গাঁয়ের নাম ধুঁধিখাপ, মেয়েটির নাম অলকা

Literature_of_soil

দিলীপ কুমার মাহাত
ছোটগল্প
________________

এক বছর আগেকার কথা। তখন সবে সূর্য্যের তেজ বাড়ছে। চৈত পরব লৈজকাই নাই তবে শিমুলে পলাশে টলমল হতে সাজছে সুন্দরী পুরুল্যা। বাঁধ বাগানের জল প্রায় মাটির তলানিতে ঠেকেছে। হাঁটু ডুবা জলে এক ঘাটে স্নান করে পশু ও মানুষ। অনুপ্রেরণার উন্নয়নে যে সব বাঁধ কুড়াকুড়ি হইয়েছে জল প্রায় থাকেনা বললেই হলো সেসব জলাধারে। বাঁধ গুলোর অবস্থানও মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। এরকমই এক আধমরা সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে নিম দাতুন দিয়ে মুখ মাজছিল এক অষ্টাদশী বালিকা – নাম ‘অলকা মাহাত’। মেন্ রোডের ধারে দু ধোঁপা পলাশ ফুল দেইখে মনে মনে বেশ আনন্দের শিহরণ হচ্ছিলো তার। দূরে কোথাও মাইকের আওয়াজে বুটন দেবীর গলায় গাওয়া একটা গানের আওয়াজটা ভেসে আসতে আসতে ক্রমশই তীব্রতর হচ্ছিলো সে আওয়াজ
“সদা রঙ্গিনী রাধা ________”

একখানা ৪০৭ মিনি ভ্যান কাছে আসতেই অলকা বুঝতে পারলো যে ওটা একটা ছো নাচ দলের গাড়ি। গতকাল রাত্রে ঘুমানোর সময় যে সব আওয়াজ ভেসে আসছিলো তার কানে সেগুলো যে ছো নাচের আসর থেকেই আসছিলো সেটা বুঝলো সে। পাশাপাশি কোথাও ছো নাচ ছিল হয়তো। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মুখের মধ্যে থাকা নিম দাতুনকে বের করে পাশের টিউবওয়েলে মুখ ধুয়ে কিছু একটা করতে যাবে তার আগেই রাস্তার উল্টোদিকে এক খানা স্করপিও গাড়ি এসে দাঁড়ালো । গাড়িতে এক দম্পতি ও সাথে গাড়ির ড্রাইভার। গাড়ির মধ্যে বসে থাকা বছর বিয়াল্লিশের এক মহিলা চোখের উপর ঢেকে থাকা কালো সানগ্লাস তুলে অলকার দিকে ইশারা করে ডাকলো ।
– এই মেয়ে শোনো এদিকে ।
বাংলা ভাষার ছাঁচ শুনে মেয়েটি বুঝতে পারলো গাড়ির লোকজন গুলো স্থানীয় নয়।

পাশে যেতেই ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন – ‘এখানে বাঘমুন্ডি রিসোর্ট টা কোন রাস্তা দিয়ে ঢোকা যাবে বলতো?’

হঠাৎ কালঘাম ছুটলাম অলকার। মনে পড়ে গেলো শিবরাম কাকুর কথা। শিবরাম মন্ডল – বাঘমুন্ডি রিসোর্টের ম্যানেজার। ওই রিসোর্টেই রান্না বান্নার ও রুম পরিষ্কার এর কাজ করে অলকা। গেস্ট দের উপস্থিতির আগাম বার্তা ছিল অলকার কাছে। অলকার বাবা নেই । এ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে – যখন সে ক্লাস সেভেনে পড়তো । বিধবা মায়ের শরীর খুব একটা ভালো থাকেনা। বিধবা ভাতাও প্রায় বন্ধ গত ৫ মাস ধরে – কাটমানি দিতে অস্বীকার করেছিল অলকা – গাঁয়ের চুনোপুঁটি নেতাদের। বাবা মারা যাওয়ার পর টেনেটুনে দু বছর স্কুল চালিয়ে যেতে পেরেছিলো সে – মেট্রিক পরীক্ষাটা আর দেওয়াই হলোনা । এখনো মাঝে মাঝে পাড়ার লোকেরা, প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার মশাই বিজয় বাবু দেখা হলে বলেন – মেট্রিক পরীক্ষা দিতে । কিন্তু এখন মায়ের হাল সামলাতে হয় তাকে। বাপের নামে তিন গুড়হা জমি আছে – জলের টানে চাষ হয়না সেগুলো প্রায় বছরেই। যায় হোক – কয়েক মুহূর্ত ভ্যাবাচেকা খেয়ে উত্তর না দিয়ে বেশ কয়েকটা প্রশ্ন করে বসলো অলকা –
– আপনারা রিসোর্টে যাবেন ? কলকাতা থেকে আসছেন? হাওড়া চক্রধরপুর ধরে এসেছেন, বরাভূম স্টেশন এ নেমেছেন ?

