সাঁকচি থেকে জামশেদপুর, কালিমাটি থেকে টাটানগর: নাম পূর্তির ১০০ বছর

Recent

ঋতুজা ঘটক: আলপিন থেকে শুরু করে জাহাজ, নুন থেকে শুরু করে ফাইভ ষ্টার হোটেল সব কিছুতেই খুঁজে পাবেন একটা কোম্পানির নামে, একটা ব্র্যান্ডের নামে – TATA | কিন্তু আপনি জানেন কি এই কোম্পানির শুরুর দিকে কিভাবে ঘাঁটি গেড়েছিল জামশেদপুরে? সাঁকচি গ্রাম থেকে জামশেদপুর শহর আর কালিমাটি রেলস্টেশন থেকে আজকের টাটানগর রেলওয়ে স্টেশন গোড়াপত্তনের গল্প? বিশ্বযুদ্ধেই বা কি অবদান ছিল এই কোম্পানির? আসুন দেখে নেওয়া যাক জামশেদপুর ও টাটানগর নামের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সেই কাহিনী |

জামশেদজি টাটা| যাঁর নামে আজকের জামশেদপুর| জন্মদিন ৩রা মার্চ | তাই প্রত্যেক বছর এই দিনটি বেশ ধুমধাম করে জামশেদপুর শহরে পালিত হয়। তখনকার সময়েও ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়াতেন তিনি| তিনি একজন উচ্চাকাঙ্খী ব্যবসায়ী ছিলেন এবং নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবনে বিশ্বাস করতেন| স্বদেশী ধারণার দৃঢ় বিশ্বাসী এই মানুষটি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতবর্ষের মতো দেশে তার ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটিশদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারার মতো ক্ষমতা আছে| তিনি ১৮৭৭ সালেই দেশের প্রথম টেক্সটাইল মিল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।জে.এন. টাটা একবার যখন ম্যানচেস্টারে ছিলেন তখন সেখানে দার্শনিক থমাস কার্লিলের এক বক্তৃতা শোনেন| তাঁর বক্তৃতায় অনুপ্রাণিত হয়ে, জে এন টাটা ভারতে প্রথম ইস্পাত উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ইস্পাত প্ল্যান্টের জন্য উপযুক্ত জায়গা হিসাবে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে সবুজে আবৃত বনভূমির মধ্যে অবস্থিত সাঁকচি গ্রামটি নির্বাচন করেছিলেন।

১৯০২ সালে আমেরিকা গিয়ে স্টিল প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য দুটি প্রধান ব্যক্তি নিয়োগ করেছিলেন: একজন যে তার ইস্পাত কারখানা নির্মাণ করবে এবং অন্যজন যে চালাতে পারবে| তিনি টাটা আয়রন এবং স্টিল কোম্পানি বা টিসকো স্থাপনের জন্য ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলীকেও সেসময়ই নিয়োগ করেন। তবে, তিনি তার স্বপ্ন পূরণ করার আগেই মারা যান।

তাঁর ছেলে দোরাব তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন। অবশেষে ১৯০৮ সালে টাটা স্টিল উৎপাদন শুরু করে, ভারত তার প্রথম ইস্পাত প্ল্যান্ট নিয়ে এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হয়ে ওঠে। চার বছর পরে প্রথম ইস্পাত খাদ উ ৎপাদিত হয় সেই কারখানা থেকে। তবে, শহরটির নাম দেওয়ার ব্যাপারে ঘটনাটা বেশ রোমাঞ্চকর|

