১০ লক্ষ বনবাসী-আদিবাসীরা কি ঘরছাড়া হয়ে যাবে ২৬ শা নভেম্বর?

Our Voice

কৃত্তিকা পায়রা : দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বললেন, আসাম সহ সারা দেশে NRC হবে। চারদিকে হৈ হৈ রব উঠল, এভাবে দেশের একদল বাসিন্দা-কে বেআইনি বলা যায় না। শোনার ও আলোচনার লোক প্রচুর। পদত্যাগী আমলা থেকে যুব নেতা, সবাই আগ্রহের কমতি দিচ্ছেন না। কিন্তু আসলে কি জানেন – দেশের ১০ লক্ষ আদিবাসী এবং বন-জঙ্গল এলাকায় বসবাসকারী পরিবার কে এক কলমে বেআইনি ঘোষনা করে দেওয়া হয়েছে!! NRC তে বাদ যাওয়া লোক গুলো থাকার জন্য নাহয় detention camp পাচ্ছে, আর এখানে মধ্যে প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথের কর্মীরা পেলেট বন্দুক দিয়ে গুলি ছুঁড়ছে। এখানে দলের কোনো ভেদাভেদ নেই। ঝাড়খণ্ডের দেশপ্রেমী সরকার ২০১৭ থেকে ২০১৮ তে, প্রায় ১০ হাজার আদিবাসী ও বনাঞ্চলে বসবাসকারী লোকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার মামলা ঠুঁকে দিয়েছে ঝাড়খণ্ডের খুঁটি জেলায়।

আশ্চর্য্য লাগল শুনতে? ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ আদালত পরবর্তী শুনানির দিন রেখেছে, সামনের ২৬শা নভেম্বর, ২০১৯। জল-জঙ্গল-জমির ন্যাহ্য অধিকারের দাবিতে ১৬ রাজ্য থেকে মাত্র শখানেক লোক যন্তরমন্তরে জড়ো জড়ো হয়েছিল। আন্না হাজারের পিকনিক দেখতে এর চেয়ে বেশি লোক জড়ো হয়। কিন্তু ভিটেমাটি থেকে এত লোককে উচ্ছেদ করার চেষ্টা হলে, কেউ পাশে আসেনি। কোনো বুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে টুঁ শব্দ অবধি শোনা যায়নি| আর যাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তারা তো জানেই না দিল্লি কোনদিকে। যাবার ব্যবস্থাই বা কী? কেনই বা যেতে হবে? প্রকৃতির কোলে বাস করতে করতে মানুষগুলো এতটাই প্রাকৃতিক যে রাজনীতি বা স্বার্থ সিদ্ধির রাজনৈতিক লালসার দূষণে এখনো অবধি দূষিত হয়নি এসব আদিবাসী মানুষদের মন|

চারদিকে বেসরকারিকরণ চলছে| বেসরকারীকরণই নাকি উন্নয়নের একমাত্র রাস্তা| কে জানে কোনোদিন হয়তো ভারতবর্ষের সরকারটাই কোনো বেসরকারি ভবন থেকে চলতে শুরু করবে| সাম্রাজ্যবাদীরা পেন্সিল দিয়ে দাগ টেনে বলে দিল, বললো -এইটা আমার এলাকা। এই দাগের ভিতরের সব সম্পত্তি আমার। বন বিভাগ নামে একটি দপ্তর খুলে বলে দিল, জল জঙ্গলের মালিকও তারাই। যেন তারা জন্ম দিয়েছে জঙ্গলের। কোনরকমে The Scheduled Tribes and Other Traditional Forest Dwellers (Recognition of Forest Rights) Act, 2006 নামে একটা আইন জুটেছিল কংগ্রেস আমলে। বাজপেয়ী সরকারের আমলে যেমন এই আইনকে শেষ করার আপ্রাণ চেষ্টা হয়েছিল – মোদী সরকরের জমানাতেও তেমনটাই হচ্ছে| কিন্তু কাঠ আর খনিজ দখলের নেশায়, আদিবাসীদের হাজার হাজার বছরের অধিকারে থাকা জঙ্গল গুলো কোনো ধান্দাবাজদের হাতে তুলে দিতে সুপ্রিম কোর্ট থেকে আদিবাসী -বনবাসীদের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ নির্দেশ এল – ভাগো। রাতারাতি লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার এক চরম চক্রান্ত| আদিবাসীরা আছে বলেই হয়তো এখনো সারা দেশটা দিল্লি র মতো প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীন হয়ে যায়নি|

