ঝুমৈরের ধারক বাহক : একটি অনুসন্ধান

Folk song, Jhumur, Language & Tradition, Our Voice, Recent

~ অনুসন্ধানে সাধন মাহাত

গঠে সাজে গাই গরু খেতে সাজে ধান লো
মায়ের কলে ছেইলা সাজে যেমন লৌতন চাঁদ লো

           প্রথমেই বলে রাখি সংস্কৃতি কারো কাছে ধরম করম আর কারো কাছে নিছক বিনোদন। প্রয়োজন – জীবন জীবিকা ব্যবসা। তাই বিনোদনের প্রাথমিক শর্ত অনুযায়ি পাল্টে ফেলার একটা প্রবনতা থাকে। আর ধরম চাই সমস্ত পরিবর্তনকে সরিয়ে রেখে প্রাচীনতাকে লালন করতে। আর এটাই মনে হয় ঐতিহ্য পরম্পরা ভালবাসা। যে দায় সংস্কৃতির বাইরের লোকের নাও থাকতে পারে। তাই এই লড়াইটা চলতেই থাকবে। ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার। ব্যবসায়ীরা চাইবে আধুনিকতার মোড়ক, বাবুসংস্কৃতি। আধুনিক ড্রয়িংরুমে প্রাচীন ধরম করম পালন করা অসুবিধায় আছে, তাদের কাছে কিছুটা অসস্তির‌ও। তাই আধুনিকতার মোড়ক মুখে পুরে নিতে খুব একটা দেরি হয়নি। আর সেটাই ব্যবসায়ীদের মুলধন। ঐতিহ্য পরম্পরাকে দুরে সরিয়ে রেখে তরতর করে এগিয়ে যাওয়া। সভা সমিতির মধ্য দিয়ে নিজস্ব একটা ব্যাকরন তৈরি করা। বিনোদনের খোরাক। খায় বেশি, আধুনিকতা। তবে হজম করা দুষ্কর। তাই একসময় ছুঁড়ে ফেলতে বাধ্য। আবার প্রয়োজন হয় একটা মোড়কের। এটা চলতেই থাকে। অনেক সময় শাসকের‌ও প্রয়োজন হয় পরিবর্তন। সেখান থেকেই বিভাজন। রাজার রাজনীতি। ক্ষমতা। যার ধারে পাশে নেই সাধারন মানুষ। তবে ধরম করম চলতেই থাকে নিজের মতো করে। বাঁদনা পরবে বেজে ওঠে ঢোল নাগড়া। করমে গীত গেয়ে ওঠে আনাড়ী গলা, নেচে ওঠে ছন্দহীন পা। জানান দেয় চরাচরে, আমরা ধর্মে আছি, কর্মেও।

তাই মুল লড়াইটা হচ্ছে ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার। বিশ্বায়নের চাপে পড়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জীবন যে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেই সেটাই স্বাভাবিক। সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের মাঝেও দেশ কাল ছাড়িয়ে তাই এখনো নিজেদের অক্ষুন্ন রেখেছে কিছু কিছু প্রান্তিক সংস্কৃতি। দেশভাগ, মানুষ ভাগ করেও তাদের সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। বহাল তবিয়তে তাদের গরাম থানে বিরাজ করছে সুপ্রাচীন শাল পিয়াল, ঐতিহ্য-পরম্পরা। আছে সেই সব মানুষজন‌ও। তাদের উত্তরপুরুষ।

