বাংলা ভাষার চক্করে ১লা নভেম্বর ১৯৫৬ কপাল পুড়েছিল পুরুল্যার

Our Voice

লালন কুমার মাহাত: 

“শুন বিহারী ভাই

তরহা রাইখতে লারবি ডাঙ্গ দেখাইঞ”|

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই জানুয়ারি থেকে ৮ই ফেব্রুয়ারি এই গানকে গেয়েই  টুসু সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে তৎকালীন ‘মানভূম’ জেলাকে পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মেতে উঠেছিলেন বেশ কিছু মানুষ| কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই গানের এক দুটো শব্দ বর্তমানের প্রচলিত সাহিত্যে এদিক ওদিক হয়ে গেছে| বাংলা ভাষীরা পাল্টে দিয়েছেন তাদের রসগোল্লা খাওয়া জিভ দিয়ে| যেমন তরহা > তোরা , দেখাইঞ> দেখাই| বাংলা ভাষার ধজ্বাধারীরা এই গানটার শব্দ গুলোকে গোল গোল উচ্চারণের করতে চাইলেও ‘লারবি’ শব্দটি এখনো নিজের জায়গা বজায় রেখেছে| কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল এই সব শব্দ গুলো বাংলা ভাষা / সাহিত্যে প্রায় একেবারে ব্যবহার করা হয়না বললেই চলে| রবীন্দ্রনাথের কোনো লেখাতে ‘লারবি’ শব্দের প্রচলন দেখা যায়নি| যাঁরা বারবার উপরে উল্লিখিত দুটি টুসু  গানের  লাইন উল্লেখ করে বাংলা ভাষা আন্দোলনের মহিমাকে গৌরবান্বিত করার জন্য তাঁদের লেখায়, চিন্তায়, কথায়,  বইয়ে, পিএইচডি ডিগ্রির থিসিসে বারবার উল্লেখ করেছেন তাঁরাও তাদের লেখা বাংলা তে লারবি, ডাং ইত্যাদি শব্দ গুলো প্রায় ব্যবহার করেনই না| যে গান বাংলা ভাষার পরিধি বাড়াল, বাংলাভাষীদের আধিপত্য কায়েম রাখলো সেই গানের শব্দ গুলো বাংলা ভাষাতেই ব্রাত্য হতে পারে না| অনেকে এগুলোকে আবার ডায়ালেক্ট বলে নাক সিঁটকান – অবশ্য তাতে যদি তাঁদের মনের শান্তি মিলে তাহলে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়|

যে মানুষটি ওই গানটি লিখেছিলেন, এক মাস ধরে পায়ে হেঁটে হেঁটে ওই গান গাইতে গাইতে ঘুরে বেড়িয়ে বেড়িয়ে প্রচার করেছিলেন সেই টুসু গান-টি, জনসাধারণের কাছ থেকে বাংলা ভাষার সমর্থন আদায় করেছিলেন সেই মহান আত্মা বীর বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী মানভূমের প্রথম সাংসদ ভজহরি মাহাত-কে পুরুলিয়ার বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকাতে স্থান দিতেও কুন্ঠাবোধ করেছেন সব দল, সব সরকার | তিনি ভারত স্বাধীন করতে জেল খেটেছিলেন – ১৯৪০-৪১ ও ১৯৪২ সালে| প্রথম ও তৃতীয় লোকসভার সাংসদ ছিলেন (১৯৫২- ৫৭ এবং ১৯৬২-৬৭) | টুসুর গান গাওয়ার জন্য জেল খেটেছেন ১৯৫৪ সালে| বান্দোয়ান জুনিয়র হাই স্কুলের পরিচালনা করতেন| আপামর জনসাধারণের জন্য শিক্ষার প্রসার ও প্রচার করেছেন| তবুও তিনি Famous Person -এর তালিকায় ব্রাত্য| পুরুলিয়া জেলার সরকারি ওয়েবসাইট সেই কথাকে বেশ ভালো ভাবেই সমর্থন করে| সে সময় লোক সেবক সংঘে যাঁদের ধূর্ত মস্তিস্ক মানভূমের সাধারণ মানুষদের নেতা হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতো তাদের মধ্যে যাদের জন্ম মানভূমে হয়নি তাঁরা নিশ্চয়ই টুসু গান সম্বন্ধে তেমন কিছু জানতেন, বুঝতেন  বা গাইতেন বলে কোথাও জানা যায়নি| টুসু সত্যাগ্রহের ৬৫ বছর পরেও শহুরে বাংলাভাষীদের সম্যক ধারণা না নিয়ে  টুসু’র গান গাওয়ার জন্য  কৃষি প্রধান ভূমিপুত্র কুড়মি সম্প্রদায়ের রোষের মুখে পড়তে হয়, তার উদহারণ আমরা পেয়েছি ২০১৯ সালের  ৩৯তম পুরুলিয়া বইমেলাতে|