এতগুলো প্রশ্ন শুনেই ভদ্রমহিলা বুঝতে পারলেন যে মেয়েটি হয় খুব চাপে পড়ে গেছে নয়তো তাদের আসার কথা আগে থেকেই জানে সে।

কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই অলকা আবার বলে উঠলো –
– আমি ওই রিসোর্টেই কাজ করি।

ততক্ষনে গাড়ির মধ্যে বসে থাকা খয়েরি রঙের টিশার্ট পরা কাকুটা হেঁড়ো গলায় বলে উঠলো
– বাহ্ তাহলে তো খুব ভালো । চলো আমাদের গাড়িতে উঠে পড়ো। ভদ্রলোকের নাম অবনী ব্যানার্জী। সাথে ওনার স্ত্রী, নাম কোয়েল ব্যানার্জী।

অলকা সামনের সীটে উঠে বসেই ড্রাইভারকে জানালো – একটু এগিয়ে ডানদিক দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা বেয়ে ৩ মিনিট গেলেই রিসোর্টে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু ততক্ষনে কোয়েল কাকিমার চোখ ঠেকেছে অন্য জায়গায় – রাস্তার এক পাশে তরমুজ বিক্রেতা ছিল । তার কাছ থেকে তরমুজ কেনার ইচ্ছে প্রকাশ করতেই অবনী বাবুও খুব আপ্লুত হয়ে উঠলো । অবনী বাবু ও ওনার স্ত্রী অলকার সাথে তরমুজ কিনতে গেলো । কিন্তু তরমুজ বিক্রেতার সাথে অবনী বাবুর দরাদরি দেখে একটা মানসিক ধন্দে পড়ে গেলো অলকা। মনে মনে ভাবলো – কোলকাতার মানুষ, ন্যাহ্য দাম শোনার পরেও কেন যে এতো দর কষাকষি করলো ব্যাপারটা ঠিক বুঝলো না সে। দর কষাকষির মাঝে একটা কথা বড় কানে বিঁধলো তার – “এখানে তরমুজের এতো দাম হয়না”।

অবনী বাবু কলকাতার বাগুইহাটিতে থাকেন। ব্যাংকের উচ্চপদস্থ অফিসার। অনেকদিন থেকে ফেসবুকে পুরুলিয়ার ভ্রমণ কাহিনীর গল্প পড়ে আসছেন। এবারে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় ভ্রমণ, তার সাথে বাড়তি পাওনা হিসাবে থাকছে ‘পলাশ উৎসব’।

গাড়িটা রিসোর্টের রাস্তা বেয়ে মোড় নিতেই অবনী বাবু নাম জিজ্ঞেস করলো মেয়েটিকে। মেয়েটি বললো
– আমার নাম অলকা মাহাত।
– আর বাড়ি কোথায় ?
– দু কিলোমিটার দূরে একটা গ্রামে । নাম ধুঁধিখাপ।

গ্রামের নাম শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম কোয়েল আন্টির। অলকা ভাবলো যাক মামাবাড়ির নাম (চুঁইটাভুদরি )শোনেনি এরা।

– বাড়িতে কে কে আছে ?
– ‘মা’ । শুধু এই শব্দটাই ভেসে আসলো।
– পড়াশোনা করিস তুই ।
– করেছি । কেলাস নাইন অব্দি।