১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন টাটা স্টিল মিলের গুরুত্ব আর‌ও বাড়ে । ভারতের বেশিরভাগ ইস্পাত উৎপাদন সৈন্যবাহিনী ও মালপত্র সরবরাহের জন্য নির্মিত রেলের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। ১,৫০০ মাইল রেল লাইন এবং ৩,০০,০০০ টন ইস্পাত জামশেদপুর থেকে উৎপাদিত হয়ে মিশর, পূর্ব আফ্রিকা ও মেসোপটেমিয়া জুড়ে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। লিখিত সূত্র অনুযায়ী সেসময় শ্রমিকেরা বরাদ্দ সময়ের চেয়ে বাড়তি সময় কাটিয়ে ৮০০০ টন পাঁচ ইঞ্চি গোলাকার ইস্পাত খোলক উৎপাদন ছাড়া‌ও যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দুক টানার উপযোগী ঘোড়া খোঁজার জন্য কাজ করতেন। যুদ্ধের পর, ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিবেদনেও বিশ্বযুদ্ধে টাটা কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ অবদান স্বীকার করা হয় এবং তাদের রিপোর্টেও উল্লেখ করে “ভারতের লোহা ও ইস্পাত ছাড়া (যুদ্ধের) প্রয়োজন মেটানো অসম্ভব ছিল।” যুদ্ধ শেষে ১৯১২ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ড ব্যক্তিগত ভাবে টাটা স্টিল ঘুরতে আসেন এবং যুদ্ধে অবদান রাখার জন্য স্টিল প্ল্যান্টের কর্নধারদের ধন্যবাদ জানান। সেবার জামশেদজি নুসরওয়ানজী টাটা স্মরণে ইস্পাত শহর জামশেদপুরের নামকরণ করার আগে তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে বলেন, “টাটা কোম্পানী মেসোপটেমিয়া, মিশর, প্যালেস্টাইন এবং পূর্ব আফ্রিকার জন্য আমাদের স্টিল সরবরাহ না করলে আমরা এ কাজ কল্পনাই করতে পারতাম না”| সেসময় কালিমাটি রেলওয়ে স্টেশনের নাম বদলে রাখা হয় টাটানগর রেলওয়ে স্টেশন।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জামশেদপুর থেকে ইস্পাত শ্যাড, জলের পাইপ, শয়নযান, কার্তুজ ও বন্দুক তৈরী হত। জামশেদপুরের এই ইস্পাত ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানকে থামানো যেতনা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শীঘ্রই, জাপান, চীন, বার্মা, ভারতের যুদ্ধ রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করেছিল। তাই সেসময় জামশেদপুরের ইস্পাত কারখানাটি বেশ মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তা বুঝতে পেরে ব্রিটিশরা জামশেদপুর শহরকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কলকাতার ভেতর ‘হলুদ সংকেত’ ছাড়াও জাপানের বিমান হামলার আশঙ্কা জানিয়ে শহর জুড়ে বেশ কয়েকটি বোমা আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। জামশেদপুর শহরের বাইরে বেশ কয়েকটি বিমানবিধ্বংসী কামানও রাখা হয়েছিল| কলাইকুণ্ডায় একটি অতিরিক্ত বিমানঘাঁটি নির্মিত হয়েছিল, যার চারদিক ঘিরে মাটির নীচে অনেকগুলো বাংকার ছিল। মজার ব্যাপার হলো, স্বাধীনতার পর, ভারতীয় বিমানবাহিনী ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণের জন্যও এটি ব্যবহার করেছিল।

টাটা স্টিল নিজেকে রক্ষা করার চিত্তাকর্ষক উপায়ও তৈরি করেছিল সেসময়। ইস্পাত নির্মিত অনেকগুলো দড়ি গ্যাস বেলুনের সাথে আবদ্ধ করে ওড়ানো হয়েছিল সারা জামশেদপুর শহরজুড়ে, যাতে করে আকাশে জাপানী যোদ্ধা বিমানগুলি বোমা বর্ষণ করার জন্য নীচে নামতে বাধা পায়। তাছাড়াও, কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া দিয়ে মিশ্রিত ধূম্রজাল তৈরি করার জন্য স্টিল কারখানা জুড়ে ওয়াটার বয়লার স্থাপন করে। এয়ার রেড সাইরেন হিসাবে কাজ করার জন্য ফ্যাক্টরি হুটারও স্থাপন করা হয়েছিল সেসময়।

জাপান সেসময় খুব ঘনঘন আক্রমণ শুরু করায় জামশেদপুরে সেনাবাহিনীকে আনা হয়। সেসময় থাকার জন্য শিল্প নগরীতে কোন উপযুক্ত হোটেল ছিল না। তাই একজন উদ্যোক্তা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, বার্থোলোমু ডি কোস্টা এবং তার ছেলেকে দ্রুত একটা হোটেল তৈরী করার জন্য জায়গা দেয় টাটা কোম্পানি| কোলকাতাতে সেসময় একটি হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল| সেই হোটেল থেকে ইঁট খুলে এনে এমনকি বাসনপত্র নিয়ে এসেও ১৯৪০ সালের ডিসেম্বরে জামশেদপুরের বুলেভার্ড হোটেলটি স্থাপিত হয়। ব্রিটিশ সৈন্যেরা প্রত্যেক দিন মাথাপিছু ১৪ আনা করে দিয়ে নিজেদের মেস নিজেরাই চালাতো| অপরদিকে মার্কিন সৈন্যেরা থাকা খাওয়ার জন্য মাথা পিছু প্রত্যেক দিন ১ টাকা ১৬ আনা করে দিত সেসময়|

জামশেদপুরের নিকটস্থ কলাইকুণ্ডা বিমান ঘাঁটিটি জাপানের উপর বোমা হামলা ও চীনে পরিবহন অভিযানের জন্য বিমান নামার মূল ঘাঁটি হয়ে উঠেছিল। সে সময় কলকাইকুণ্ডার পাশাপাশি চাকুলিয়া, পিয়ারডোবা ও দুধকুন্ডিতেও বিমান ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়েছিল| জাপানী সার্চলাইটগুলি যাতে সনাক্ত না করতে পারে তার জন্য বিমানের পেটগুলি গুলি কালো রঙ দিয়ে রাঙানো হয়েছিল| তখন এই বিমান গুলো পূর্ব এশিয়ায় একবার বৃত্তাকার যাত্রা করতে ২৬২১ মাইল ভ্রমণ করতো।