দুঃখের বিষয়টি এটাই যে এখন ‘কালীঘাট’ যেটুকু ভাবে সেটুকু দয়ায় মিলে মানভূমের বংশধরদের ভাগ্যে, তার আগে ‘আলিমুদ্দিন’ যা ভাবতো সেটুকুই পেতো আর সেসময়  ‘শিল্পাশ্রম’ যা ভাবতো তাই হতো পুরুলিয়াতে| পাল্টেছে সময়| বদলায়নি পদ্ধতি| শিকলে বাঁধা থাকতে থাকতে পোষা হাতি যেমন ভুলে যায় তার নিজের ক্ষমতা – আমরাও তেমনি ভুলতে বসেছি নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি , নেগাচার| ওদের দয়াতে বেঁচে থাকাটা অভ্যেসে পরিণত হয়ে গেছে আমাদের| তাই শুধু সেটাকেই জীবনের লক্ষ্য ভেবে মিছিলে হেঁটে চলেছি – কোনোদিন গতর খাটিয়ে, দিমাক লাগিয়ে নিজের অধিকারের জন্য কষ্ট করতে শিখিনি| লোকসেবক সংঘের একচেটিয়া আধিপত্য যখন কায়েম ছিল তখন মানভূমের বাকি সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে শিক্ষার অভাব ছিল| দীক্ষার অভাব ছিলোনা – ব্র|হ্মণ্যবাদের ধারাকে মাথায় ঠুসে দেওয়ার জন্য|

তাই সেসময় নেতৃত্ত্ব দিয়েছিলেন বিক্রমপুর (বাংলাদেশ) থেকে আগত নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্ত, বর্ধমানে জন্ম নেওয়া পুরুলিয়া কোর্টে চাকরিরত অতুল চন্দ্র ঘোষ, ওনার স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, ওনাদের বড় ছেলে অরুন চন্দ্র ঘোষ | এরা কেউই আদতে মানভূমের মানুষ ছিলেন না| নিজেদের সেন্টিমেন্টকেই  মানভূমের সেন্টিমেন্ট বলে চালিয়ে দিয়েছেন| ঘোষ পরিবারের মানভূম আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ভূমিকার কথা পড়ে দুটো জিনিস খুব স্পষ্ট : প্রথমত – এখানকার লোকজন খুব একটা শিক্ষিত না থাকায় চেতনার অভাব ছিল, তাই বাইরের লোকেরা চালাকির দ্বারা নিজেদের ধারা প্ৰতিষ্ঠা করে গেছে| যতটা সম্ভব নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে গেছে| দ্বিতীয়ত: বংশানুক্রমিক আধিপত্য বিস্তার কংগ্রেস-পন্থী দল গুলোর মধ্যে তখন থেকেই আছে|

মানভূমের টুসু সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ‘সর্বকালের জনপ্রিয় (?)’ গানটির লেখক তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী মহান বীর পুত্র ভজহরি মাহাত মহাশয়ের পুরুলিয়া জেলার কুড়মি তথ্| সমস্ত আদিবাসীদের মধ্যে অর্জিত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন বাংলাভাষী মানভূম বিভাজনকারীরা| ভজহরি মাহাত মহাশয়ের বাড়ি পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ানের পাশে জিতান গ্রামে| কিন্তু বান্দোয়ান – এর বুকে ঋষি নিবারণ চন্দ্রের নামের স্কুল পাবেন, অমরনাথ ঝাঁ এর নামে স্কুল পাবেন কিন্তু এই মহান বিপ্লবীর নামে তেমন কিছুই করতে দেয়নি সুক্ষ রাজনৈতিক ধান্দাবাজেরা| সারা মানভূম জুড়ে জনপ্রিয়তা ছিল ভজহরি বাবুর কিন্তু স্কুল এর নামকরণ হলো বাংলাদেশ থেকে আগত মানুষের নামে| জনপ্রিয়তা না থাকলে কোনো মানুষ কোনোদিন প্রথম সাংসদ হতে পারেন ?