ড্রাইভার এর দেওয়া হর্ন শুনে রিসোর্টের দরজার গ্রিল খুলে দিলো গার্ড।

সেদিন রাত্রে খাওয়ার টেবিলে আবার অলকার সাথে দেখা হয় ওদের। ততক্ষন আরও অনেক গেস্ট এসেছেন ‘পলাশ উৎসব’ দেখতে ।রিসোর্টের খাবারের দাম দেখে খুশি না হলেও অলকার রান্না করা মুরগির মাংস খেয়ে বেশ নাম করেছে অবনী বাবুর স্ত্রী।
পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে কোয়েল আন্টি জিজ্ঞেস করলো –
– অলকা । পলাশ উৎসব এখন থেকে কতদূরে হচ্ছে, তুমি জানো ?
– অলকা বললো – সেটা কি জিনিস ম্যাডাম ?
– সে কি, তুমি অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে বাস করে পলাশ উৎসব জানোনা ?
– না ম্যাডাম । সত্যি জানিনা । আমি করম পরব জানি, বাঁদনাও জানি, টুসুর গানও গাইতে জানি , কিন্তু পলাশ পরব পহিল বার শুনছি ।

ততক্ষনে শিবরাম কাকু এসে তাড়াহুড়ো করে সস্ত্রীক অবনী বাবু সমেত অন্যান্যদেরকে নিয়ে গেলেন পলাশ উৎসব দেখাতে। অলকা অনেক ভেবেও খুঁজে পেলোনা যে ‘পলাশ পরব’ ব্যাপারটা কি। পরের দিনে অযোধ্যা পাহাড় ঘোরার পর রাত্রে অবনী বাবু সমেত আরও কিছু গেস্টের আব্দারেই ছো নাচের আয়োজন করা হয়েছিল রিসোর্টে। ছো নাচ দেখে আপ্লুত রিসর্টের সব গেস্ট গুলোই। বিশেষত কার্তিকের আগলা পিছলা আর পিঠচাম নাচ দেখে বার বার বাহবা দিচ্ছিলেন অবনী বাবু ও ওনার স্ত্রী।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্রেকফাস্ট সময় মতো না পেয়ে প্রায় ঝগড়ার উপক্রম হয়ে গেলো রিসোর্ট ম্যানেজার ও অবনী বাবুদের মধ্যে। অবনী বাবু কিছুতেই বুঝতে চাইলোনা যে অলকার মায়ের শরীর খারাপ তাই রান্না করা হয়ে ওঠেনি। ভোর বেলা থেকে খুব জ্বর বেড়েছে। তাই অলকা চলে গেছে তার মায়ের কাছে। পুরুলিয়া অবধি যে গাড়ি যাবে সে রাস্তায় কোনো ভালো দোকান দেখে অবনী বাবুদেরকে প্রাতরাশ করিয়ে দেবে – এমনটাই জানালো ম্যানেজার। অবশেষে বিতর্ক সেরে অবনী বাবুদের গাড়ি ছাড়লো। কাঁচা রাস্তা বেয়ে তিন মিনিট আসার পর মেন্ রোডে উঠলো গাড়ি। গাড়ি চলতেই গাড়ির আয়না দিয়ে কোয়েল আন্টি দেখলো – রাস্তা দিয়ে পেছন দিক থেকে দৌড়ে আসছে অলকা। ড্রাইভারকে বলতেই গাড়ি দাঁড় করলো সে। রিসোর্টেরই গাড়ি ওটা, তাই অলকারও পরিচিত। অলকা হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়ির সামনে পৌঁছে গাড়ির ড্রাইভারের হাতে ধরিয়ে দিলো এক টুকরো কাগজ । কাগজে একটা ওষুধের নাম লেখা। সাথে একটা দু’শত টাকার নোট। পুরুলিয়ার বাজার থেকে যেন ড্রাইভার কাকু সেই ওষুধ এনে দেয় সেই অনুরোধই করলো অলকা। আর কোয়েল আন্টির জন্য এক খানা তরমুজও নিয়ে এসেছিলো অলকা। তরমুজ পেয়ে অবশ্যই খুশি অবনী কাকুও। বিষাদ মিশ্রিত মনে অবনী বাবুদেরকে বিদায় জানাল অলকা।

