জঙ্গলমহলের প্রান্তিক সাহিত্য পথিক অমিত মাহাত

Our Voice

একলব্য মাহাত : জঙ্গলমহলের অলিতে গলিতে প্রতিভার অভাব নেই, শুধু একটু নজর ঘুরিয়ে দেখতে হয়| আজকে কথা বলবো জঙ্গলমহলের এক বিস্ময় প্রতিভা নিয়ে। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের খড়গপুর টাটানগর শাখার ঝাড়গ্রাম স্টেশনের পরবর্তী স্টেশন জামবনীর খাটখুরা হল্ট। সেখান থেকে এক কিমি হাঁটলেই আঙ্গারকুড়িয়া গ্রামে আসা যায়। সেই গ্রামেই বাস করেন একজন মানুষ | জঙ্গলমহল নামক এক বৃহত্তর ভূখণ্ডের প্রান্তিক মানুষের সুখ, দুঃখ, আশা-ভালোবাসার গল্প যার কলমে মূর্ত হয়ে ওঠে। যার রচিত গানশুনে উদ্বেল হয়ে ওঠে আদিবাসী ভুখা মানুষের দল। অন্তরের ব্যথাকে একাত্ম করে ভাবের আবেগে নির্বিকার জীবন যাপন করে|

হ্যাঁ, গীতিকার, গল্পকার, কবি অমিত মাহাত’র কথাই বলছি। যে নামটা আজ জঙ্গলমহলের বোদ্ধা ও বিদ্দজনদের কাছে অপরিচিত নয়।

‘ মা মাটি জনম ভূমি আমার কাছে সোনা’

কি এই গানটা শুনেছেন তো? পরিতোষ মাহতোর গলায় গাওয়া এই গানটি কে লিখেছেন জানেন নিশ্চয়| সেই বিশিষ্ট ঝুমুর কবি অমিত মাহাত এর বাড়িতেই আমি গিয়েছিলাম তার সঙ্গে আড্ডা দিতে। তার সাধনার ক্ষেত্রটি দেখতে। মরমিয়া প্রেমের মাটির মানুষটি কোথায় বাস করে সেটা দেখার উদগ্রীব ইচ্ছা অনেক দিন ধরেই ছিল| জীবনে দুঃখ থাকলেই বোধ হয় কলমের ধার বেশি তীক্ষ্ণ হয়, জীবন তুলির আঁচড় আরও বেশি জীবন্ত হয়, নিপুন হয়| অমিতের লেখা পড়লে সেকথা আরও বেশি সুস্পষ্ট হয়|

সত্যি কথা বলতে, তার জীবনযুদ্ধের কথা শুনতে শুনতে, তাঁর কষ্টের জীবনযাপন দেখতে বহুকষ্টে নিজের কান্না লুকোলাম। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘ একদশক আগে। তাঁর একাকীত্ব, তার দুঃখ কিছুটা অনুভব করতাম। কিন্তু, আজ তার বাড়িতে এসে বুঝছি তার চেয়েও অনেক কষ্ট নিয়ে সে বেঁচে আছে। অমিতের একদিন সব ছিল। মাচাভরা ধান, হাল-বলদ, গোরু গাড়ি, বাবা -মা। সব হারিয়ে অমিত আজ একাকী দিনযাপন করেন। একমাত্র সাথী সেই কলম।

বাবার স্মৃতি বলতে কিছু নেই। জ্ঞান হওয়ার আগেই বাবাকে হারায় অমিত। তারপর মাত্র ষোলোটা বছর মা কে কাছে পাওয়া। একাদশ শ্রেনীতে পড়তে পড়তেই মা ও চলে যান অমিত কে ছেড়ে। তারপর থেকে সেই যে একাকীত্বের জীবন শুরু হয়েছে, এখনো শেষ হয়নি। এই ত্রিশোর্ধ জীবনে তার জন্য অপেক্ষা করার মত এখনো কেউ আসেনি।

তার বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করে থাকে পোষা মোরগ মুরগীরা। কখন এসে তাদের প্রভু জল আর খাবার দেবে তাদের জন্য। আর অপেক্ষা করে থাকে তার এই শূন্য ঘর, লেখার খাতা। এই লেখার খাতাই তার পরম আশ্রয়। বন্ধু, স্বজন। এই লেখার খাতাই তাঁকে দিয়েছে সারা পশ্চিম বঙ্গ ব্যাপি অসংখ্য বন্ধু, সুহৃদ। যারা তার শুভাকাঙ্ক্ষী।