ছোটনাগপুরের কথায় যদি বলি। এখানেও শাসকের শাসনের সুবিধার জন্য বারবার বিভাজনের শিকার হতে হয়েছে। জাগিয়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে আলাদা দেশাত্ববোধ। সেখান থেকেই আমদানী মানভূঞ, ধলভূঞ, শিখরভূঞ, সিংভূঞ, ময়ূরভঞ্জ, কেঁওঝোর, সুন্দরগড়। এক‌ই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের মানুষকে সুকৌশলে আলাদা করে দেওয়া যাতে তারা কোনদিন‌ও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। নিজেদেরকেই লড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বারবার। বিহারের বঙ্গভূক্তি তার প্রকৃষ্ঠ প্রমান। দেশভাগ করলেই যে মানুষগুলো আলাদা হয়ে পড়বে শাসকের এই রাজনৈতিক পন্থা থেকেই বারবার বিভাজনের চেষ্ঠা। তাতে শাসক যে অনেকটাই সফল তা বোঝাই যায়। এই এলাকায় একসাথে থাকা বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতিকে বিভিন্নভাবে আক্ষায়িত করা হয়েছে। এলাকার দুটি অন্যতম গোষ্ঠী কুড়মি এবং সাঁওতালদের অস্তিত্বকে প্রায় অস্বীকার করা হয়েছে। কথায় আছে- কোল কুড়মি কড়া, বেদ বিধি ছাড়া। স্বাভাবিক ভাবেই এদের ধর্ম থেকে সংস্কৃতি কোন কিছুকেই স্বীকার করার কথাও নয়। তবে কোথাও কোথাও সাঁওতালি সংস্কৃতিকে নানাকারনে স্বীকার করা হলেও, কুড়মালি সহ অন্যান্য জনজাতি গুলির দিকে সেইভাবে নজর দেওয়া হয়নি। এরা হলো মানভূঞা, এরা হলো ধলভূঞা! ইত্যাদি ইত্যাদি।

আদতে কোন সংস্কৃতির বিভাজন কি আদৌ সম্ভব! আর কোন সংস্কৃতি তো এমনি এমনি গড়ে উঠতে পারে না। বিভিন্ন জাতি গোষ্টীর প্রয়োজন থেকেই ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য পরম্পরা গড়ে ওঠে। যা বংশ পরম্পরাই লালিত হয়। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে এই আলোচিত এলাকার সংস্কৃতি কী, এদের ধারক বাহকেই বা কারা। মানভূঞাদের না ধলভূঞাদের না শিখরভূঞাদের না ঝাড়গাঞাদের। কাদের?

         উত্তর দেওয়া খুব মুশকিল। অথবা খুব সহজ। এই এলাকার হাটে বাজারে ডাহি ডুংরিতে যোগাযোগের ভাষা থেকে শুরু করে জীবন যাপন, ধরম করম আনন্দ বিনোদন, পালা পার্বন সমস্ত ক্ষেত্রেই যে জনগোষ্ঠীর সাথে বেশী মিল পাওয়া যায় তা হলো কুড়মি। কুড়মালি যাদের মাতৃভাষা। গীত ঝুমৈর যাদের বিনোদন। বাঁদনা করম টুসু গাঁজন যাদের পালা-পার্বন। গরাম কুদরা বাঘুত যাদের ধরম। চাষাবাদেই মূল জীবিকা। এই জীবন জীবিকাকে কেন্দ্র করে পাশাপাশি সহাবস্থান করা অন্যান্য জনগোষ্ঠীগুলোর আবর্তন। কামার, কুমার, মুচি, ডোম, ঘাসি,তেলি ইত্যাদি হড়-মিতান গোষ্ঠীগুলো আনন্দ বিনোদন থেকে শুরু করে ধরম করমের সঙ্গী। ছো ঝুমৈরের রেগ -ডেগে খুব একটা ফারাক চোখে পড়ে না। যেখানে দেশ-কালে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে না। সর্বত্র‌ই প্রায় এক। যেটুকু পার্থক্য চোখে পড়ে তা মনে হয় অবস্থান এবং ব্যক্তি সত্বার কারনে। তাই আমাদের মাটির কবি ছত্রমোহন মাহাত ঝুমৈর হাঁকায় বলতে পারেন-