সেইসময় Ch
সেইসময় China Sea এর নিয়ন্ত্রণ জাপানের হাতে ছিল| ফলে তারা সাবমেরিন সরবারহ বন্ধ করে দেয়| ভারতবর্ষ থেকে চীন দেশ যেতে হিমালয়ের উপর দিয়ে ৫০০ কিমি উড়ে যেতে হতো| হিমালয়ের কঠোর ভূখণ্ডের সাথে, কুয়াশাচ্ছন্ন শিখর এবং হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে, হিমাশয়ের উঁচু শিখরের উপর দিয়ে যাতায়াত করা সেই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ওভারল্যান্ড বিমানের রুট ছিল।

তবে জামশেদপুরের টাটা কোম্পানির ইতিহাসে তখনো বিশেষ মুহূর্ত আসেনি। যুদ্ধের সময় ব্রিটেন এএফভির (সাঁজোয়াযুক্ত যুদ্ধ যানবাহন) চাহিদা পূরণ করতে পারেনি, তাই কমনওয়েলথ দেশগুলিকে উৎপাদন শুরু করার জন্য বলা হয়েছিল। সেসময় টাটা স্টিল কর্তৃক নির্মিত বর্ম-ধাতুপট্টাবৃত বহিরাবরণ ও কানাডা থেকে আমদানি করা ফোর্ড ট্রাকের কাঠাম ব্যবহার করে ভারতে ‘ টাটানগর’ নামে চাকা বাহিত সাঁজোয়াযুক্ত যুদ্ধ যানের একটি সিরিজ তৈরি করে টাটা কোম্পানি।

১৯৪০ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে, জামশেদপুর রেলওয়ে কর্মশালায় ৪,৬৫৫ টি ‘টাটানগর‘ নামক যুদ্ধযান নির্মিত হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে রেলওয়ে কর্মশালা গ্রহণের সময় টেলকো (বর্তমানে টাটা মোটরস) বরাতের শেষ যুদ্ধযান টি বানায়| তাই, টাটা মোটরস থেকে উৎপাদিত প্রথম গাড়ি ট্রাক ছিল না, কিন্তু ছিল একটা ট্যাংক!

( উইকিপেডিয়া থেকে নেওয়া)

3 comments

  • Recycling of rhetoric!
    What’s the share of the Chhotonagpur in Tara’s wild success?

    Better we’d have concerned about the destitute displaced people from Kalimati, Sankchi, Mahulbera, Dhadkidih, Beldih, Kashidih, Nildih, Baridih,…
    …..
    The Politics of Name Change
    NDTV, 19 Nov 2018
    Chandra Bose insisted that the name of the Andaman Nikobar should be Sahid and Swaraj as the brother of his grandfather Netaji Subhas Bose named it so. I think, Chandra Bose insisted that out of opportunism, and not compassion. As none of them ever mention about that how Kalimati village’s name changed to Tatanagar or how Jamshedpur replaced Sankchi. They were familiar with this. Netaji was the president of the then Labour Union and the grandnephew was an employee in Tata Iron and Steel Co. Jamshedpur.
    Not alone Kalimati and Sankchi, they should have focused on the natives of Dhadkidih, Kasidih, Beldih, Nildih, Baridih and other dozens of places where thousands of people lived for centuries before Tata encroached them as the ‘dih’ means village inhabited by tribal in Jharkhand. Where they may be found, tell us if you know; the mute media failed to let us know that.

    We are anxious to hear from anyone who may know the whereabouts of the villagers inherited here before Tata came or the place christened as Jamshedpur.
    These dubious acts of changing the native names have hampered the indigenous significances and hidden the plight of the ousted tribals. Thus a Parasite Jamshedpur Group (PJP) culture, which cares about the people like them and ignore the natives, spreads and takes over more and more of the place and its peoples.
    Mr Ghanashyam said in NDTV’s debate that if they have changed the name you change the government. I’d say not alone the government change the Power, which is responsible for the apathy.

  • The 3rd March is a grand festive day in Jamshedpur. People pay homage to J N Tata as founder of the Tata Iron and Steel Company (Tisco) but we hate the humble tribe Asuras, who founded the iron. However, this is Asur’s land. They have discovered it as iron terra firma about five thousand years before PN Bose and JN Tata. They deserve our gratitude and not to take perverse pleasure in ridicules the humble tribe.

    ‘Asur, the primordial tribe is still engaged in iron smelting perform SANSI-KUTASI (pincers and hammer) worship, which may be productive magic…’ –Dr. S P Gupta and Dr. B K Chatterji.

Leave a Reply