‘লাবণ্যপ্রভা ঘোষ’ – কে মানভূম জননী বলে অভিহিত করেন অনেকে , সেটা কতটা সার্থক জানা নেই, তবে এইটুকু সবাই বোঝেন যে জননী জন্মদান করেন| আর মানভূমকে বাংলায় ঢোকাতে গিয়ে মানভূম ত্রিখন্ডিত হয়েছিল| মানভূমকে টুকরো করে কেটে ভাগ করার সুবাদে (?) কেও যদি মানভূম জননী হতে পারেন তাহলে ব্যাপারটা খুব একটা যুক্তিযুক্ত নয়|

কিন্তু কিভাবে তিন টুকরো করা হয়েছিল মানভূমকে ? দেখে নেওয়া যাক একটু অন্যদিক টা|

গল্পের বীজটা পোঁতা হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর থেকেই| স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বদেশী আন্দোলনের প্রচার করার সময় ভারতের জাতীয় কংগ্রেস বিভিন্ন পাবলিক মিটিং এ প্রচার করতে শুরু করেন যে ভারত বর্ষ স্বাধীন হলে ভাষা ও সংস্কতির ভিত্তিতে রাজ্যগুলো গঠন করা হবে| ১৯১৩ সালে যখন হিন্দি ভাষাকে ধানবাদ মহকুমার কোর্টে দ্বিতীয় ভাষা করার ঘোষণা করা হয় তখন কিছু বাংলাভাষী মানুষ তাতে প্রতিবাদ করেন| তখনকার দিনে তোপচাঁচি থানা এলাকায় যেখানে ৭৫ শতাংশ হিন্দি ভাষী মানুষ বাস করতো সেখানেও নাকি স্কুলগুলোতে বাংলা ভাষাতেই শিক্ষাদান চলতো| সারা মানভূম জুড়ে তখন সরকারি চাকরিগুলোতে বাংলা ভাষীরাই  ছিল| পড়াশোনাতে বেশি পারদর্শী ছিল,  না – ইংরেজদের চালানো সরকারে নিজেরা চাকরি পেতে বেশি উৎসাহী ছিল সেটা বোঝার মতো তথ্য নেই আমার কাছে| অবশ্য পুরুলিয়া তথা মানভূম তথা জঙ্গল মহলের  বুকে  বেশির ভাগ সরকারি অফিসে এখনো অবধি ওদেরই ছড়ি ঘোরানো চলছে| এসব কথা শুনে ওরা নিজেদেরকে বুদ্ধিমান ভাবে ঠিকই, অনুন্নয়নের দায় টা এখনো অবধি নিতে শেখেননি, দুর্নীতি না হয় বাদেই দিলাম|