হাঁইকলে ঝুমৈর নাগপুরে
কুঁহরে মাদৈল কেঁওঝরে।

       ঝাড়গাঁ থেকে পুরুইলা নামকুম থেকে ময়ূরভঞ্জ কেওঝর সর্বত্র ঢোল নাগড়া মাদৈলের সুর কিন্তু এক‌ই। বুলিও এক। মানভূঞের একার বলে কিছু হয় না হবেও না। সংস্কৃতির কারবারীরা শুধু তাদের সুবিধার জন্য এই বিভাজনটুকু সযতনে আগলে রেখেছেন। যেটা আমাদের এতদ্অঞ্চলের মানুষের কাছে দগদগে ঘা স্বরূপ। যা আমাদের কাছে লজ্জার‌ও। যতদিন না এই বিভাজনটুকু আমাদের মন থেকে দূর করতে না পারছি ততদিন মুক্তিও নেই। যত‌ই আমরা বৃহত্তর মানভূমের কথা বলি না কেন আমরা চক্রান্ত থেকে কিছুতেই মুক্ত হতে পারবো না। এছাড়াও আছে কিছু ভন্ড সংস্কৃতি প্রেমী। যাদের এই সংস্কৃতির সাথে সরাসরি কোন যোগাযোগ নেই অথচ তারাই আজ দন্ডমুন্ডের কর্তা সাজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারাই প্রশ্ন করছে, কুড়মি জাতির সাথে এই ঝুমৈরের যোগ কোথায়। তাদের একটাই কথা বলি, আপনাদের এই ঝুমুর শব্দটা কিন্তু কুড়মালি শব্দ ভান্ডারের‌ই দান। আর কুড়মিদের ঝুমৈরের চাষ কিন্তু আছেই। সেখানে তারা প্রমান রাখার তাগিদ অনুভব বোধ করেনি। সেখানে আনন্দটাই মুল বিষয়। আখড়ার সূচনা সঙ্গীতটাও ঝুমৈর-

আখড়া বন্দনা করি গাঁয়ের গরাম হরি…

        না এখানেও কোন পদকর্তার নাম নেই। শুধু আছে বাজনার তালে তালে পা ফেলে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে নেচে ওঠা। কী বলেন এটাও আপনাদের‌ই করে দেওয়া। হলে হতেও পারে। যেমন আপনারা হয়তো মনে করেন ভবপ্রীতানন্দের আগে ঝুমৈর ছিল না। রাজ‌অনুগ্রহ ছাড়া ঝুমুর হয় কি করে! ধন্য আপনাদের গবেষনা, ধন্য গবেষক। এটা স্বীকার করতে মনে হয় অসুবিধা নেই ছোটনাগপুরের ভূমি হল আদিবাসীদের লীলাভূমি। সাথে হড়মিতানদের সহাবস্থান। বাকি সব উড়ে এসে জুড়ে বসা। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীটি ভাষা-সংস্কৃতিহীন হয়েই জীবন-যাপন করে আসছিল। কে জানে গবেষণা কি বলে। নাকি পন্ডিতরা খুঁজে বার করার চেষ্টা করেনি। নাকি পারেনি । বাঁশ বনে ডম কানা। বিষয়টা যে ততটা সহজ না তা দেখিয়ে দিয়েছেন মাননীয় সুহৃদ কুমার ভৌমিক, কিরীটি মাহাতর মতো গবেষকরা। কিরীটি মাহাত মহাশয় তাঁর ঝুমুর ও চর্যাপদ গ্রন্থে সমস্ত তথ্য প্রমান সহযোগে দেখিয়ে দিয়েছেন ঝুমৈর চর্যা পদের‌ও আগে জনমানসের স্বাভাবিক বিনোদন ও ধর্মাচরনের সঙ্গী ছিল। যা এখনো বংশ পরম্পরায় রয়ে গেছে ধর্মাচরণ ও বিনোদনের সঙ্গী হিসাবে। যারা কোনদিন‌ই ভাবেনি এগুলো নিয়ে নাম কামানো যায় বা ব্যবসা করা যায়। কাল ভেদে, ঋতুভেদে অথবা ধর্মাচরনের নিয়ম মেনে অথবা বিনোদনের অঙ্গ হিসাবেই স্বতস্ফূর্ত ভাবে গেয়ে উঠেছে ভাদরিয়া, ঝিঙাফুলিয়া, করম, ডহরিয়া , নাচনীশালিয়া, ডাঁইড়শালিয়া ইত্যাদি নানা সুরের নানা ধরনের ঝুমৈর। যেখানে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পদকর্তার নাম নেই। তাহলে কি এগুলোকে ঝুমুর বলা যাবে না? সত্যি গবেষকদের দৈন্যতা পীড়া দেয়। গবেষকদের গবেষনা নিয়েও সন্দেহ দানা বাঁধে। তাহলে সত্যি, গবেষকরা কোন কিছু লুকোতে চাইছেন,অহং থেকে অস্বীকার করতে চাইছেন, না শুধুই অজ্ঞতা। অবশ্য দেশজ সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার মানসিকতা আছেই । সেই কারনেই সান্ধ্য ভাষা বলে আদিবাসীদের ভাষাকে অস্বীকার করার প্রবনতাও বর্তমান।

