সুবিচার পেলোনা মেয়েটি: পুলিশ, সিআইডি ও সংবাদপত্রের গড়াপেটা

Recent

বিশ্লেষক: রত্নাকর মাহাত

বোরো থানার মামড়ো গ্রামের নাবালিকা স্কুলছাত্রী অপহরণ, খুন ও ধর্ষণের মামলায় ৮ ই অগাস্ট বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর কোর্টে চার্জশিট জমা করল সিআইডি। পুলিশ যা দাবি করেছিল পুলিশের দোসর সি আইডি তাতেই সাই দিয়েছে| মেয়েটির নাকি ধর্ষণ হয়নি – অন্ততপক্ষে এমনটাই বলছে সরকারি চার্জশীটের নথি। নিহত ছাত্রীর বাবা সহ সমস্ত পরিবার এমনকি সারা জঙ্গলমহলের ওয়াকিবহাল মহল সন্তুষ্ট নন এই খবর শুনে। মামলা উচ্চতর আদালত অবধি গড়াতে পারে|

অভাগিনী সপ্তদশী কিশোরী, আঁকরো হাই স্কুল থেকে ৫১১ নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করে বান্দোয়ানের ডঃ অমরনাথ ঝাঁ উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। পড়াশোনার কারণে জেঠুর বাড়িতে বান্দোয়ানেই থাকতো সে। গত ৩ মে দুপুর বেলা টিউশন পড়তে বেরিয়েছিল। সেদিন নাকি খুব জোর ঝড় বৃষ্টি আসার কথা | বিজ্ঞানের ছাত্রী তাই সে কথা নিশ্চয় অবগত ছিল সে| কথা ছিল, বান্দোয়ানে পড়াশোনা সেরে গ্রামের বাড়িতে মা বাবার কাছে ফিরে যাবে সে। মনিকা না ফেরায় সন্ধ্যেবেলা খোঁজার তোড়জোড় শুরু হয়। থানায় গিয়েও পুলিশের সহযোগিতা পায়নি পরিবার । অনেক অনুরোধ করার পর ৬ মে বান্দোয়ান থানা অপহরণের অভিযোগ গ্রহণ করেন। অভিযোগে অরুণ মাহাতো এবং অরিজিৎ মাহাতো নামে দুই যুবকের উল্লেখ থাকায় ৯ মে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। তখন সামনে পঞ্চায়েত ভোট ছিল| মনিকার কোনো কিনারা না করতে পারায় পুলিশের প্রতি তিতিবিরক্ত হয়ে ভোট বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামবাসী। ভোট বয়কটের সিদ্ধান্তের কথা জানাজানি হতেই ১০ মে বোরো থানার জামিরা টিলা থেকে উদ্ধার হয় ১৭ বছরের ওই তরুণীর পচাগলা মৃতদেহ। হয়তো কোনো রাজনৈতিক নেতার স্বার্থ খোয়া যেত ভোট বয়কট হলে|

অরুণ বান্দোয়ান কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। অরিজিৎ আঁকরোর হাইস্কুলের অদূরে একটি মোটর সাইকেল দোকানের কর্মচারী। দু’জনেরই বাড়ি বোরো থানার হাতিরামগোড়া গ্রামে। মেয়েটির অপহরণ, গণধর্ষণ ও খুনের পর একটি দৈনিক বাংলা সংবাদপত্র প্রায় প্রত্যেকদিন খবর ছাপতো সেসময়| যে হলুদ সাংবাদিক সেই খবর ছাপতো তাকে জঙ্গলমহলের সাংবাদিকমহল বেশ ভালো ভাবেই চেনে লোকটাকে| সরকারি অফিসারদের কাছ থেকে তোলা নিতেও পিছপা হয়না ওই অবিশ্বস্ত কুলাঙ্গার| সেই একই হলুদ সাংবাদিকই আবার পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রের বিদায়ী এমপির হয়ে জনসভায় ৫০০ লোক হলেও ৫০০০ লোকের গল্প লিখতো| সেই খবরের কাগজের সংবাদের ছবি স্থানীয় শাসক দলের নেতারা পাঠিয়ে দিতো উপরমহলে – আর তাতেই হারবার শেষ মুহূর্ত অবধি ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি মৃগাঙ্ক বাবু ও তাঁর দলবল|