ধানবাদের ঘটনা হিন্দি ভাষী মানুষদের মনে ব্যথা দেয়| তখনকার দিনে পুরুলিয়ার কোর্টে ব্যবহৃত ভাষা বাংলা ছিল কিন্তু প্রচুর মানুষ হিন্দি ভাষী ছিল তখনও – তাই তাদের খারাপ লাগতো ব্যাপারটা| ১৯১৫ সালে পুরুলিয়া কোর্টে হিন্দি ভাষাকে বিকল্প ভাষা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য হিন্দি ভাষী মানুষেরা স্বারক লিপি জমা দেয়| মানভূমে বাঙালিদের প্রভাব অনেক বেড়ে যাওয়ায় এমনকি বলা যেতে পারে পুরোপুরি বাংলা ভাষীদের  কন্ট্রোলে থাকায় হিন্দিকে যাতে বিকল্প ভাষা হিসাবে কোর্টে না ব্যবহার করা হয় তার জন্য বাঙালিরা ব্রিটিশদের কৌশলগত ভাবে প্রভাবিত করে| সেসময় কুড়মি, সাঁওতাল, ভূমিজ, মুসলিম, মাড়োয়ারি ইত্যাদি  সম্প্রদায়ের মানুষেরা হিন্দি ভাষাকেই সমর্থন করেছিল| কিন্তু বাংলা ভাষীরা কুড়মালি ভাষাকে না সম্মান দিয়েছে, না হিন্দির সমর্থনকে কায়েম করতে দিয়েছে | বদলে কুড়মালিকে বাংলার উপভাষা হিসাবে প্রমাণিত করতে চেষ্টা করেছে| ব্যাপারটা এরকম, যে- জোর করে কুড়মি, সাঁওতাল সবাইকে বাংলা ভাষা বলতে বাধ্য করেছে কিন্তু ওদের ভাষা গুলোকে সম্মান জানায়নি কোনোদিন| তাই তো আজও লড়াই চলছে কুড়মি-দেশের কোনায় কোনায়, সাঁওতালি ভাই বোনদের অলিতে গলিতে| শুধু ভাষা কেন – আমাদের সংস্কৃতির নাম দিয়েছে – লোকসংস্কৃতি, নাচের নাম দিয়েছে লোকনৃত্য| বাংলা ভাষার আধিপত্য কায়েম করতে কুড়মি, ভূমিজ, সাঁওতাল, মুদি, কোল, ভিল, মুন্ডা সবার সমর্থন নিয়েছে কিন্তু তাঁদের সংস্কৃতি  গুলোকে নিজেদের বলে স্বীকার করেনি – আর করতেও পারেবন কোনোদিন| লোক সংস্কৃতির ‘লোক’ কারা?  আপন কারা ? এসব   বিচার করার সময় চলে এসেছে| ‘ছো’ নাচ তো লোক নৃত্যই বটে – শহুরে বাংলাভাষীদের জাংরায় হবেনা সেটা| সাত জন্ম চেষ্টা করলেও পারবেনা | তাই ‘লোক-নৃত্যই থাক| ইদানিং যারা  ঝুমইর গান গেয়ে, টুসু গান গেয়ে, লোক সংস্কৃতিতে ফিউজন এর নামে  গিটার আর ড্রাম বাজিয়ে পেট চালানোর চেষ্টা করছেন তাদের বাংলা ভাষার উপর ভরসা  চলে গেছে| তাই এখন ভজহরি বাবুর বান্দোয়ানেও লালন পুরস্কার প্রাপ্ত পোস্ত বালা দেবীর অবস্থান হয়  ‘হিন্দি’ চটুল গানের পরে| তার সাথে ভজহরি বাবুর মৃত্যুদিবস পালনের আসরে কুড়মালি ভাষাকে বাংলার বিরোধী বলার মতো ‘অবুঝ’ লোক কিছু থাকবেনই| দুটো ভাষা কি পাশাপাশি সহাবস্থান করতে পারে না? একজনের আর একজনের উপর দাদাগিরি দেখানো , গলা টিপে মেরে ফেলার চেষ্টা করা কি খুব জরুরি ? হিন্দি ও ভোজপুরি কি একসাথে ঘর করছে না?

১৯২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মানভূম জেলার মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫, ৪৮, ১১১ জন | ভাষা অনুযায়ী জনবিন্যাস দেখানো হয়েছিল :

বাংলা ভাষী                          : ১০, ৩৫, ৩৮৬ জন

হিন্দি ভাষী (উর্দু সমেত)        : ২, ৮৯, ৩৫৬ জন

আদিবাসী ভাষা ব্যবহারকারী : ২, ১৩, ৩০১ জন

অন্যান্য ভাষা-ভাষী              : ১০, ৩৭৪ জন

উপরের তথ্য অনুযায়ী এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে মানভূমে বাংলা ভাষী লোকের সংখ্যায় সব থেকে বেশী ছিল সেসময়| তাহলে আপনার মনে হতেই পারে যে -তাহলে যা ঘটেছে, ঠিকই ঘটেছে| খুব একটা খারাপ হয়নি|  কিন্তু এই তথ্যের মধ্যে ‘ঝোল’ ছিল| আদিবাসী এবং আধা-আদিবাসীদেরকেও বাংলা ভাষী হিসাবে দেখানো হয়েছিল এই আদমশুমারিতে|