ইতিহাসের আদিম যুগের সভ্যতার নিদর্শন গুলো সব পাওয়া গিয়েছিল পাহাড়ে-জঙ্গলে। সেই হাজার হাজার বছর ধরে জঙ্গলে বাস করে আসা লোকেদের বলে দেওয়া হল – তোমরা অনুপ্রবেশকারী। পরিবেশবিদরা নাকি হিমঘরে বসে পরিবেশ রক্ষা করছে| যারা প্রকৃতির মধ্যে থেকে প্রকৃতিকে লালন পালন করে তারা নাকি জঙ্গল ধ্বংস করছে| মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রের বন কর্মচারীরা বলে, ২-৩ হাজার ঘুষ দাও, তবেই জঙ্গলে জ্বালানি কুড়াতে পাবে। ছোটনাগপুর এলাকায় আমজনতা বুঝতে পারলোনা ‘ আজ কেন বাবু’ই করে মানা’ | অনেক জায়গায় জঙ্গলে জীবন জীবিকার রসদ যোগান করতে গিয়ে মহিলারা হচ্ছে অহেতুক শারীরিক নিগ্রহের শিকার। এসব অত্যাচারিত আপামর জনসাধারণ জানেনা আইনকানুনের মারপেঁচে কবে ঘর ছাড়তে হবে তাদের| সর্বোচ্চ আদালত নিজের আদেশ স্থগিতাদেশ দিয়েছিল ২৮ শা ফেব্রুয়ারি। কারণ তখন সামেন ভোট ছিল | যারা জানে বোঝে, সেই সভ্য সমাজের বন বিভাগের কর্মীরা জ্ঞানপাপী সেজে বসে আছে। স্বাধীনতার পরে বন দপ্তর স্থাপন করে সারা বছর কোটি কোটি টাকা বেতনে খরচ হয়। কিন্তু বছরের পর বছর বন কমতে থাকে। তারা আদৌ জনগনকে বলবে না, ২৬ শা নভেম্বর পরবর্তী শুনানি আছে; সেটা ভাবার বাইরে। ২৬ শা নভেম্বর হয়তো লক্ষ লক্ষ আদিবাসী -বনবাসী মানুষেরা গৃহহীন হয়ে যাবে| আওয়াজ তুললে হয়তো রাষ্ট্রের গুলি ঝাঁজরা করে দেবে জঙ্গল -বাসীদের বুক| কিন্তু মিডিয়া, রাষ্ট্র আর প্রশাসন মিলে সাধারণ মানুষদের টুঁটি চিপতে সব ধরণের প্রস্তুতি প্রায় তুঙ্গে| হয়তো তবুও পদ্মশ্রী যমুনা টুডু, যাদব পায়েঙের মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্ত্ব তবুও লড়াই চালিয়ে যাবেন|

আমি বিশ্বাস করি, যতই স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক, আদিবাসীদের জঙ্গল থেকে উৎখাত করা হবেই হবে। বলা হয়েছে তিন পুরুষ অর্থাৎ প্রায়( ২৫×৫)= ৭৫ বছর ধরে বাস করার প্রমাণ নিয়ে আসতে। যেখানে লোকের NRC তে ১৯৭০ সালের কাগজ নিয়ে হাহাকার পড়ে গেছে, সেখানে ১৯৩০ সালের কাগজ কে কোথায় খুঁজে পাবে! তার উপর এমনিতেই আদিবাসীদের মধ্যে কাগজ কলমের ব্যবহার এত কম যে, দেশ সুপার পাওয়ার হয়ে গেলেও এখনো সব প্রাপ্তবয়স্ক ভোটার তালিকায় স্থান পায়নি। এর পরেও কিছু লোক আবেদন করেছে। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কাছে কাগজ গেলেই বাতিল হয়ে যাচ্ছে। উড়িষ্যার বামরা জেলায় একা জুন মাসে ৭ হাজার আবেদন বাতিল হয়েছে। সারা দেশের অবস্থা আন্দাজ করে নিন।

অথচ Panchayats (Extension to Scheduled Areas) Act, 1996 কে ভিত্তি করে, এই ব্যাপারে গ্রাম সভার মতের অগ্রাধিকার থাকার কথা। আমার নিজের গ্রাম জঙ্গল এলাকায়। যদিও আমার কোনো জমি বন এলাকার মধ্যে পড়ে না, কিন্তু আমার গ্রামের শবর উপজাতির লোকেরা সবাই বন এলাকার জমিতে বাস করে। উচ্ছেদ করে দিলে কোথায় যাবে তারা। আমার তো মনেই পড়ছে না আমার গ্রামে কোনোদিন গ্রামসভায় এসব গণশুনানি হয়েছিল বলে। মহকুমা বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হয়ে থাকলে জানি না, খোঁজ পাইনি/দেয়নি।

আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত যতই মন্দির বানানোর জন্য মানুষের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রায় দেয়, এক্ষেত্রে কিন্তু সেটা হবে না। জঙ্গল থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করতে পারলেই সহজে মুঠোয় চলে আসবে রাশি রাশি খনিজ সম্পদ। আর উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীরা হবে সস্তার শ্রমিক। তাই আনো কাগজ ২৬ শা নভেম্বর।

( Jadav Paayeng – The Forest Man of India)

Leave a Reply