অমিত রাত জেগে লিখে চলে তার যন্ত্রনার কথা, দারিদ্র্য এর কথা, একাকীত্বের কথা, অনাথ জীবনের গল্প। ব্যাক্তিগত দুঃখ, কষ্ট লেখার মুন্সিয়ানায় অনায়াসে হয়ে ওঠে বৃহত্তর জঙ্গলমহলের প্রান্তিক মানুষের বারমাস্যা। না, তার নিজস্ব কোন বই নেই। বই প্রকাশ করার কথা তিনি ভাবতে পারেন না। ভাবাটাই তার কাছে বিলাসিতা। পয়সা কোথায়? বেঁচে থাকাটাই যার কাছে চ্যালেঞ্জ সেখানে বই প্রকাশ মুশকিল। তবে সারা পশ্চিম বঙ্গ ব্যাপি বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, লিটিল ম্যাগাজিন জুড়ে তিনি লিখে চলেন ছোট গল্প, অনুগল্প, কবিতা। কোলাঘাটের ইঁটভাটার শ্রমিক, বেলপাহাড়ীর পাথর শিল্পী, নামাল খাটুয়া, লালগড়ের সব্জি চাষিরা তার গল্পে চরিত্র হয়ে আসে। আর আসে দুখিনী মায়ের কথা, ছোটো বেলায় ভালো লাগা গ্রামের সহপাঠিনীর কথা।

লিখেছেন অজস্র ঝুমুর গান। তার লেখা গান, ‘মা মাটি জনম ভূমি ‘, জঙ্গলমহলের এমন কোন শিল্পী নেই গাননি।এমন কোন মানুষ নেই যিনি এই গানটি শোনেননি। মাওবাদী আন্দোলনের পটভূমিকায় লেখা হোলেও এই গান তার নিজেরও জীবন যন্ত্রণা। ‘সংবাদ মন্থন’, ‘নবজাগরণ’ সহ একাধিক স্থানীয় সংবাদপত্রে লিখেছে অমিত।

বাড়িতে যথেষ্ট জমি জায়গা থাকলেও শিল্পী মন আর ভবঘুরে স্বভাবের জন্য আজও সম্পূর্ণ বিষয়ী হওয়া হল না। তবু চাষ করতেই হয়। কারন জমি তো আর শুধু মাটি নয়। মা ও বটে।বাবাও বটেন। কেননা, এই জমিতেই একদিন তার বাবা মা ফসল ফলিয়েছেন। তাদের ঘাম এর স্মৃতি লেগে আছে এই মাটিতে। জমিতে ফসল ফলানো আর কবিতা লেখা তার কাছে সমার্থক। সকালে হাঁড়ি মাজার মধ্য দিয়ে তার সকাল হয়। তারপর রান্না করে, মরগীদের খাইয়ে বাইরে বেরতে হয়। চাষবাসের পাশাপাশি কখনো কারখানার ঠিকা শ্রমিক, রেশন দোকান বা কাপড় দোকানের অস্থায়ী কর্মচারী। ফিক্সড ইনকাম বলতে লোকপ্রসার প্রকল্পের হাজার টাকা মাসিক ভাতা।এইভাবেই অমিতের জীবন এগিয়ে চলে।

অমিতের সবসময়ের সাথী বলতে একটা পুরনো সাইকেল। বাবার রেখে যাওয়া। এই সাইকেলে করেই অমিত খুঁজে বেড়ায় লুকানো ইতিহাস। ইতিহাসে ঠাঁই না পাওয়া ইতিহাস। চলে যান বেলপাহাড়ীর পাথর খাদানে শ্রমিকদের জীবন দেখতে। খুঁজে দেখেন, ধলভূমগড়ে কেন গড়ে উঠেছিল এরোড্রাম? কানাইসর পাহাড়ের পাদদেশে, বাড়াঘাটের মেলায় সাঁওতাল বন্ধুদের সঙ্গে নিশিযাপন করেন জীবনের উষ্ণতা খুঁজতে। আঞ্চলিক ইতিহাস বাঙ্ময় হয়ে ওঠে বারবার তার গল্প ও প্রবন্ধে।

কষ্টের জীবনে এখন একটাই চাওয়া, একটা আর্থিক সুস্থিতি। তাহলে হয়তো অমিতের কলম দিয়ে আরো অনেক কালজয়ী গান জন্ম নেবে, বেরিয়ে আসবে জঙ্গলমহলের জীবন যন্ত্রনার গল্প।ছোটনাগপুর ভয়েস স্বাক্ষী হয়ে থাকবে এই প্রতিভার জীবন সাধনায়|

(অমিতের বাড়ির ছবি)

Leave a Reply