হলুদ সাংবাদিকের দল প্রচার করে যে পুলিশের দাবি ছিল, অরুণ জেরায় নাকি খুনের কথা নিজের মুখে স্বীকার করেছে| কিন্তু যে সাংবাদিক এই খবর লিখতেন তিনি কোনোদিন মনিকার পরিবারের সাথে কথা বলেননি এমনকি তার বেশিরভাগ গল্পটাই পুলিশের কথা শুনে এবং সেটাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে লেখা| তার সাথে দোসর ছিল পুরুলিয়া জেলার বোরো থানার সাড়ে চার ফুট উচ্চতার আর এক সাংবাদিক| তাকে আর এক স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করে যে সে কেন মনিকার পরিবারের সাথে কথা না বলেই এক তরফা পুলিশের বয়ান লিখে যাচ্ছে – তখন সে কোনো উত্তর দিতে পারেনি| পরে অবশ্য নিজেকে একটু শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছে সে| অরুনের সঙ্গে ওই ছাত্রীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল -সে কথা যদি সত্যিও হয়ে থাকে কিন্তু সেই প্রেমের কথাকে সংবাদপত্র ইচ্ছাকৃত ভাবে বিকৃত বানায় এবং এমন ভাবে পরিবেশন করে যাতে মেয়েটিকে চরিত্রহীন বলে হয়| কেও প্রেম করলে তার কি দুনিয়াতে বাঁচার অধিকার চলে যায়?? সাম্প্রতিককালে অরিজিতের সঙ্গে ছাত্রীটির ঘনিষ্ঠতা নিয়ে অরুন ও অরিজিতের মধ্যে নাকি মনোমালিন্য হয় – এমনটাও প্রচার সংবাদপত্রে| হলুদ সাংবাদিকেরা আপনাকে কোনোদিন জানাবে না যে পুলিশ অরুনের বাড়িতে এসে তার পরিবারের লোককে অহেতুক শাসিয়ে গেছিলো একদিন| অরুনের দাদা বরুণকেও গ্রেফতার করার হুমকি দিয়েছিলো| এমনকি অরুনের এক অবিবাহিতা পিসির প্যান্ট বাইরে রোদে মেলা ছিল সেটাকেও ঘটনার সাথে জোর করে জুড়ে দিতে চেয়েছিলো| অরুন কেন ছাত্রীটিকে বান্দোয়ান বাসস্ট্যান্ডে ডেকে পাঠিয়েছিল সেটা আজও অজানা? পড়শীর মোটরবাইকে চড়িয়ে অরুন নাকি মেয়েটিকে নিয়ে গেছিলো জামিরা টিলায়| তাহলে গ্রামের যে লোকটি মেয়েটিকে বান্দোয়ানের বোম্বে চকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলো সে কি দিন দুপুরে মানুষ চিনতে ভুল করেছিল? চিলা গ্রামের প্রতক্ষ্যদর্শীর নাম সামনে আসতেই তাকে মনিকার চার্জশীট পেশ করার আগে কে বা করা চক্রান্ত করে ফাঁসালো সেটা পুলিশ প্রশাসন না জানলেও, ন্যাকা সাজলেও জনসাধারণ বোঝে| এলাকার এম.এল. এ এমপি রা আজ অবধি নির্বিকার, চুপচাপ| সঠিকভাবে তদন্ত না করেই, মনিকা অপহরণে ব্যবহৃত চার চাকার গাড়িকে দু চাকা বাইকে রূপান্তর, গণধর্ষণ ও হত্যাকে শুধু অপরহণ, এবং সাংবাদিককে প্রভাব খাটিয়ে ত্রিকোণ প্রেমের গল্পের অপপ্রচারে বেজায় অখুশি জঙ্গলমহলের মানুষ|

