পাথর চোরদের শাস্তি না দিয়ে বৈধতা দিতে আসরে হাজির সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়

Our Voice, Recent

লালন কুমার মাহাত : সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম তো শুনাহি হোগা। তিনি পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি। কিছুদিন আগেই মুরগুমার শালজঙ্গলে তদন্ত করে শাল গাছ কাটার ছাড়পত্র দিয়ে এসেছেন। তারপর বালি পাচারের ছাড়পত্র দিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাস্তায় রাস্তায়। এরপর পাথর খাদান। জেলার পুরো দায়িত্ব যে তাঁর হাতে! বাঁচাতে হবে জেলাকে! তাই কয়েকদিন আগে তিনি তামঝাম করে দেখতে গেলেন বরাবাজার ব্লকের অবৈধ পাথর খাদান। সেখানে গিয়ে ছবি তোলা হলো, প্রিন্ট মিডিয়া, ডিজিটাল মিডিয়া তে খবর হলো। চুরি তো অনেক দিন থেকেই চলছে, তাহলে হঠাৎ এতদিন পরে কেন মনে পড়লো সেরকম প্রশ্ন অবশ্য কেউ জিজ্ঞেস করার সাহস করেননি উনাকে।

এর পর নাকি পুরুলিয়ার বরাবাজারের বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অবৈধ পাথর খাদানগুলি চিহ্ণিত করার কাজ শুরু করবে প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার থেকেই উঠে পড়ে লেগেছে ভূমি ও ভূমি সংস্কার, বন দফতর ও স্থানীয় ব্লক প্রশাসন।বরাবাজারের পাথর খাদান গুলো রাস্তার ধারে না হলেও ক্রাশার গুলো রাস্তার ধারেই। সেই রাস্তা দিয়ে নেতা মন্ত্রীরাও যাওয়া আসা করেন। যাওয়া আসা করেন ব্লক প্রশাসনের অধিকারীরাও, এমনকি থানা পুলিশও। নেতা সাহেবদের কালো চশমার ফাঁক দিয়ে হয়তো ব্যাপারটা ঠিকঠাক নজরে আসেনি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসি গাড়ির দরজা বন্ধ থাকায় হয়তো দেখতেও পাননি উনারা। মহকুমাশাসক (মানবাজার) বিষ্ণুব্রত ভট্টাচার্য, অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি ও ভূমি সংস্কার) সুপ্রিয় দাস, বারোবাজার আই সি সৌগত ঘোষ , এম এল এ রাজীব লোচন সরেন – বরাবাজার পাথর চুরির খবর এতদিনে ওনাদের কারো নজরে আসেনি বোধহয়। এবারের অভিযোগটা হয়তো খুব বিস্বস্ত সূত্রে পেয়েছিলেন সভাধিপতি মহাশয় তাই – ক্রাশার মালিক ও পাথর চুরির গাড়ি গুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

শুধু কি তাই? বরাবাজারের বিভিন্ন পঞ্চায়েতে অবৈধ খাদানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর তোলা হয় অনেক দিন ধরেই। ডিনামাইট ফাটার আওয়াজ অনেক দূর অবধি পৌঁছালেও ব্লক, পুলিশ , প্রশাসন-এর কারো কানে এর আগে পৌঁছায়নি এমন ভাবেই অনেক জায়গায় পরিবেশন করা হচ্ছে পাথর চুরির খবরটা।পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় ৯ ই জুন, 2020 মঙ্গলবার পাথর খাদান চুরির হদিশ পেতে সেখানে গিয়ে দেখতে পান ডিনামাইট এর তার, ডিং করা করা বড় বড় পাথরের ঢিপি, দীর্ঘ দিন ধরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর তোলা গভীর খাদান। এসবের ছবিতে ছয়লাপ এখন সোশ্যাল মিডিয়া। অবশ্য অভিযোগ পত্রের কপি ও ছবি অনেক আগে থেকেই ছড়িয়ে ছিল সোশ্যাল মিডিয়াতে। অভিযোগ জমা পড়েছিল অনেক দিন আগে বিভিন্ন দফতরে। কিন্তু ওই আর কি পুলিশ, প্রশাসন , ভূমি আধিকারিকেরা নেতা সাহেবদের গ্রীন সিগন্যাল না পেলে হয়তো কাজ করেননা , চোর ধরেন না, পুরুলিয়ার সম্পদ রক্ষা করেননা – তাই হয়তো আর হয়ে ওঠেনি।