এই সময়ের বি. কে. গোখলে’র সেটেলমেন্ট রিপোর্টে বলা হয় যে ১৯২১ সালে ৭,৯৪, ২৯০ জন আদিবাসী এবং আধা-আদিবাসী মানুষ বাস করতো| অর্থাৎ ১৯২১ সালে মানভূমে প্রকৃত পক্ষে বাংলা ভাষী মানুষ ছিলেন  শুধুমাত্র ২,৪১,০৯৬ জন – অর্থাৎ হিন্দি ভাষীদের চেয়েও সংখ্যায় কম ছিল|  গোখলের রিপোর্ট অনুযায়ী আদিবাসী এবং আধা-আদিবাসী মানুষ – যাঁদেরকে বাংলা ভাষী হিসাবে চক্রান্ত করে দেখানো হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ :

কুড়মি    : ২, ৮৬, ১২৫ জন

সাঁওতাল :২,৩৮, ৫৩৪ জন

বাউরি     : ১,০৭,৯৭৭ জন

ভূমিজ    : ৯২, ১৯৪ জন

ভূইয়াঁ     : ৩৮, ৩৯৫ জন

কড়া      : ১৯, ৯৯৬ জন

খেড়িয়া  :৫৬৪০ জন

ওরাওঁ    : ৩১৫৬ জন

মুন্ডা      : ২২৮৩ জন

__________________________

মোট : ৭,৯৪, ২৯০ জন |

এই ৭,৯৪, ২৯০ জন মানুষ কোনদিনই বাংলা ভাষী ছিলেন না| আজ ৯৮ বছর পরেও এরা পরিষ্কার ভাবে বাংলা বলতে শেখেননি| বাংলা ভাষীরা অবশ্য এক কোনায় ফেলে রাখতে ডায়ালেক্ট ,উপভাষা ইত্যাদি শব্দ ঘষে মেজে বার বার ব্যবহার করে গেছেন|

১৯১৫ সালে মানভূমের ডেপুটি কমিশনার বলেন “The census figure of 1911 are not above suspension, seeing that they are prepared from the reports of Bengali numerators. I have unearthed a note by Mr T.Milne who took great interest in the matter, while he was the Deputy Commissioner in Manbhum in 1912. He was convinced (and I am sure he was right) that 291000 Kurmi Mahtoos the backbone of the agricultural class, had been wrongly shown as Bengali, though they should has been treated as Hindi speaking aboriginals. This class, being added to 326363 shown  as Hindi speaking and 233684 shown as Shantals and other aborigines, gives a total of 851047 non-Bengalis out of a total population of 1547576 for the whole districts”.

১৯৪১ সালে আদমশুমারিতে দেখা যায় একটু অন্য রকম| মানভূম জেলার মোট ২০, ৩২, ১৪৬ জন মানুষের মধ্যে সাঁওতাল ভূমিজ মুন্ডা ইত্যাদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের জনসখ্যা ছিল ১১, ৭৩, ৮৯৮ জন| কুড়মি দের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ| ৮৬ শতাংশ মানুষ ভালো করে বাংলা বলতেই পারতেন না| কুপ্ল্যান্ড লিখেছেন : “There is a great difference between the Rarhi-Boli (Language spoken in Manbhum) and Bengali spoken in Bengal proper. I have noticed this very particularly in the case of pliders who have newly come to the district and who happened to be pleading in my court. I have often had to explain to them what witnesses said. In fact, Bengali is only spoken by immigrants in to Manbhum and their descendants.”