রাজীব লোচন সরেনের বাবার স্মরণ সভা থেকে বান্দোয়ান থানা যাওয়ার রাস্তায় মামড়ো গ্রামে ঢুকেছিল এক মন্ত্রীর গাড়ি| দেখা করতে চেয়েছিল মনিকার পরিবারের সাথে | কিন্তু পরিবারের কাছে আগে থেকে খবর থাকায় কেও দেখা করতে চায়নি রাগে, অভিমানে ও ঘৃনায়| তাতে মন্ত্রী বাবুর অপমান হয়নি তো ? আঘাত লাগেনি তো অহমিকাতে? এতো বড় ঘটনায় এলাকার জনদরদী এম.এল. এ সাহেব কেন চুপ থাকলো সেটাও কেও বুঝতে পারেনি এখনো|

অরুন গলা টিপে মেরেছিল – এটা পুলিশ ও হলুদ সাংবাদিকদের বয়ান | যদি তাই হয়েছিল তাহলে মেয়েটি কি অরুনকে বাধা দেয়নি ? এই গলা টিপাটিপির মাঝে নাকি ফোনও রিসিভ করে মেয়েটি | বাহ্, চমৎকার বর্ণনা হলুদ সাংবাদিক মহাশয়| অরুন খব দয়ালু নিশ্চয় | নাহলে মরবার আগে শেষ ফোনটা রিসিভ করার অনুমতি দিতোনা অভাগিনীকে| উপরওয়ালা হয়তো জানতো আগে থেকেই তাই মরার পাশে খালটা আগে থেকেও খুঁড়ে রাখা ছিল? বাহ্ হয়তো গাঁইতি কোদাল পুলিশের বর্ণিত বাইকে নিয়ে গেছিলো অরুন| আচ্ছা ময়না তদন্তে কি প্রমান হয়েছে মনিকাকে গলা টিপে মারা হয়েছিল ? হয়নি | ময়না তদন্ত কি আদৌ হয়েছিল ? সকাল ১০টার সময় নিয়ে যাওয়া মরদেহ ময়না তদন্ত হয়ে বিকেল চারটার মধ্যে ফিরেও আসলো কি করে ? বোরো থানা থেকে পুরুলিয়া যেতে আসতে কত সময় লাগে সেটা সবারই জানা|

পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ বলেছে নিহত ছাত্রীর পরিবার সমেত সারা জঙ্গলমহল। ঢং করা ভেকধারী কুড়মি নেতারা সমেত অভিযোগ ছিল বিভিন্ন সংগঠনেরও। তিনজন যুবক ঘটনার বিচার চেয়ে পুরুলিয়া থেকে হেঁটে কলকাতা গিয়েছিলেন। সবার অভিযোগ দোষীদের কাউকে কাউকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে। চার চাকার গল্পকে দু চাকা বানানো হচ্ছে| অপহরণ, প্রলোভন, গণধর্ষণ ও হত্যাকে লঘু করে দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টাও হচ্ছে | ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা, ঝুড়ি চাপা সব রকমের চাপা দেওয়া হচ্ছে | কাকে যেন একটা বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে পুলিশ ও শাসক দল। কলকাতার রাজপথে প্রতিবাদে হাঁটা থেকে শুরু করে পুরুলিয়া সিধু কানু বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সবাই রাস্তা অবরোধও হয়েছে| জনসাধারণ সিবিআই তদন্ত চাইছিলো কিন্তু মানুষকে বোকা বানাতে গত ২৬ মে ঘটনার তদন্তভার যায় সিআইডির হাতে। তার আড়াই মাসের মধ্যে চার্জশিট জমা করে ফেলেছে সেই তদন্তকারী সংস্থা।

চার্জশিটে শুধু এবং শুধু অরুণের নাম রয়েছে। অরিজিৎ মাহাতোর মামা শাসকদলের নেতা তাই হয়তো রক্ষে পেয়ে গেলো অরিজিৎ| নাম নেই চার চাকা গাড়িরও| উন্নয়নের বন্যা না অন্যায়ের বন্যা সেটা বিচার করবে জনসাধারণ|অরুনের বিরুদ্ধে যোগ হয়েছে বেশ কয়েকটি ধারা- ৩৬৩ (জোর করে অপহরণ), ৩৬৫ (অসৎ উদ্দেশ্যে অপহরণ), ৩০২ (খুন) ও ২০১ (তথ্যপ্রমাণ লোপাট) ধারা। উল্লেখ নেই ধর্ষণের। থাকবেই বা কি করে | বিচার যে পূর্ব নির্ধারিত| দিনের আলোতে কেমন করে বাইকে জোর করে অপহরণ করা যায় সেটা আজ অবধি কোনো সিনেমাতেও দেখেনি মানুষ |