বরাবাজার ব্লকে নাকি বৈধ খাদান রয়েছে তিনটি। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে লিজ নেওয়া হয়েছে একটু জমি আর পাথর খাদান করা হয়েছে অনেকটা জায়গা জুড়ে, সেক্ষেত্রে প্রশাসন যদি অন্ধের মত বসে থাকে তাহলে কেই বা তার বিচার করবে। তালাডি গ্রামের লোকজনের তো প্রায় বাড়িতে তালা দেওয়ার মতো অবস্থা। জঙ্গল যে কবে পাথর খাদানে পরিণত হয়ে গেছে সেটা তারা প্রায় ভুলে যেতেই বসেছেন।ডিনামাইট এর জন্য পরিবেশ তো দূষিত হচ্ছেই, পাথর গাড়ির ওভারলোডে নষ্ট হচ্ছে গ্রামের রাস্তাও, কম্পনে ঘর বাড়িও পড়ে যেতে পারে যে কোনোদিন।

গরিব মানুষের রুজি রোজগারের বাহানা দিয়ে পাথর খাদান গুলো বন্ধ করতে চাননা সুজয় বাবু। কিন্তু অবৈধ পাথর খাদানগুলোকে বৈধ করার সরাসরি কোনো নিয়ম নেই। বৈধ করতে গেলে প্রসপেক্টিভ ব্লক এরিয়া চিহ্নিত করে বিডিং প্রসেসে যেতে হবে।সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা হবে , বিডিং করলে বর্তমানে পাথর খাদান গুলো যারা বর্তমানে চুরি করছিলো তাদের হাতেই যে যাবে তার কোনো নির্দিষ্টতা নেই।তাছাড়াও বৈধ ভাবে করলে লভ্যাংশের একটা অংশ সাধারণ মানুষদের উন্নয়নে খরচ করতে হবেই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী। কাজ শুরু করার আগে এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট করানো ও সেই মতো অনুমোদন পাওয়াটাও খুব জরুরি।

সব কিছুর মাঝে একটা জিনিস খুব অবাক করেছে সবাইকে। এতদিন ধরে যে কোটি টাকার পাথর খাদান অবৈধ ভাবে , হয়তো গোপন অনুমতি নিয়ে চলছিল সেই সব পাথর চোরেরা কি আদৌ কোনো শাস্তি পাবে— এমন কোন কথায় বলেননি সুজয় বাবু। কিছুদিন পরে এলাকার চোর ডাকাতেরা যদি বলে, চুরি ডাকাতি করে তাদের পেট চলে- তাহলে হয়তো তাদেরকে প্রটেকশন দেওয়ারও লোক বেরোবে এই দুনিয়ায়। ক্রাশারে কাজ করা মানুষগুলোর উপর, না ক্রাশার মালিকদের উপর দরদ উথলে পড়ছে সেটা জেলার মানুষ ভালো ভাবেই বোঝেন।

কাশীপুরে দারকেশ্বর নদীর বালি চুরি, পাহাড় পুর এর পাহাড় ধ্বংস , শালীডির ধ্বংস হয়ে যাওয়া শাল জঙ্গল, কাঁসাই নদীর বালি পাচার, বান্দোয়ানের ভালু গ্রামের পাথর চুরি, ব্লকে ব্লকে অবৈধ ইঁট ভাটা দিয়ে পরিবেশ দূষণ এসব পরিদর্শন করতে কবে বেরোচ্ছেন সুজয় বাবু এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Leave a Reply