আদিবাসী মুখ্যমন্ত্রী চাইছেন জঙ্গলমহলের সংঘবদ্ধ জনগণ

Our Voice

লালন কুমার মাহাত: অজয় মাহাত, মৃনাল কোটাল, মহাদেব বেসরা বা আশুতোষ সিং সর্দার – যদি পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এরকম একটা হয় তাহলে কেমন হয় | সংবিধান তো অধিকার দিয়েছে সবাইকে, সব সম্প্রদায়ের মানুষকে, তাহলে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ওই কলকাতা সংলগ্ন বা পূর্ববঙ্গের কোন উচ্চবর্ণীয় মানুষেই কেন হয়ে এসেছে ? পশ্চিমবাংলার দুরাবস্থার দায় তারা কেও এড়াতেও পারেন না | তারা দায় নেবে কি না সেটা জানা নেই কিন্তু কোন লুঙ্গি গেঞ্জি পরা মানুষ উপরে উঠে গেলে প্যান্ট পরা সভ্য মানুষদের অনেক গায়ে লাগে তার প্রমান ইতিমধ্যে পেয়েছেন জঙ্গলমহলের মানুষ | পশ্চিমবঙ্গের সম্ভ্রান্ত শ্রেণী জঙ্গলমহল এর মানুষকে কি নজরে দেখেন সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন – কিছুটা অবশ্য তাদের কাজে কর্মেও প্ৰকাশ পায়|

ডা. প্রফুল্ল ঘোষ (জন্ম ২৪ ডিসেম্বর ১৮৯১ – ১৮ ডিসেম্বর ১৯৮৩ ) ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জন্মেছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার মালিকান্দা গ্রামে। তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। তিনি ১৯৪৭-৪৮, ১৯৬৭-৬৮ ও ১৯৭১ সালে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাত ধরে মহাত্মা গান্ধী মালিকান্দা গ্রামে গিয়েছিলেন এবং একটি গান্ধী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন| মিস ওয়ার্ল্ড জাপান-২০১৬ সুন্দরী প্রতিযোগিতার ‘মিস জাপান’ খেতাব অর্জনকারী প্রিয়াংকা ইউসিকা ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর নাতনি।

ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় (১ জুলাই ১৮৮২ – ১ জুলাই ১৯৬২) ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৪৮ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। চিকিৎসক হিসেবেও তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। তার জন্ম ও মৃত্যুদিন (১ জুলাই) সারা ভারতে “চিকিৎসক দিবস” রূপে পালিত হয়। সময়টা ১৯৪৮ সাল। সদ্যখন্ডিত পূর্বপাকিস্তান থেকে ছিন্নমূল লক্ষ লক্ষ নরনারী শিশু নিঃসম্বল অবস্থায় শুধু প্রাণটুকু বাঁচাবার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে আছড়ে পড়ছিল সাতপুরুষের পদধূলিরঞ্জিত বাস্তুভূমি ছেড়ে। বিধান চন্দ্র রায় তাদের দিয়েছিলেন মাথাগোঁজার ঠাঁই, একমুঠো খাবারের প্রতিশ্রুতি।উদ্বাস্তুর আগমনে রাজ্যে তখন খাদ্য ও বাসস্থানের সমস্যা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্য তিনি মানভূমের এক অংশ পুরুলিয়া জেলাকে কেটে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসেন| তারপর সারা জঙ্গলমহল জুড়ে অনেক উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষকে কৌশলে ছড়িয়ে দেন| তাদের অনেকেই আজকে সারা জঙ্গলমহলে ছড়ি ঘোরাচ্ছে , সমস্ত সরকারি অফিস আদালতে তাদেরই রমরমা | জঙ্গলমহলের ভূমিপুত্র আদিবাসীদেরকে বিভাজন করার আপ্রাণ চেষ্টাও করে তারা | এভাবে বিভাজনের রাজনীতি ঢুকিয়ে নিজেদের মুনাফা লুটে এবং আদিবাসী দমন বেশি করে বেড়েছে তখন থেকেই|

প্রফুল্লচন্দ্র সেন ( জন্ম ১০ এপ্রিল ১৮৯৭ – ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ ) পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তারও জন্ম বর্তমান বাংলাদেশে, খুলনা জেলার সেনহাটিতে। অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় (১৫ এপ্রিল ১৯০১ – ২৭ মে ১৯৮৬) ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ ও ষষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী।সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় (১৯২০ – ৬ নভেম্বর, ২০১০) ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী| ১৯২০ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুন্সীগঞ্জ জেলায় হাঁসাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু ও মমতা ব্যানার্জী সম্বন্ধে মোটামুটি ভাবে এই প্রজন্মের মানুষের জানা| বর্তমান সময়ে একজন মানুষ আর একজনের রাজনৈতিক বিরোধিতা করলে একে অপরকে শত্রু ভেবে লড়াই ঝগড়াতে, হানাহানিতে মেতে ওঠে | কিন্তু উপরমহলের লোকেদের মধ্যে সব বোঝাপড়া থাকে | সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এসব বিরোধিতা করা হয়, রক্ত গরম করার কথা শুনানো হয় | এই প্রসঙ্গে এক বিশেষ ঘটনা উল্লেখ করি|

জ্যোতি বসু আর তাঁর ঠিক আগে যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, সেই সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এতটাই ছিল, যার সঙ্গে এখনকার মুলায়ম সিং যাদব আর মায়াবতীর দ্বন্দ্বের তুলনা করা চলে। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁদের দুজনের মধ্যে ছিল ততটাই সখ্যতা। সেই নৈকট্য শব্দে বর্ণনা করা কঠিন।