পুরুলিয়ার এস.পি. জয় বিশ্বাসকে মনে আছে ? মনে নেই নিশ্চয়| ত্রিলোচন মাহাতো, দুলাল কুমার কে মনে আছে ? তাঁদের মৃত্যুর সময় পুলিয়ার পুলিশ সুপার ছিলেন যে ব্যক্তি তিনিই এস.পি জয় বিশ্বাস ছিলেন| তিনি চলে যাওয়ার পরে পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার কে হয়েছিলেন ? ২০০৯ সালের আইপি এস ব্যাচের এক ব্যক্তি – নাম আকাশ মাঘারিয়া| তার আগে তিনি কোথায় কাজ করতেন ? তিনিও কাজ করতেন সি.আই. ডি তেই| রিপোর্ট করতেন ডি আই জি নিষাদ পারভেজ কে | কি বুঝলেন ? প্রাক্তন সি আই ডি অফিসার আগেই তদন্ত করে নিয়েছেন, তিনি সি আই ডির নাড়ি নক্ষত্র সবই জানেন| তাই ঘটনার তদন্তে কোনো পরিবর্তন আগেও আশা করেনি জঙ্গলমহলের মানুষ | এখন তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে | প্রত্যক্ষদর্শীকেও ইতিমধ্যে জব্দ করতে পেরে হয়তো শয়তানের হাসি দিচ্ছে কেও কেও| ধিক বিচার ব্যবস্থা! ধিক রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়ন!

আসল ঘটনা যে কি সেটা সবার সামনে আসা উচিত |পরিবারের লোকজন বারবার মোবাইল উদ্ধার না হওয়া নিয়েও কথা বলেছে| এমন তো নয় যে ঘটনায় অরুনের সাথে কথিত প্রেমের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি নিয়ে ব্ল্যাকমেইলের স্বীকার হয়েছে মেয়েটি| অরিজিৎ হয়তো তাতেও লালসা দেখাতে গিয়েছিল| গ্রামের মেলায় মেয়েটির বাড়িতে এসেছিল অরুন, খাওয়া দাওয়াও করেছে| অরুন নাকি মনিকার পরিবারের দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয়ও বটে| এমনও হতে পারে যে হয়তো যে চার চাকা গাড়ির কথা বারবার উঠে এসেছে খবরের কাগজে ও সোশ্যাল মিডিয়াতে সেই গাড়ি সস্তায় ভাড়া দেওয়া হতো উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের| সময় কাটানোর মাঝে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি গোপনে তুলে নিতো গাড়ির মধ্যে থাকা কোনো ক্যামেরা বা চালক , গাড়ির মালিক হয়তো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি- তারপর হয়তো সেই ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেল করা হতো কিশোরীদের| বান্দোয়ানের বুকে কান পাতলে এমন অনেক জল্পনাই শোনা যায় এখনো অবধি|

স্কুলের পদার্থবিদ্যার পড়ানো হয় – উত্তম শোষক উত্তম বিকিরক| তেমনি ভাবে হয়তো যে মানুষেরা যত সহজে রেগে গিয়ে গর্জে উঠে তারা তত সহজে চুপও হয়ে যায় | সেকারণেই জঙ্গল মহলের সমস্ত মানুষ আজ চুপ আর কিছুজন মেতেছে নাচনি কর্মশালায়| জেগে ওঠো জঙ্গলমহল, গর্জে ওঠো | বিচার পাক অভাগিনী মেয়েটি| বেঁচে থাকে মানবিকতা| নিপাত যাক অপদস্থ প্রশাসন| ধরা পড়ুক চার চাকা গাড়ির মালিক | জেল থেকে বের হয়ে আসুক প্রতক্ষদর্শী চিলার মানুষটি|

Regards,
Ratnakar

Leave a Reply