পুরুলিয়া থেকে আনা ওষুধে অলকার মা একটু সুস্থ হতেই অলকা আবার কাজে ফিরলো পরের দিন সকালেই। অবনী বাবুদের খালি করে যাওয়া রুম তখনও পরিষ্কার করা হয়নি । রুম পরিষ্কার করতে গিয়ে লম্বা এক খানা কাগজ পেলো সে । ইংরেজিতে লেখা । দেখে মনে হয় কোনো দোকানের ফর্দ। রুম পরিষ্কার করার শেষে, শিবরাম কাকু কাগজ পড়ে শোনালো অলকাকে। ওটা একটা সুপার মার্কেটের ফর্দ ।কলকাতার কোনো মল থেকে গত সপ্তাহে একদিন সবজি কিনেছেন অবনী বাবুরা। হ্যাঁ – অবশ্য তরমুজও কিনেছেন । এক খানা তরমুজের দাম লেখা ছিল পঁয়ষট্টি টাকা।

এটা শোনার পর অবনী বাবুদের উপর অভিমান মিশ্রিত রাগ হলো অলকার। রাগ হলো কোয়েল আন্টির উপরও। অলকা ভাবলো – ‘যে মানুষটা অত টাকা দিয়ে কলকাতার বাজারে সবজি কেনেন – সেই মানুষটাই পুরুলিয়ার এক চাষীকে পাঁচ টাকা বেশি দিয়ে তরমুজ কিনলেই বা কি ক্ষতি হয়ে যেত। সব থেকে আর্শ্চয্যের বিষয় হিসাবে অলকা ভাবলো যে অবনী বাবু হয়তো কোনোদিন জানবেনই না —যে ছেলেটা রাতের বেলা শক্ত মাটিতে দর্শকদেরকে খুশ করতে হাড় ভাঙা খাটুনি খেটে গায়ের ঘাম ঝরিয়ে বাজির পড়ে বাজি দিয়ে বাজিমাত করছিলো ছো নাচে, যার কার্তিক নাচ দেখে তারিফের শেষ নেই অবনী বাবুর সেই লোকটাই সেদিন রিসোর্টের মোড়ে তরমুজ বিক্রি করছিলো। একটি বড় সাইজের তরমুজ – কুড়ি টাকা।”

এসব কথা ভাবতে ভাবতে অলকার মাথার উপর কখন যে এক টুকরো পলাশ ফুল ঝরে পড়েছে সেটা মনে নেই। পলাশ ফুলের টুকরো হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো অলকা, একটা চাপা বোবা কান্না ঘিরে ধরলো তাকে। চোখের জল মুছতে মুছতে অলকার মন বলে উঠলো -“পুরুলিয়ার মানুষ গুলো কে ভালোবাসুন অবনী বাবুরা, ছো নাচের সাথে সাথে ছো নাচের মুখোশের আড়ালের মানুষ গুলোকেও ভালো বাসুন। ছো নাচ ওদের পেশা নয় -ওটা নেশা, বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।” চোখের জল মুছে অলকা বলে উঠলো -” সস্তার ছুটি মানাতে এসে অযোধ্যা পাহাড় ধ্বংস করবেন না – প্রাকৃতিক ভাবেই পলাশ ঝরে পড়ুক আমাদের মাথায় – পলাশ পরবের নামে কি সব হচ্ছে সেগুলো না হলেও চলবে। পলাশ তো শুধু ফুল নয়, হামদের হৃদয়। তাই উৎসবের নামে, দেখার আছিলায় দয়া করে পলাশ ছিঁড়ে আমাদের হৃদয়কে রক্তাক্ত করবেন না।” এসব কথা ভাবতে ভাবতেই রগে দুঃখে অবনী বাবুদের সুপারমার্কেটের বিল টা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলো অলকা।

One thought on “গাঁয়ের নাম ধুঁধিখাপ, মেয়েটির নাম অলকা

Leave a Reply