে থাকার।

ছাতাটাঁড় বলুন আর অযোধ্যা পাহাড়ের শিকার উৎসব -ই বলুন এই দুটি পরবের ক্ষেত্রে যেন কোথায় একটা সাযুজ্য রয়েছে। নিজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার ক্ষমতা যেন অর্জন করে নেওয়া যায় এই দুটি পরবে উপস্থিত হতে পারলেই। তাই শুধু সাঁওতাল নয় কুড়মি সহ বিভিন্ন আদিবাসী অআদিবাসী সমস্ত মানুষজনের মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে ছাতা মেলা। তবে অযোধ্যা শিকার উৎসবে নারীদের প্রবেশ নিষেধ । সেটার অবশ্য সঙ্গত কারণ রয়েছে, কেননা এই শিকার উৎসব মানে‌ই একটা অন্যরকম ব্যাপার। বীরত্বের প্রকাশ। অস্ত্রের ঝনঝনানি। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে নারীদের অবস্থান অসুবিধার কারণ হতেই পারে। তাই নারীদের বেলায় ছাতা মেলা। কথিত আছে বা একটা প্রচলিত ধারণা এই ছাতা মেলাতেই যুবক-যুবতীরা নিজেদের জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী বেছে নেয়। তাই আদিবাসী মানুষজনের কাছে এই মেলাটির গুরুত্ব অন্যরকম। অবশ্য সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মেলার চরিত্রের বদল ঘটেছে। তবে যাই ঘটে থাকুক এখনো পর্যন্ত ছাতা মেলা আদিবাসীদের কাছে তীর্থক্ষেত্র স্বরূপ। তাই শুধুমাত্র পুরুলিয়া বাঁকুড়া মেদনিপুর নই, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয় সুদূর ওড়িশা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী আদিবাসী মানুষজন বছরে জীবনে একবারের জন্য হলেও চাকলতোড়-এর ছাতা মেলায় উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করেন। একইভাবে অযোধ্যার শিকার পরবকে ঘিরেও এই ধরনের উন্মাদনা দেখা যায় যুবকদের মধ্যে। অবশ্য যারা দীর্ঘদিন ধরে এই উৎসব আসছেন উপভোগ করছেন তাদের কাছে উৎসবগুলির গুরুত্ব অন্যরকম। তারাও চান উৎসবগুলি টিকে থাকুক। আদিবাসী মানুষদের মধ্যে ভাবনার আদান-প্রদান ঘটুক। নতুন নতুন সম্পর্কের বীজ বপন হোক। তাতে বন্ধন দৃঢ় হবে। এটাই এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীর নিরিখেও কাম্য হওয়া উচিত। যেটা আদিবাসী মানুষজনদের মধ্যে এই চিরকালই বিদ্যমান। প্রকৃতির সাহচর্যে থাকতে থাকতে তারাও শিখে গেছেন কিভাবে সবাইকে নিয়ে বাঁচতে হয়।

