আদিবাসীদের উপর আঘাত, প্রকৃতির সর্বনাশ

Recent

মৃন্ময় মাহাতো : কেমন আছো প্রকৃতি??

                                                           “শাল কাঁদে পিয়াল কাঁদে কাঁদে মহুলবন

                                                             অযোধ্যা পাহাড়ে বসে কাঁদে হামার মন”

                                                         — সুনীল মাহাত

 

যখনই শুনি আদিবাসীদের উপর অত্যাচার,নিপীড়ন,খুন, ধর্ষন,জ্বালাও -পোড়াও তখনই শুনি রাস্তায় এই কাহিনী ঐ কাহিনী। আদিবাসীদের কান্না কানে আসতে না আসতেই শেষ হয়ে যায়।ঘটনা গুলো কেমন জানি আড়াল হয়ে যায়। এটা সরকারের কোনো চাল নয় তো? আদিবাসীদের ধ্বংস করার জন্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে সবকিছু আড়াল করতে চাচ্ছে না তো? নানান প্রশ্ন মনের মাঝে উঁকি দিয়ে যায়।

 

ঘটনা-১  পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গলের জমিতে অধিকার চেয়ে ৯৫,৯৫৮টি আদিবাসী পরিবার ও ৩৬,০০৪টি বনবাসী পরিবার আবেদন করেছিল। তার মধ্যে আদিবাসীদের ৫০,২৮৮টি আবেদন এবং বনবাসীদের ৩৫,৮৫৬টি আবেদন খারিজ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়, কর্নাটক সহ দেশের ১৬টি রাজ্যের আদিবাসী ও বনবাসী পরিবারের উচ্ছেদ হওয়ার এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

            সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অরুণ মিশ্রর বেঞ্চ গত ১৩ই ফেব্রুয়ারির শুনানিতে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১৬টি রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে, ২৭শে জুলাইয়ের মধ্যে পাট্টার আবেদন খারিজ হওয়া পরিবারগুলিকে উৎখাত করতে হবে’। দেশের ১৬টি রাজ্যে ১১লক্ষ ২৭হাজার ৪৪৬ আদিবাসী ও বনবাসী পরিবারকে উৎখাত করা হবে। সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।

 

ঘটনা-২ পুরুলিয়ার মুক্ত প্রকৃতির কোলে অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র সবুজে ঘেরা তিলাবনী পাহাড়। শিশু মনের কল্পনায় যেন চাঁদের পাহাড়ের মত চোখজোড়ানো সুন্দর। কিন্তু হায় পাথর মাফিয়াদের দাপটে আস্ত একটা পাহাড় চুরি হতে যাচ্ছে। পাহাড়ের বউ গুঁয়াই নদী রেগে ফুঁসছে। অত্যন্ত প্রিয় ও পরিচিত তিলাবনী পাহাড় মানুষের লোভের মাশুল দিতে গিয়ে আজ ধ্বংসের মুখে। গ্রানাইট পাথর কাটার জন্য বেরোর একের পর এক পাহাড় আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, অদূর ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলের একটা পাহাড়’ও যে আর বেঁচে থাকবেনা, সেটা খুব সহজেই আন্দাজ করে নেওয়া যায়। বেরোয় যখন পাথর মাফিয়া’দের চোখ পড়ে, পুরুলিয়ার অন্যান্য পাহাড় যে আর অক্ষত থাকবেনা, সেটা তো বলাই বাহুল্য। মনে মনে ভাবছিলাম’ই, কবে তিলাবনীর খবরটা পাবো। খুব একটা বেশীদিন অপেক্ষা করতে হলোনা… কিন্তু যে আশঙ্কা মনের মধ্যে ছিল, সেটা যে এতো তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত হবে, তা ভাবতেও পারিনি। এবং সমস্তটাই হচ্ছে প্রশাসনের চোখের সামনেই, যেটা আরো দুঃখের। গ্রামের মানুষজন প্রতিবাদ হয়তো করছেন, কিন্তু সেটা করে যে কিছু লাভ হবেনা, সেটাও হয়তো তাঁরা বুঝতেই পারছেন। গায়ের এবং অর্থের জোরে তাঁরা যে পেরে উঠবেন না, সেটা তো জানা কথা।

         অরণ্যের অধিকারে ভারতে নয়া আইন উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ- ১৮৭১ সাল৷ ব্রিটিশ শাসকেরা জারি করল একটি আদেশ, যার ফলে মধ্য ও পূর্ব-মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ জঙ্গল মহলে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেল ভূমিপুত্রদের৷ হাজার হাজার বছর ধরে যে জঙ্গলের ওপর ভরসা করে জীবনযাপন করতেন আদিবাসীরা, সেই অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল৷