         যাই হোক গবেষকদের কাজকে শ্রদ্ধা করতে‌ই হয়। তবে তাঁদের‌ও খেয়াল রাখতে হবে যাতে গবেষণা মানুষকে সঠিক দিশা দিতে পারে। একটা সংস্কৃতিকে শুধু দেশ কালের বেড়াজালে আবদ্ধ করা মনে হয় যুক্তি যুক্ত নয়। মানুষের জীবন যাপনকেও অনুধাবন করা দরকার। খেয়াল রাখা জরুরি সংস্কৃতি মানে শুধুই বিনোদন নয়। একটা পরিপূর্ণ জীবন-যাপন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহুর্তের আচরন পাঠ করা প্রয়োজন। যার সাথে জড়িয়ে আছে লোক বিশ্বাস, ধর্মাচরন। দেশভেদে কালভেদে কিছুটা এদিক ওদিক হলেও মুল কাঠামো কিন্তু এক‌ই থাকে। সেটা মানভূঞ হোক আর ধলভূঞাই হোক। আর ছো ঝুমৈরকে যত‌ই বাঙালিয়ানায় উন্নিত করার চেষ্টা করা হোক না কেন সেই অপচেষ্টা কোনদিন‌ই বাস্তবায়িত হবে না। যেমন দুর্গা পূজা, কালি পূজাকে অধিবাসীরা নিজেদের বলে আপন করে নিতে পারবে না তেমনই বাঁদনা করম দাঁশাই কে বাঙালিরা কোনদিন‌ই বলতে পারে না এটা আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ধরম।

যারা ডিমান্ড করছে ঝুমুর সবার, তাদের জনগোষ্ঠীর যারা জঙ্গলমহলের বাইরে থাকেন, তারা কি এরকম ঝুমুর গান করেন? হড় মিতানদের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকার জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। ইটাকে বলে সঁখা রোগ। সহাবস্থানের গুন। অথচ কুড়মিদের প্রায় প্রতিটি গাঁয়েই ঝুমুরের আখড়া (ঝুমুরের বহাল জমি) ও শিল্পী আছেন। আর কোন সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই গুনটি পরিলক্ষিত হয়কি? হয় না। চা বাগানেও ঝুমৈর, নামাল খাইটতে গেলেও ঝুমৈর।

তা কি আর করা যাবে, কথার পিঠে কথা আসে। মেঘ উঠে, বর্ষা আসে ঝেঁপে। আমাদের চাষাবাদের সময়। ফসলের চাষ, গীত ঝুমৈরের চাষ। মেঘ বৃষ্টিতেও মনে রিঝ লাগে। খলবল করে উঠে মাঠ ঘাট খেত গোঠ। আমাদের আনন্দের দিন। মনে সুর জাগে, গীত জাগে, ঝুমৈর গীত । হাল গহলের সাথে সমান তালে চলতে থাকে রপা গীত, কবি গীত। কোথাও দাঁড়াবো গিয়ে। মানভূঞ না ধলভূঞ না অন্য কোথাও। খোশামোদ ছাড়া চলে না। তাই বিভাজন বারবার। আমাদের কবির বিষাদ‌ই ভরসা…

বিহারেক মানভূম জেলা,
বিহার-বাংলায় বাঁটি লেলা
মানভূম দুখে জর-জর গো,
মানভূম কেসন সুন্দর।
(সুনীল মাহাত)

6 comments

    • সেই তো এই পোর্টাল থেকে টুকলি করে প্রবন্ধ লেখেন। বাহা খেতেও নজর দেন। যাদের নজর দেওয়া স্বভাব, তারা নজর দেবেই। সাথে কুযুক্তি সাজাবে।

    • তাহলে মানলেন ঝুমৈরটা কুড়মিদের বাপৈতা সম্পত্তি বঠে। হামদের হাতেই দলিল পরচা। জবরদখল করে বেশীদিন রাখা সম্ভব নয়। সেই রাম‌ও নেই সেই অযোধ্যাও নেই।

    • আপনার পত্রিকা লোকে কিনছে না কেনো সেদিকে ধ্যান দিন।ঝুমুইর নিয়ে আপনার মাথা ঘামালেও চলবে।

  • পরের চাষকরা জমিতে নুনছিটিয়ে প্রমোটারী করতে খুব মজা তাই না?

  • লিলজের পিছনে গাছ বেরালে বলে যে ছাইরা হইল।

Leave a Reply