বিশাল ছোটনাগপুর এলাকাজুড়ে বিশেষ করে বৃহত্তর মানভূমজুড়ে ভাদ্র মাসে যে দুটি প্রধান পরব অনুষ্ঠিত হয়, সেই দুটি হল ইঁদ পরব আর ছাতা পরব। তবে এই দুটি পরবের ঠিক আগে আগেই একটি আদিম আচার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে সারা ছোটনাগপুর এলাকা জুড়ে। সেটা হল করম পরব। করম পরবের উদযাপনের দিন ইঁদ পরব এবং ভাদ্র সংক্রান্তিতে ছাতা পরবের মেলা বসে। এই দুটি পরবেই ছাতা সহযোগে ডাঙ উঠানো হয়। সেই ডাঙের একেবারে অগ্রভাগে থাকে একটা ছাতার আকারের কাঠামো। পুরো ছাতা সহ এটিকে উঠানো হলো ছাতা উঠা অথবা ইঁদ উঠা।তাই এই দুটি পরবকে এক বলেই মনে হয়। শুধু মাত্র দিনটা আলাদা। কেননা এই দুটি পরবেই জাওয়ার (নতুন শষ্য গাছ) নব শষ্য গাছ উৎসর্গ করা হয় ছাতা ডাঙ বা ইঁদ ডাঙে- কে অথবা পূজার নৈবেদ্য হিসাবে দেওয়া হয়। এইসব জাওয়ার নতুন শষ্যে চারাগুলোকে নৈবেদ্য দেওয়ার মধ্যেও যেন এখানে নিজেদেরকে সমর্পণ একটা ব্যপার রয়েছে। এছাড়াও ডাঙ হিসেবে শাল গাছের কান্ডকে বেছে নেওয়া। আদিবাসী সংস্কৃতির ইঙ্গিত। আদিবাসীদের বিভিন্ন দেবতার থানে শাল গাছ দেখা যায়। শাল গাছ আদিবাসীদের আরাধ্য। শাল গাছের কান্ড দিয়েই ছাতা কে উপরে মেলে ধরা হয়। যে ছাতার নিচে জড়ো হন হাজার হাজার আদিবাসী অআদিবাসী মানুষজন। তারাও এই ছাতা ডাঙকে, ইঁদ ডাঙকে প্রণাম করে করে, তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এই দুটি পরবের দিকে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ইঁদ ডাঙ অথবা ছাতা ডাঙ উঠানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকেন। ঐতিহাসিক সময়ে স্থানীয় ভূস্বামী অথবা জমিদাররা এই কাজটি করতেন। এখনো বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় প্রাচীন রাজপরিবারের কোন বংশধর‌ অথবা স্থানীয় ভূস্বামী গোছের কেউ ছাতা ডাঙ বা ইঁদ ডাঙ উঠানোর অধিকারী। এক্ষেত্রে মনে হয় স্থানীয় জমিদার বা ভূস্বামীরা এই দিনটিতে তাঁদের প্রজাদের ভালো মন্দের দায়িত্বভার গ্রহণ করতেন। প্রতীকী ছাতা উঠানোর মধ্য দিয়েও এই ইঙ্গিতেই খুঁজে পাওয়া যায়। আর চাষবাস হয়ে যাওয়ার পর মানুষ অখন্ড অবসরের মধ্যে আলাপ আলোচনার পরিবেশ‌ও থাকে। এই উপলক্ষেই সবাইকে একত্রিত করা। দিনটিতে সবাই স্থানীয় মেলা গুলিতে উপস্থিত হয়ে রাজার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। স্থানীয় ভূস্বামীরাও এই দিনটিতে দায়িত্বভার গ্রহণ করতেন তার এলার মানুষজনের সুখ ও সমৃদ্ধির। খরা মরা বন্যা ছাড়াও বিভিন্ন রকম সমস্যা থেকে উদ্ধারের পথ‌ও খুঁজতেন। অবশ্য এতদিনে সেই প্রাচীন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া মুশকিল

তবে এইসব ইতিহাসের কচকচানি বাদ দিলেও যেটুকু অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় সেটাই বা কম কিসে। রাজা এবং তাঁর অধিনস্ত সমস্ত মানুষজনের মধ্যে মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠা। এই সব মেলায় সাধারন মানুষজন হাজির হ‌তেন। এই উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠানগুলি মেলার আকার ধারণ করতো। যেমন বরাবাজারের ইঁদ চাকলতোড়-এর ছাতা। এই সব মেলা জনে জনে মুখে মুখে প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছে। এই সব জায়গায় প্রাচীন ভূস্বামীদের বংশধরেরা এখনো রয়েছেন। এলাকাগুলি সাধারণত আদিবাসী অধ্যুষিত। বিশেষ করে কুড়মি এবং সাঁওতালদের আধিক্য রয়েছে। তারাই এই মেলা গুলোতে এখনো ভিড় করে।

সময়ের সাথে সাথে জীবন জীবিকার চাপে মানুষের ঘটেছে পরিযান। সারা ছোটনাগপুর অঞ্চল জুড়ে আদিবাসীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে এখনো চাকলতোড়ের ছাতা মেলায় আসাটা তীর্থক্ষেত্রে আসার মত। তাই দেখা যায় এই দিনটিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে সুদূর উড়িষ্যা থেকে শুরু করে সারা পশ্চিমবঙ্গ ঝাড়খন্ড ছত্রিশগড় থেকেও আদিবাসী মানুষজন তাদের পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এই দিনটিতে চাকলতোড়ের ছাতা মেলায় কাতারে কাতারে এসে হাজির হন। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। অনেক সময় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্পর্ক আরো মজবুত এবং সুদৃড় হয়। নানা কারণে বিভিন্ন প্রান্তে তারা বসবাস করতে বাধ্য হলেও তারা যে মনে-প্রাণে সভ্যতা-সংস্কৃতিতে এক এবং অভিন্ন। খুঁজে পাই পিতৃ পুরুষকে। হারিয়ে যাওয়া মাটিকে। যার টানেই বার বার ফিরে আসা। নাড়ির টান বিচ্ছিন্ন হ‌ওয়ার নয়।

Leave a Reply