         আসলে ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে হাজার হাজার মাইল জুড়ে থাকা অরণ্য প্রান্তর হয়ে উঠতে পারে রাজেস্বর এক বড় উৎস। তাই ভূমিপুত্রদের ওপর অরণ্যে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা জারি করে জঙ্গল মহলের ইজারা তুলে দেওয়া হতে থাকল ঠিকাদার আর জমিদারদের হাতে, যাদের আদিবাসীরা এখনও দিকু বলে থাকে ৷ কিন্তু নিজেদের জীবনধারণের মূল সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া মেনে নিতে পারে নি আদিবাসী সম্প্রদায়৷ ১৮৯৫ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে শুরু হল ‘উলগুলান‘ অথবা উপজাতি বিদ্রোহ ৷ বীর বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে জঙ্গল মহলের দিকে দিকে বেজে উঠেছিল ধামসা আর মাদল৷ শুরু হয়েছিল যুদ্ধ৷ যুদ্ধ শেষে সাময়িক শান্তি এলেও পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দিকুদের দৌরাত্ম্য।

       আইন হয়েছে, আইনের রক্ষকেরা এসেছেন কিন্তু তারই ফাঁক দিয়ে, সমান তালে চলেছে বৃক্ষ নিধন এবং বন্যপ্রাণী শিকার৷ অন্যদিকে আদিবাসীদের সরানো যায়নি তাঁদের পিতৃভূমি থেকে৷ আইনের চোখে বেআইনি হলেও তাঁরা জঙ্গলে বাস করেছেন, বনরক্ষকদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কাঠ, পাতা কুড়িয়ে বেঁচে রয়েছেন ৷ এটা যে বাস্তব, অতি সম্প্রতি তা স্বীকার করেছে ভারতের সরকার।

    তবে উচ্ছেদের মুলে জমির মাফিয়া, কাঠ মাফিয়া, পাথর মাফিয়া, রাজনীতিবিদের এর পেছনে স্বার্থ রয়েছে৷ যখন থেকে দেশের সুপ্রীম কোর্ট বনাঞ্চলের জমি ছাড়া চলবে না বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই এই দুটি আইন শেষ করার চক্রান্ত চলছে৷”

      ২০১৯ সালে নির্বাচন। দুই কোটির উপরে নতুন ভোটার। তরুণ সবাই। শিক্ষিত, আধুনিক নিউ ইয়ার, ভ্যালেন্টাইনে মেতে রয়েছে । আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! মুখে বুলি নেই, কন্ঠে প্রতিবাদ নেই, কোটার ঠ্যালায় চাকুরী নেই, বাজারের থলের চিপায় পেঁয়াজ নেই, ৭০ টাকায় চাল, বিদ্যুতের দাম হু হু করে বাড়ে, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ যায় না- মাঝে মাঝে আসে, ঠিক যেন জন্তু জানোয়ার- এদের সাহায্য দরকার নেই, পুরুলিয়ার আদিবাসী বনবাসীদের পাশে দাঁড়ানো নৈতিকতা, কান্না দেখার টাইম নাই, কথা বললেই আইনী ব্যবস্থার শিকার, কথা বললেই গুম, তরুণরাইতো ইয়ে করবে, রাজনৈতিক সমস্যা রাজনীতিবিদরা দেখবে। আধুনিকতার আমেজ নিয়ে ঘুমাতে যাই। তা, বেশ গেলো বছরটা, সামনেরটাও যাবে এভাবেই।

       পরিশেষে একটু বলি , একদিন আদিবাসীরা যাযাবর জীবন যাপন ছেড়ে জঙ্গল কেটে বসতি গড়লো। কারো মনে হলো শখে কাটছে। ক্ষুধা নিবারণের জন্য আদিবাসীরা জঙ্গলের ফল, মূল, লতা পাতা ও পশু শিকার করলো। কেউ ভাবলেন বীরত্ব প্রদর্শন করতে শিকার করছে। এই বেশি চিন্তাশীল সুধীজনেরা আবারও ভাবলেন এত জল! এত জলাশয় দিয়ে কী হবে? চলো ভরাট করে….. উঠে দাঁড়াল সিমেন্টের ঘরবাড়ি…! পরিনাম, কাঁসাই, শিলাই সুবর্ণরেখা শেষ।

      একদিন পাখিদের অত্যাধিক কোলাহল কানে আসতেই মনে হল, বিরক্তিকর। পাখি গুলো শষ্যদানা খেয়ে শেষ করছে… তাদের বিষ্ঠা ঘর দালান নোংরা করছে! পাখিদের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। চলো শেষ করি। একদিন তার প্রতিবেশি বন্ধু কুকুর বেড়ালের সংখ্যাও অনেক বেশি মনে হতে, মনে হল,চলো বড্ড বেড়েছে সংখ্যায়..মেরে দিয়ে সংখ্যা কমাই। একদিন গাছ প্রায় নেই হয়ে গেল! জঙ্গল নেই হয়ে গেল! জলাশয় নদীনালা নেই হয়ে গেল প্রায়। পশুপাখি নেই হয়ে গেল… প্রকৃতি

2 comments

  • স রকার আদিবাসিদের ভোট বাক্স ছাড়া অন্য কিছু ম নে করে না,করবেও না।আদিবাসিরা বোবা,কালা সেজে থাকলে এটাই চলবে।

Leave a Reply