 ঠিকঠাক ভাবে বাংলা বলা মানুষের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশী ছিল না|  বিহারি ও বাঙালিদের ঠেলাঠেলিতে পড়ে মানভূমের মানুষেরা প্রায় ধরাশায়ী| কুড়মালি ভুলে যেতে বসেছে কুড়মি সম্প্রদায়ের মানুষেরাই, সাঁওতালি ভাষা সংবিধানে স্বীকৃতি পেলেও শিক্ষার ব্যবস্থা  করেনি বাংলা / হিন্দি ভাষী দের দ্বারা চালিত সরকার গুলো| পুরুলিয়ার কুড়মি এমএল এ , এমপি গুলো ভালো করে না পারেন হিন্দি বলতে না আছে বাংলাতে ভালো দক্ষতা – তাই বিধানসভা, লোকসভাতে চুপ থাকাটাই শ্রেয় বলে মনে করেন| হিন্দি ভাষার সমর্থনে সেসময় দেবেন মাহাত লোকসভায় বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে কুড়মালি  শব্দ ভান্ডারের সাথে হিন্দি শব্দ খানিকটা মিল থাকলেও বাংলা থেকে অনেক দূরে| পক্ষান্তরে তিনি হিন্দি  ভাষাকেই সমর্থন করেছিলেন| কিন্তু সেসময় বিহারি দের তুলনায় বাঙালীরা শিক্ষা, রাজনীতিতে, জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি জাগাতে বেশী পারদর্শী ছিল| তাই হিন্দিভাষীরাও পেরে ওঠেনি বাঙালিদের সাথে| আর আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা তো তখন  কোনোদিন ভাবেনই নি যে তাঁদের ভাষাও সরকার স্বীকৃতি দেবে, চর্চা করাবে| এখন বুঝতে পেরেছেন সবাই – সাঁওতাল, কুড়মি, ভূমিজ এদেরকেই কেন বাংলা শিখতে হবে পশ্চিমবাংলায় বাস করার জন্য| বাঙলিরাও শিখুক কুড়মালি, সাঁওতালি ইত্যাদি ভাষা| অবশ্য ভাষার নাম সাঁওতালি আর হরফের নাম অলচিকি এটাই এখনো পরিষ্কার নয় বাঙালি বাবুদের কাছে|কিন্তু রাজনীতি বড় বালাই | তাই এখন বাঙ্গাল-ই মুখ্যমন্ত্রীদেরও প্ৰয়োজন পড়ে পুরুলিয়াতে হিন্দি ভাষীদের সাথে আলাদা মিটিং করার| গেরুয়া হিন্দি ভাষী রাজনৈতিক নেতাদের সভাতেও ভিড় জমায় পুরুল্যার ‘বাংলা-হিন্দি’ ফিউজন ভাষীরা|

১৪ই  জুন ১৯৪৮ লোক সেবক সংঘ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর অতুল চন্দ্র ঘোষ ও বিভূতি মোহন দাস সভাপতি ও সম্পাদকের পদে আসীন হন| অহিংস সত্যাগ্রহের ভাবনা গান্ধীজির থেকে ধার করা আর ‘টুসু’ ও ‘হাল-জুঁয়াইল’ মানভূমের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষিভিত্তিক কুড়মি সম্প্রদায়ের আবেগকে পেতে করা আন্দোলন| আন্দোলনের বাকি অংশ, ভজহরি বাবুদের হাজারীবাগ জেলে কাটানো এগুলো প্রায় জানা ঘটনা অনেকের|

মানভূম ভাগ হয়ে যাওয়ার শেষে TISCO কোম্পানির বিশেষ অনুরোধে তৎকালীন  বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় পটমদা, ইচাগ ও চান্ডিল থানা দান করে দেন| কেন ? ওখানকার বাঙালিদের  নিয়ে ভাবেননি কেন তিনি ? ধানবাদের বাঙালিরাই বা কি দোষ করেছিল – যদি মানভূমকে বাংলাতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল তাহলে? আসলে সবই নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া |টাটা কোম্পানির সাথে কংগ্রেসের ভালো সম্পর্ক ছিল সেটা সবার জানা| সুভাষ চন্দ্র বসু থেকে শুরু করে গান্ধীজি সবাই টাটা কোম্পানিকে সমথর্ন করতো| ওদের কাছে আর্থিক সাহায্য নিতো|