একবার চন্দননগর থেকে কলকাতায় আসার সময়ে জ্যোতি বসু আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে কয়েকজন অল্পবয়সী মেয়ে ঘিরে ধরেছিল। জ্যোতি বাবু সেই সময়ে রীতিমতো স্টার নেতা। তাই অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল।

কিন্তু ওই মেয়েরা জ্যোতি বাবুর হাতের লেখায় ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারে নি। তারা চাইছিল সইয়ের সঙ্গেই তিনি যদি কয়েকটা লাইনও লিখে দেন।জ্যোতি বসু আর কিছু লিখতে চান নি, শুধু সই করে দিয়েছিলেন।

গাড়িতে ফিরে আসার পরে সিদ্ধার্থশঙ্কর মজা করে বলেছিলেন, “এত সুন্দরী মেয়েগুলোকে তুমি এক কথায় মানা করে দিলে? রবীন্দ্রনাথের কোনও লেখা থেকে একটা দুটো লাইন লিখে দিতে পারতে।” জ্যোতি বসু জবাব দিয়েছিলেন, “জানলে তো লিখব।”

অর্থাৎ জ্যোতিবসু ছিলেন সেই নেতা যিনি রবীন্দ্রনাথ না পড়েও বাংলা শাসন করেছেন |  উপরমহলের নেতারা একে ওপরের বন্ধু হতে পারে কিন্তু সাধারণ মানুষদের মধ্যে তারাই আবার অহেতুক রাজনীতির বিষ বাষ্প ছড়ায়| এটাই রাজনীতি | সাধারণ মানুষের সেটা বোঝা উচিত|

তাহলে পশ্চিমবাংলাতে মোটামুটি ভাবে যারা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে শাসন করেছেন তারা সবাই হয় পূর্ববঙ্গীয় নাহয় কলকাতা ঘেঁষা মানুষ| প্রথমে কংগ্রেস শাসন করেছে, তারপর বামফ্রন্ট আর এখন তৃণমূল দল ( কংগ্রেস থেকেই যাদের জন্ম) শাসন করছে বামফ্রন্টের স্টাইলেই|

লক ডাউনের সময় জঙ্গলমহলের মানুষ উপলব্ধি করেছেন যে জঙ্গলমহলের মানুষ কতটা বঞ্চিত| এখনো অবধি দুমুঠো অন্নের জন্য হয় সরকারি ভিক্ষের জন্য অপেক্ষা করতে হয় আর না হয় অন্য রাজ্যে খাটতে যেতে হয়| শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তা ঘাট, পানীয় জল, জঙ্গল, জমি ( সি এন টি এক্ট) কোনো কিছুরই ঠিক নেই | তাই কুড়মি, সাঁওতাল, ভূমিজ, শবর সমেত জঙ্গলমহলের ভূমিপুত্রদের অনেকেই আজ একে ওপরের পশে দাঁড়াচ্ছে এবং আগামী বিধানসভা নির্বাচনে একজন আদিবাসী মানুষকে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দেখার স্বপ্ন দেখছেন| শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষার জলাঞ্জলি দিয়ে বাঁচা যে নিরর্থক তা বুঝতে শিখেছে সাধারণ মানুষ | কুড়মালি ভাখি, সাঁওতালি ভাষা এসব কে স্বীকৃতি দিলেও শিক্ষা দীক্ষা চালু করেনি রাজ্য সরকার | পশ্চিমবাংলায় বাস করলে, বাঁচতে গেলে, চাকরি করতে গেলে একজন সাঁওতাল কেই কেন অন্য ভাষা শিখতে হবে , একজন কুড়মি কে কেন অন্য ভাষায় শিখতে হবে বা জানতে হবে – জঙ্গলমহল জুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো সরকারি অফিসের উচ্চবর্ণীয় বাবুরা কবে কুড়মালি, সাঁওতালি ভাখি শিখবেন ?? দূর্গা পূজা, কালী পূজার জন্য সরকারি ছুটি বরাদ্দ হলেও করম পরব, সোহরায় পরব, মকর পরব এগুলোর জন্য সরকার এখনো ছুটি অবধি দেয়না যেটা সত্যি খুব অপমানজনক | পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডে আদিবাসী মুখ্যমন্ত্রী থাকায় অনেক অভিবাসী শ্রকিম বন্ধুরা বাইরের রাজ্য থেকে উড়োজাহাজে ফেরারও সুযোগ পেয়েছেন সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে সেই চিত্রটা খুবই খারাপ| পশ্চিমবাংলার কোনো মিডিয়া উচ্চবর্ণীয় কোনো নেতাকে শুধু নেতা বা সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে প্রচার প্রসার করেন কিন্তু আদিবাসী মানুষজনের রাজনীতি করলে তাদের নামের আগে ‘আদিবাসী নেতা’ এর মতো বেশ কিছু বিশেষণ ব্যবহার করে কি যেন একটা ইঙ্গিত দিতে চায় | সে যখন হচ্ছেই তাহলে একবার আদিবাসী মুখ্যমন্ত্রীও পশ্চিমবাংলায় হলে বেশ ভালোই হবে বলে জনমত| আদিবাসীদের দুঃখ আদিবাসীরাই বুঝবে বলেই মনে হচ্ছে জঙ্গলমহলের মানুষদের | এখন এটাই দেখার কতদিনে সব স্তরের মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের বুজরুকি ও চক্রান্ত এড়িয়ে নিজেরা সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে পারবেন |

Leave a Reply