এপ্রিল ১৯৩৪ এ আইন অমান্য আন্দোলন শেষ হওয়ার ডাক দেওয়ার পর ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় এবং ভুলাভাই দেশাই কংগ্রেসের নির্বাচন কমিটির সম্পাদক  হোন| সভাপতি ছিলেন ডাঃ মুখতার আহমেদ আনসারী| কিন্তু আজকে হোক আর সেদিন হোক – নির্বাচন করতে, দল চালাতে তো টাকা লাগে| তাই বিধান চন্দ্র রায় দেশাই-কে টাকা জোগাড় করার বিভিন্ন প্রস্তাব দেন| যার মধ্যে অন্যতম প্রস্তাবটি ছিল –   পুরুষোত্তম দাস ঠাকুরদাস ও টাটা স্টিলের উর্ধতন কর্তাদের সাথে কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে টাকা চাইতে বলা – যাতে করে টাটা স্টিল কংগ্রেস পার্লামেন্টারী বোর্ডকে যেন একটু বেশি করে টাকা দান করেন| কিন্তু টাটা তো ব্যবসায়ী – ওর টাকা আছে – ক্ষমতা আছে তাই অকারণে টাকা দিতে যাবে কেন? কিন্তু বিধান চন্দ্র রায়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাবে বলা হয় টাটা গ্রুপ কংগ্রেস কে টাকা দিলে তার পরিবর্তে কংগ্রেস ব্রিটিশ  সরকারের কাছে  চাপ সৃষ্টি করবে ট্যারিফ বোর্ডের রিপোর্ট বাস্তবায়িত না করার জন্য | এমনকি টাটাগ্রূপের পক্ষপাতিত্ত্ব করে সুপারিশ করে দেওয়ার কথাও জানানো হয় – তাতে টাটা কোম্পানির আর্থিক সুবিধা লাভ হওয়ার কথা এবং সেটা হয়েও ছিল| হয়তো সেই সাহায্যকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই ‘বাংলার রূপকার’ কিছু অঞ্চলের বাঙালিদের কথা ভাবেননি | দান করে দিয়েছিলেন তিন তিন টা থানা|

চক্রান্ত করে বাংলা ভাষীরা  সংখ্যা বেশী দেখিয়ে, চোখ রাঙিয়ে, ব্রিটিশদের সাথে গড়াপেটা করে  বাংলা ভাষা সংস্কৃতির প্ৰভুত্ব বিস্তার করতে কসুর করেনি| শুধু কি তাই ? অমিত ঝাঁ এর লেখা Contemporary Religious Institutions in Tribal India বইয়ে লেখা হয়েছে …”After the Raja of Panchakot embraced Hinduism, the martial dance of Kurmis called “Chhou” dance was made to accept Hindu mythological anecdotes. Nibaran Chandra Dasgupta of Purulia, a man famous in the Gandhina Movement, helped the culmination of the process of Hinduisation of Kurmis. He was doing a peculiar type of reformative work among Kurmis, which was called “Tribalism of Kshatriya Culture”. During the census of 1931, he did not only suggest the Kurmis to declare themselves as Hindus but also instructed the enumerators to record all of them as Hindus . The Kurmis were thoroughly reformed in the census. Nibaran Chandra Dasgupta was declared as saint. The area where the office of Adimjati Seva Mandal is located in Ranchi was renamed Nibaranpur. Who knows whether the Kurmis were defeated in their stronghold by the unimaginative action of a saint or were deprived cunningly conceived political conspiracy against them?”  অর্থাৎ এটা পরিষ্কার যে নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্ত সহ বাকি সব বাংলাভাষীরা মানভূমে বাংলা ভাষার প্রচার সহ, সংস্কৃতি, ধর্ম এগোলোকেও পরিবর্তন করে দিতে চেষ্টা করেছেন | গান্ধীবাদী ভাবধারা দেখানোটা ছিল ঢং|  শখ করে কেউ সেজেছিলেন ঋষি|

One thought on “বাংলা ভাষার চক্করে ১লা নভেম্বর ১৯৫৬ কপাল পুড়েছিল পুরুল্যার

  • Sun behari bhai
    Gandhiji planned to form the Lok Sevak Sangh. Thus, after his sad demise the veterans of Manbhum Congress Party launched Lok Sevak Sangh in June 1948 with an aim to implement Mahatma’s dream with a new movement in the newly independent India demanding creation of states on the basis of language. Bhajahari babu became evident in pioneering this venture and led the cultural campaign. Like other regional leaders he was a conservative who strongly advocated for preservation and promotion of language and culture of his region. To bring awareness, the strong-minded leader had toured entire the region on foot singing his songs as he never learned riding. One of his remarkable songs was ‘Sun behari bhai, Tarha rakhte larbi dang dekhai’. He addressed, listen Bihari brothers that you can’t keep it up showing the sticks. The government banned this song and jailed him. The then a sitting MP spent 22 months in jail for this song. It seems incredible looking at the present Parliamentarians who often caught in camera making shoddier as well as slanderous statements against minority and indigenous peoples and enjoy impunity.
    However, it looked like a miniature version of Mandela’s 22 years term in Pretoria but carried similar characteristic. This incidence raised question: did it happen to his because he saw ‘a python in Delphi’ that’s he warned his people about a strange and uncertain time to come?

Leave a Reply